‘আটকে পড়া’ প্রবাসীরা কী করবেন?

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৫:২১, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৩, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

আমীন আল রশীদশৈশবের বন্ধু রিপন। থাকতো মালয়েশিয়ায়। করোনার মাসখানেক আগে দেশে এসেছিল পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে। যাওয়ার সময় হওয়ার আগেই করোনার হানা। মাসের পর মাস বসে আছে। কিছু টাকা জমা ছিল। ফলে এখন পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। কিন্তু এভাবে আর মাস তিন-চারেক বসে থাকতে হলে তারপর কী খাবে—তা নিয়ে দুশ্চিন্তা।
মালয়েশিয়ায় যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতো,সেটি চালু রয়েছে এবং যেতে পারলে সেখানে হয়তো কাজও শুরু করতে পারবে। কিন্তু কীভাবে যাবে, অনুমতি মিলবে কিনা, মিললেও কী কী আমলাতান্ত্রিক প্যাঁচে পড়তে হবে—সেসব নিয়েও ভাবনার শেষ নেই। কিন্তু মালয়েশিয়া প্রবাসী যেসব বাংলাদেশি দেশে এসেছেন, তারা আগামী ডিসেম্বরের আগে যেতে পারবেন না বলে যে সিদ্ধান্তের কথা জানা গেছে, সেটি এখন পর্যন্ত বহাল রয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, ১২টি দেশের নাগরিকদের মালয়েশিয়ায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর আগে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারতের নাগরিকদের ওপর। সবশেষ আরও যে নয়টি দেশের নাগরিকদের মালয়েশিয়া প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কেউ দালালের খপ্পরে পড়ে বা কারও কথায় প্ররোচিত হয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করতেও সতর্ক করেন প্রতিমন্ত্রী। 

ছুটিতে এসে আটকে যাওয়া বা করোনার কারণে বাধ্য হয়ে ফিরে আসা প্রবাসীরা চাইলেও যে দেশেই কিছু একটা করবেন বা কোথাও চাকরি নেবেন, সবার পক্ষে সেটি সম্ভব নয়। কারণ চাকরির বাজার সংকুচিত হয়েছে শুধু নয়, অসংখ্য প্রতিষ্ঠান থেকে লোক ছাঁটাই হয়েছে, হচ্ছে। ব্যবসা করবেন? একটা জেলা শহরে মোটামুটি খেয়েপরে থাকার মতো কোনও একটা ব্যবসা করতে হলে যে পুঁজি দরকার, তা কতজনের রয়েছে—সেটিও প্রশ্ন। 

বলা হয়, ব্যবসার জন্য পুঁজির চেয়েও বেশি জরুরি ভরসা। অনেক টাকা পুঁজি খাটিয়ে একজন ব্যবসা শুরু করবেন। কিন্তু দেখা যাবে তাকে স্থানীয় মাস্তান থেকে শুরু করে পুলিশ—নানা ঘাটে যে চাঁদা দিতে হয়, তাতে অনেকের ব্যবসার আর আগ্রহ থাকে না। রিপনেরও সেই উদ্বেগ। মোটামুটি একটা ব্যবসা শুরু করতে গেলেও তার যে পুঁজি লাগবে—তা নেই। জায়গা-জমি বিক্রি করে হয়তো জোগাড় করা যাবে। কিন্তু ব্যবসাটা যে জমবে, তার নিশ্চয়তা কী? কারণ নিত্যপণ্যের ব্যবসা ছাড়া আর সব ব্যবসাতেই এখন মন্দা। 

বিদেশ ফেরত এই মানুষগুলোর সবার পক্ষে রাতারাতি কৃষক বা মৎস্য খামারি হয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আবার কৃষিতে চটজলদি ফল আসে না। 

