আল্লামা শফী, হেফাজত এবং হাটহাজারী মাদ্রাসা

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:৩২, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৬, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০

আনিস আলমগীরদেশের প্রবীণতম আলেম এবং প্রাচীনতম মাদ্রাসা চট্টগ্রামের আল জামেয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসার মুহতামিম বা মহাপরিচালক আল্লামা আহমদ শফী গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার মৃত্যুর আগে হাটহাজারী মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ৩৬ ঘণ্টা গোলযোগ ছিল মাদ্রাসায়। ওই অবস্থায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মৃত্যুর আগে ওই সময়টাতে তাকে মহাসচিবের পদ থেকে অনেকটা অপসারণ করা হয়েছে। তার ছেলে এবং ওই মাদ্রাসার শিক্ষক আনাস মাদানীকে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একবাক্যে বলা যায়, মৃত্যুর আগে তিনি অসম্মানিত হয়েছেন, অপমান বোধ করেছেন।
অন্যদিকে, এমন একটা পরিস্থিতিতে হেফাজত অনুসারী, তার ভক্ত-অনুরাগী এবং সাধারণ মানুষ যেভাবে জমায়েত হয়ে অত্যন্ত সুন্দরভাবে, কোনোরকম গোলযোগ ছাড়াই কয়েক লাখ লোকের সমাবেশের মধ্য দিয়ে তার জানাজা সম্পন্ন করেছেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে তাকে সমাহিত করেছেন—সেটি একটি বড় প্রশংসার দিক। ইত্তেফাক পত্রিকা লিখেছে, প্রায় চার/পাঁচ লাখ লোক সেখানে জমায়েত হয়েছে। একাত্তর টিভিতে বলা হয়েছে, প্রায় তিন লাখ লোকের সমাবেশ হয়েছে। সমসাময়িককালে কারও মৃত্যুতে এত বড় জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার দৃষ্টান্ত নেই, তাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এতে বুঝা যায়, এক শ্রেণির লোকের কাছে তিনি বিতর্কিত হলেও আরেক শ্রেণির কাছে তিনি ছিলেন পাণ্ডিত্য এবং দ্বীনের খেদমতের জন্য সম্মানিত।

নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ হাটহাজারী মাদ্রাসায় আগেও ছিল। গত শতাব্দীর চল্লিশ দশকের প্রথম মহাপরিচালক হয়েছিলেন মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা হজরত মাওলানা হাবিবুল্লাহ। তার মৃত্যুর পর নেতৃত্ব নিয়ে এমন গোলযোগ হয়েছিল যে সেটি মেটাতে নেতৃত্ব স্থানীয় প্রভাবশালী লোকদের হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। তখন মহাপরিচালক পদের প্রার্থী ছিলেন মাওলানা সৈয়দ আহমেদ সন্দ্বীপী, আর মাওলানা আবদুল ওহাব। তারা দু’জনই উপযুক্ততার দিক থেকে উত্তম ছিলেন। সৈয়দ আহমেদ ছিলেন মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দীর শিষ্য আর মাওলানা আবদুল ওয়াহাব ছিলেন হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবীর শিষ্য। হাটহাজারী মাদ্রাসার গঠনতন্ত্রে মুহতামিম নিযুক্তির ব্যাপারে স্থানীয় প্রার্থীকে বিশেষ বিবেচনায় রাখার কথা উল্লেখ আছে। সে কারণে সৈয়দ আহমেদ সন্দ্বীপীর পরিবর্তে আবদুল ওয়াহাব মুহতামিম হয়েছিলেন। সৈয়দ আহমেদ হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে বিদায় নিয়ে তিন কিলোমিটার উত্তরে কাসেমুল উলুম নামে আরেকটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানেও এখন প্রচুর শিক্ষার্থী রয়েছে।

