ভারত বাংলাদেশের ইলিশ-পেঁয়াজ রাজনীতি

Send
আবদুল মান্নান
প্রকাশিত : ১৩:১৩, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১৪, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০

আবদুল মান্নানবাংলাদেশ ভারত থেকে যে ক’টি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আমদানি করে তার মধ্যে পেঁয়াজ একটি। বাংলাদেশের বাঙালিরা পেঁয়াজ ছাড়া রান্না হতে পারে তা আবার বিশ্বাস করতে চায় না। ১৭ কোটি মানুষের প্রতি বছর ত্রিশ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ প্রয়োজন। দেশে উৎপাদিত হয় তেইশ লাখ টন। কৃষক তার ঘরে তোলার সময় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টন নষ্ট হয়। অর্থাৎ ১৮ থেকে ১৯ লাখ টন পেয়াঁজ গ্রাহকের কাছে যায়। ঘাটতি পূরণে বিদেশ হতে আমদানি হয় এগারো হতে বারো লাখ টন, যার প্রায় সবটাই আসে ভারত থেকে। অর্থাৎ বাঙালির এই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ পণ্যটির একমাত্র আমদানি উৎস ভারত, যা যে কোনও মাপকাঠিতেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।  পেঁয়াজ একটি কৃষিপণ্য, যার উৎপাদন অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। যার একটি হচ্ছে প্রকৃতি, যার ওপর মানুষের কোনও প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ নেই। ভারতে এই বছর বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজ কম উৎপাদন হয়েছে এই অজুহাতে কোনও আগাম বার্তা না দিয়ে গত সোমবার ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি যেগুলো আমদানি করার জন্য বাংলাদেশের আমদানিকারকরা এলসি খুলেছিল তার চালানও বন্ধ। এমনকি যে ট্রাকগুলো পেঁয়াজ নিয়ে বেনাপোল সীমান্তে অপেক্ষা করছিল সেগুলোও বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি।
বৃহস্পতিবার জানা গেলো সেগুলো নাকি বাংলাদেশে আসবে। এর দু’দিন আগে বাংলাদেশ ঘোষণা করেছে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে বাংলাদেশ ভারতে দেড় হাজার টন ইলিশ মাছ রফতানি করবে। প্রতি কেজি দশ মার্কিন ডলার। যেদিন পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের খবরটি প্রকাশ হলো সেদিন প্রথম চালানে পঞ্চাশ টন ইলিশ বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশে করলো। পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ আর ইলিশ রফতানি শুরু, এই নিয়ে বাংলাদেশে মিডিয়া বেশ সরগরম। কারও কারও ধারণা ছিল, পেঁয়াজ রফতানির বদলা হিসেবে বুঝি বাংলাদেশ ইলিশ রফতানি বন্ধ করে দেবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এমন পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা শিষ্টাচারবহির্ভূত। বাংলাদেশ কখনও এমনটা করেছে তার নজির নেই।
অনেকেই জানেন না পেঁয়াজ, তেল, আটার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ভারতীয় রাজনীতিতে খুবই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কখনও কখনও সরকার পতনের কারণও হতে পারে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক রুচির শর্মা একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। তার লেখা বই The Rise and Fall of Nations -এ ভারতের রাজনীতিতে পেঁয়াজসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের দামের প্রভাব নিয়ে একটি পৃথক চ্যাপ্টারই আছে। তিনি লিখেছেন, লবণ ও পেঁয়াজের মতো দ্রব্য ভারতীয়দের জাতীয় পরিচয়ের (National Identity) অন্যতম স্তম্ভ। ভারতীয়দের খাওয়ার টেবিল এসবের উপস্থিতি ছাড়া চিন্তাই করা যায় না। শর্মা ১৯৮৯ ও ১৯৯০ সালে ভারতের নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে পেঁয়াজের মতো জাতীয় ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কৃষিপণ্যের দাম বৃদ্ধিকে দায়ী বলে মনে করেন। ২০১০ সালে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি পেলে ভারত সরকার পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয় আর সঙ্গে সঙ্গে ‘শত্রু দেশ’ পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। জাতীয় স্বার্থে অনেক সময় শত্রু মিত্রের ব্যবধান সরু হয়ে যায়।