করোনার সময় থেকে যারা দেশে আটকে আছেন, তারা সাত-আট মাস ধরে বেকার। টেনেটুনে হয়তো আরও মাস তিনেক চলতে পারবেন। কিন্তু তারপর? অনেকে এরইমধ্যে ভীষণ সংকটে পড়ে গেছেন। হয়তো পরিবারের অন্য সদস্যদের সহায়তায় চলছেন। অথচ এই মানুষগুলোই একসময় পরিবারের সবার ভরসার স্থল ছিলেন। বিপদে-আপদে, সামাজিক অনুষ্ঠানে এই প্রবাসী মানুষগুলোই টাকা-পয়সা দিয়ে প্রিয়জনদের পাশে দাঁড়াতেন। কিন্তু তাদের সামনেই আজ ভীষণ অন্ধকার।

ফিরে আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য দুইশ’ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আরও ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু গণমাধ্যমের খবর বলছে, সব শর্ত পূরণ করতে না পারায় ঋণ পাচ্ছেন না প্রবাসীরা। তাদের জন্য গঠিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে এখনও অর্থ ছাড় করাতে পারেনি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রবাসী যোগাযোগ করলেও কেউ পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা জমা দেয়নি বলে দাবি করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ৪ শতাংশ সুদের এই প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ পাবেন চলতি বছরের মার্চ মাসের পর দেশে ফিরে আসা প্রবাসীরা। কিন্তু অনেকেই ঋণের জন্য আবেদন করলেও কত টাকা লাগবে, টাকা দিয়ে কী করবেন—তা অনেকেই পরিষ্কার করে উল্লেখ করতে পারেননি। এর একটি কারণে সম্ভবত অনেকদিন বিদেশে থাকায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে তাদের ধারণা কম। ফলে কাগজপত্রের শর্ত পূরণ করা তাদের পক্ষে কঠিন। তাছাড়া এ ধরনের প্যাকেজ বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতাও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের নেই।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, করোনাভাইরাস মহামারি পরিস্থিতিতে দেশে ফেরা প্রবাসীরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। আয়ের কোনও উৎস নেই দেশে ফেরা ৮৭ শতাংশ প্রবাসীর। দেশে ফিরে সরকারি বা বেসরকারি কোনও সাহায্য পাননি ৯১ শতাংশ প্রবাসী। জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন ৫২ শতাংশ প্রবাসীর।

এদের মধ্যে অনেকেই করোনার কারণে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ ছুটিতে এসে আর যেতে পারেননি। অনেকে এসেছেন পারিবারিক প্রয়োজনে। অনেকে যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, সেখানে চাহিদা থাকলেও নানা জটিলতায় যেতে পারছেন না। ফলে দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। 

সৌদি আরব বা মালয়েশিয়ার মতো দেশে অল্প বেতনে যেসব শ্রমিক কাজ করতেন, স্বভাবতই তাদের সেরকম জমা টাকাও নেই যে মাসের পর মাস বসে বসে খাবেন। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় তাদের পরিবার মোটামুটি একটা সচ্ছলতার ভেতরে দিনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। খুব বেশিদিন এভাবে বেকার বসে থাকলে এবং বিদেশে গিয়ে আবারও কাজ করতে না পারলে বা দেশে বিকল্প কোনও আয়ের পথ বের করতে না পারলে বিদেশ যাওয়ার আগের অর্থনৈতিক অবস্থার ভেতরে তাদের পড়তে হবে। এর মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা জায়গা-জমি বিক্রি করে, জমি বন্ধক রেখে, মায়ের বিয়ের গহনা এমনকি হালের গরু বিক্রি করেও বিদেশে গিয়েছিলেন। হয়তো সেই দুঃসময় কেটেও গিয়েছিল। কিন্তু করোনা এসে তাদের অনেককেই আবার সেই দীনতার ভেতরে ছুঁড়ে ফেলছে। 