আহমদ শফী দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে শিক্ষকতায় আছেন এবং এর মধ্যে ৩০ বছর ধরে হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রধান ছিলেন। কওমি ঘরানার লোকজনের কাছে তিনি অত্যন্ত পরিচিত এবং সম্মানিত ব্যক্তি হলেও সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিতি পান সাত বছর আগে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতের 'নাস্তিকতাবিরোধী' কর্মসূচি দিয়ে। ওই ইস্যুটি তাকে কওমি ধারার একক নেতায় পরিণত করেছিল। দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। যদিও তিনি রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না এবং ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হেফাজতে ইসলাম রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না, 'নাস্তিকতাবিরোধী' কর্মসূচি নিয়ে তিনি এবং হেফাজতে ইসলাম সামনে চলে আসে। তার সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রভাবশালীরা হাটহাজারী মাদ্রাসায় যাতায়াত করেন।

হেফাজতে ইসলাম ও তার আমির আহমদ শফীর রাজনৈতিক বিশ্বাস না থাকলেও একবাক্যে সবাই স্বীকার করছেন তাদেরকে দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে চেয়েছিল। কওমিরা জামায়াতবিরোধী, এই প্রতিষ্ঠিত ধারণা থেকে আওয়ামী লীগ বরাবরই আহমদ শফীকে কাছে টানতে চেয়েছে। আবার বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটে থাকা হেফাজতে ইসলামের কিছু নেতা আহমদ শফী এবং হেফাজতকে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। সে কারণে অনেকে মনে করেন ভবিষ্যতে আহমদ শফীর রাজনৈতিক মূল্যায়ন হবে না। তার মূল্যায়ন হবে ধর্মীয় নেতা ও তাত্ত্বিক হিসেবে। বাংলাদেশে দেওবন্দ অনুসারীদের একক নেতা শফী ছিলেন উর্দু, ফার্সি, আরবি ভাষা ও সাহিত্যের পাশাপাশি ইসলামি শিক্ষায় একজন পণ্ডিত। তার সততা এবং চারিত্রিক গুণাবলিও প্রশংসনীয় ছিল।

ইসলাম এবং তার নবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-কে অবমাননা করা যাবে না—এই দাবিতে ৬ এপ্রিল ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অভিমুখী ‘লং মার্চ’ কর্মসূচি দিয়ে প্রথমে জাতীয়ভাবে নজরে আসে। শাহবাগের গণজাগরণের বিরুদ্ধে হেফাজতের ওই অ্যাকশনের দরকার ছিল কিনা প্রশ্ন উঠেছিল। কারণ হেফাজতের এই দাবির সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকার এবং গণজাগরণের কোনও বিরোধ ছিল না। বিএনপিসহ ১৮ দল লং মার্চে সমর্থন দিয়েছিল। কার্যত সবাই মিলেমিশে লং মার্চ ‘সফল’ করে বাড়ি ফিরে গিয়েছে, ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশ মুখ থেকে।

কিন্তু পরের মাসে ৫ মে শাপলা চত্বরে অবস্থানের কর্মসূচি দিয়ে সরকার পতনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তারা বিরোধীদেরকে। বিএনপি-জামায়াত এবং এরশাদের জাতীয় পার্টিও হেফাজতের কর্মসূচিকে সমর্থন দেয় এবং হেফাজতকে ঘুঁটি হিসেবে নিয়ে সরকার পতনের স্বপ্ন দেখে তারা। মোল্লারা এমনিতেই 'নাচুনে বুড়ি' ছিল, তারাও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল পাশের বঙ্গভবন দখল করে বিরিয়ানি খাবেন। চিহ্নিত টিভিগুলোর উসকানি তাদের আরও বেসামাল করে দেয়। শাপলা চত্বর থেকে প্রেস ক্লাব-পঙ্গপালের আস্ফালন, বায়তুল মোকাররমে আগুন-তাণ্ডব নগরবাসীকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়েছিল চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। দিন শেষে, সৈয়দ আশরাফের হুঁশিয়ারি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃঢ় পদক্ষেপ, গভীর রাতে কানে ধরে বিদায়ের দৃশ্য, ফাঁকা শাপলা চত্বর-নগরবাসীকে স্বস্তি এনে দিয়েছিল। ৫ মে’র সেই অভিযান নিয়ে আজও গল্প বলা হয় যে, সেই রাতে হাজার হাজার মানুষকে লাশ করা হয়েছে, গুম করা হয়েছে। কিন্তু অধিকারের আদিল সাহেবের ৬১টি লাশের হিসাব আজও পাওয়া গেলো না! মৃত লোকদের একজন আত্মীয় স্বজন দাবি করেনি যে তাদের প্রিয়জনকে খুঁজে পায়নি। এই ঘটনা আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতি আলোচিত এবং সবচেয়ে বিশ্বাস্যযোগ্য গুজব হয়ে আছে।