বাংলাদেশে এবার একেবারে চটজলদি পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার পেছনেও ভারতের  রাজনীতির উপস্থিতি প্রকট। এমনিতে এবার উত্তর-পশ্চিম ভারতে ভারী বর্ষণের কারণে পেঁয়াজের উৎপাদনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ভারতের বেশিরভাগ পেঁয়াজ এসব অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। দক্ষিণ ভারতেও হয়। সেখানেও বৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। গত বছরও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, যার ফলে বাংলাদেশে রাতারাতি পেঁয়াজ আমদানিকারকরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পেঁয়াজ গুদামজাতকরণ শুরু করে। সরকার যখন বিকল্প উৎস থেকে বিমানে করে পেঁয়াজ আনা শুরু করে তখন আবার পেঁয়াজের দাম রাতারাতি পড়তে শুরু করে। অনেক আড়তদারের গুদামজাত করা পেঁয়াজ গুদামেই নষ্ট হয়।
২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক সভায় যোগ দিতে চার দিনের সফরে দিল্লি গেলেন। সে সময় তিনি ভারতীয় সাংবাদিকদের সামনে এই পেঁয়াজ রফতানি বিষয়ক সৃষ্ট জটিলতা তুলে ধরেন এবং বলেন, তিনি নিজে এখন আর রান্নায় পেঁয়াজ ব্যবহার করেন না। তাঁর এই বক্তব্য ছোট হতে পারে তবে খোদ ভারতের রাজধানীতে বসে এই কথা বলার মধ্যে এক ধরনের কূটনীতি আছে, যা ভারতকে বিব্রত করেছিল।
কেন হঠাৎ ভারতের এই আচমকা পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত? ১৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে প্রকাশিত বহুল প্রচারিত দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা লিখছে, ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতের চাষিদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চরম অসন্তোষ। কারণ, পেঁয়াজ রফতানি না করলে তাদের বিরাট লোকসান। পত্রিকাটি আরও লিখেছে ‘মোদি সরকার বিহার ভোটের আগে পেঁয়াজের দাম নিয়ে কোনও ঝুঁকি নিতে নারাজ।’ ঘুরেফিরে আবার ভারতের রাজনীতিতে পেঁয়াজ। বিবিসিও তাদের সংবাদ বিশ্লেষণে একই কথা বলছে।
বাংলাদেশ এই হঠাৎ সৃষ্ট পেঁয়াজ সংকট মোকাবিলায় কী করবে? গতবারের তুলনায় বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তো কিছুটা চালাক হয়েছে। ইতোমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পাঁচ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে যার মধ্যে আছে মিসর, চীন, তুরস্ক, মিয়ানমার আর পাকিস্তান। বৃহস্পতিবারের খবর হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে বিদেশ হতে কুড়ি হাজার টন পেঁয়াজ আসছে। পূর্বের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি এবারও প্রয়োজনে বিমানে করেও পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। সংকট সমাধানে এমন সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনা এর আগেও দিয়েছেন। ভারতের একটি স্লোগান হচ্ছে ‘প্রতিবেশী প্রথম’। এই স্লোগান অনেক সময় দেখা যায় কাজ করে না। শেখ হাসিনার স্লোগান হচ্ছে ‘দেশের মানুষ প্রথম’। এটি তিনি বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেন।