অভিবাসী কর্মীদের বেশিরভাগই চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন। এখন কাজ নেই। অবৈধ ব্যক্তিরা কোনও কাজই পাচ্ছেন না। জীবন হয়েছে মানবেতর, অনেকেই দেশে ফেরার পথ খুঁজছেন। প্রবাসীকল্যাণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তিনজন কর্মকর্তা বলেছেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ শ্রমিক অদক্ষ। তারা নির্মাণ খাতেই কাজ করেন বেশি। অর্থনৈতিক চাপে ব্যয় সংকোচনের কারণে দেশগুলোতে এই খাতের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যান্য খাতের শ্রমিকেরাও কাজ হারিয়েছেন। আবার নানা কারণে অবৈধ হয়ে পড়া শ্রমিকেরাও এখন বেকার।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও যেহেতু সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে, অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে বা ছোট হয়ে গেছে, অনেক দেশেই কর্মী নেওয়ার হার অনেক কমে যেতে পারে। যারা এখন করোনার কারণে দেশে আটকে আছেন, তাদের সবাই আবার আগের কর্মস্থলে গিয়ে যোগ দিতে পারবেন কিনা—তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে করোনাবিধ্বস্ত দেশগুলো নিজেদের অর্থনীতি এবং কর্মীদের বাঁচাতে অভিবাসী কর্মী যে কমাবে,সেটিই স্বাভাবিক। ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে তারা আর চুক্তি নবায়ন করবে না। বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে বড় দেশ সৌদি সরকার ইকামা বা কাজের বৈধ অনুমতিপত্রের মেয়াদ না বাড়িয়ে কর্মীদের অবৈধ করে দিতে পারে। তাছাড়া ইকামার নবায়ন ফি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যান্য দেশও এসব কৌশল নিতে পারে। তখন বেকার হয়ে হয়তো আরও অসংখ্য মানুষকে দেশে ফিরে আসতে হবে। 

তাহলে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখা ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের’ এই দুঃসময়ে রাষ্ট্রের কী করণীয় বা তাদের নিয়ে সমাজের মানুষের ভাবনা কী? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রথম আলো লিখেছে, ছাঁটাই করার আগে কর্মীদের অন্তত ছয় মাস সময় দিতে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু আরব দেশগুলো এতে সাড়া দিচ্ছে না। তাছাড়া কর্মীদের জায়গায় রেখে ব্যবসা বা অন্য কোনও কাজে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জন্য সরকার দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল। তাতেও কোনও দেশ রাজি হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, কয়েক হাজার লোক ফিরলে আলাদা কথা, কিন্তু কয়েক লাখ ফিরলে বিরাট সমস্যা হবে। তাই সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। কর্মীদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার আবার তহবিল দেওয়ার প্রস্তাব করতে যাচ্ছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

মনে রাখা দরকার, করোনা যেহেতু একটি বৈশ্বিক মহামারি, সুতরাং এরকম একটি দুর্যোগের মধ্যে বিদেশি কর্মীদের ফেরত পাঠানো প্রথম অনৈতিক, দ্বিতীয়ত আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তাই সরকারকে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে কর্মী পাঠানো অন্য দেশগুলোর সঙ্গে মিলে সমঝোতার জন্য বিশ্ব পর্যায়ে চাপ তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গে ফিরে আসা প্রবাসী এবং তাদের পরিবারের প্রতি যাতে কোনও ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ করা না হয়, সেদিকেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের নজর রাখা দরকার। সরকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, সেটি যাতে আগ্রহী প্রবাসীরা নির্বিঘ্নে পেতে পারেন এবং শর্তের বেড়াজালে যাতে তাদের হয়রানি করা না হয়, সেদিকেও সরকারের শীর্ষ মহলের খেয়াল রাখা দরকার। সেই সঙ্গে যেসব দেশে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ প্রবাসী শ্রমিক কাজ করেন, সেসব দেশের সরকারের সঙ্গে নিয়মিত দেন-দরবার চালিয়ে যাওয়া দরকার যাতে দ্রুত সেসব দেশে শ্রমিকরা যেতে পারেন এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ভূমিকা রাখতে পারেন। 

লেখক: সাংবাদিক



/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X