এবারের পেঁয়াজ নিয়ে ভারত সৃষ্ট হঠাৎ সংকট এবারই শেষ হয়ে যাক। এই সমস্যা বাংলাদেশের পক্ষে সমাধান করা কঠিন নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে বাংলার কৃষকরা দশ মিলিয়ন মেট্রিক টন ধান উৎপাদন করতো, যা প্রয়োজনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ। তখন আমাদের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। বর্তমানে দেশের কৃষি জমি প্রায় পনেরো ভাগ কমে যাওয়া সত্ত্বেও বাংলার কৃষকরা বছরে গড়ে সাড়ে ত্রিশ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বেশি ধান উৎপাদন করে। বাংলাদেশ বিশ্বে এখন চতুর্থ বৃহৎ চাল উৎপাদনকারী দেশ। তাহলে সেই দেশের কৃষকরা বাংলাদেশের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণের পেঁয়াজ উৎপাদন করতে পারবে না? কেন সব সময় এই সামান্য পেঁয়াজের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হবে? কৃষকদের উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্য দাম নিশ্চয়তার জন্য বন্ধ করা হোক এক বছর পেঁয়াজ আমদানি। আগাম ঘোষণা দেওয়া হোক এই বছর পেঁয়াজ আমদানি হবে না, কোনও দেশ থেকে না। দেখা যাবে যে কৃষক কখনও পেঁয়াজ উৎপাদন করেনি তারাও পেঁয়াজ বপন শুরু করছে। তাদের দেওয়া হোক স্বল্প মূল্যে পেঁয়াজের বীজ। যত রকমের সহায়তা বা প্রণোদনা প্রয়োজন তা দেওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করা হোক। যেসব এলাকায় পেঁয়াজ বা পচনশীল সবজি উৎপাদন হয় সেসব এলাকায় বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা হোক বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করার জন্য। তাদের দেওয়া হোক বিশেষ সুবিধা। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে কৃষিতে যে একটা বিপ্লব এসেছে তা তাঁর চরম সমালোচকও স্বীকার করবেন। তাঁর কেবিনেটের কৃষিমন্ত্রী যে ক’জন যোগ্য মন্ত্রী আছে তাদের অন্যতম। তাঁর পড়ালেখা কৃষিতে। তিনি বলতে পারবেন কেমন করে ফি বছর এই পেঁয়াজ বিষয়ক জটিলতা এড়ানো  সম্ভব। কৃষি অর্থনীতিতে পেঁয়াজ তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ পণ্য নয় ঠিক, কিন্তু বাঙালির পাতে যে তরকারি পড়ে তাতে পেয়াঁজের ঝাঁজ থাকবে না তা চিন্তা করতে পারেন না অনেকে। তাদেরও স্বস্তি দেওয়াই সরকারের কাজ। সরকার তো ভারতের তুলনায় অনেক ভালো আছে। এই দেশে পেঁয়াজের দামের সঙ্গে অন্তত রাজনীতির  তেমন কোনও সম্পর্ক নাই। কোনও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সরকারে তা স্বাভাবিক করতে দ্রুত হস্তক্ষেপ করে। খোলা বাজারে তা বিক্রি শুরু হয়।
সব শেষে অনেকে মন্তব্য করেছেন পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের পাল্টা হিসেবে ভারতে ইলিশ পাঠানো বন্ধ করা উচিত ছিল। গত আট বছর এই দেশের কোনও ইলিশ ওপার বাংলায় যায়নি। এবার যাচ্ছে। তাতে বাংলাদেশেরই লাভ। ভারতের সঙ্গে আমাদের বিরাট বাণিজ্য ঘাটতি। সেই ঘাটতি দূর করতে সম্ভব হলে শুধু ইলিশ কেন, অন্য যেকোনও জিনিসও রফতানি করা যেতে পারে। প্রথম চালানে যে পঞ্চাশ টন ইলিশ কলকাতায় গিয়েছিল তা থেকে বৃহস্পতিবার কুড়ি টন কলকাতার বাজারে আসার এক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ, তেমন খবর দিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া বুধবার। অনেকে পদ্মার ইলিশের সঙ্গে ছবিও তুলেছে, আর সেই ছবি ছেপেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।  বাজারভেদে প্রতি কেজি চৌদ্দশ রুপি হতে আড়াই হাজার। জয় আমাদের পদ্মার ইলিশ। জয় বাংলাদেশের।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