কিন্তু দিনবদল হতে সময় নেয়নি। বছর ঘুরতেই সবকিছু বদলে যায়। যারা সেদিন হেফাজতকে উস্কে দিয়েছিল তারা হেফাজত ও আহমদ শফীর সমালোচনায় নামে। এরপর আল্লামা শফী যখন সরকারের সঙ্গে মিলে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সনদের স্বীকৃতি আদায় করলেন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রের মূলস্রোতের শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত করার পদক্ষেপ নিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় সংবর্ধনা দিয়ে কওমি জননী খেতাব দিলেন তখন আওয়ামী-কওমি পরস্পর বন্ধু হয়ে গেলেন! আর যারা তাদেরকে দিয়ে সরকার পতনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াত মনে করলেন আহমদ শফী বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন।

আহমদ শফী শেষ বেলায় কওমি মাদ্রাসা নিয়ে অত্যন্ত সুচিন্তিত, দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিয়ে প্রশংসার কাজ করলেও প্রগতিশীল মহলে তিনি বরাবরই সমালোচনার পাত্র ছিলেন। শাপলা চত্বরের ঘটনার পর তার বহু পুরনো একটি ভিডিও ক্লিপের বক্তব্য তাকে ‘তেঁতুল হুজুর’ ট্যাগ দিয়েছিল। মেয়েদেরকে তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা, গার্মেন্টসে চাকরি করা নারীদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা, নারী শিক্ষা নিয়ে তার মন্তব্য ব্যাপক সমালোচনা এবং নিন্দা কুড়ায়। আর হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি ছিল পশ্চাৎপদতার চূড়ান্ত নিদর্শন। তাকে নিয়ে বিতর্ক মৃত্যুর শেষ দিন নয়, এখনও চলছে। একটি পত্রিকা তাকে অসাম্প্রদায়িকতার বাতিঘর বলে বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে। বাতিঘর বলাটা বাড়াবাড়ি হলেও তাকে অসাম্প্রদায়িক বলাতে আমি আপত্তির কিছু দেখি না। তার মাদ্রাসার দক্ষিণ পাশে মসজিদের কোল ঘেঁষেই হিন্দুদের বহু পুরনো মন্দির রয়েছে। সেখানে সাম্প্রদায়িকতা হানা দিতে পারেনি। তিনি নিজেও কখনও অসাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিয়েছেন দেখিনি বা অন্য কেউ তার বিরুদ্ধে তো সেরকম কোনও অভিযোগ করেনি। সুতরাং ধর্মপ্রাণ হলে অসাম্প্রদায়িক হতে পারবে না কেন!

আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর এখন প্রশ্ন, হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক কে হবেন এবং কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান কে হবেন, সর্বোপরি রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হেফাজতের নেতৃত্ব কার কাছে যাবে? পরিবেশ পরিস্থিতি বলছে সেটি বিএনপি-জামায়াত অনুগত লোকদের হাতে যাবে। সেক্ষেত্রে দুই বাবুনগরীর কেউ যাতে হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রধান বা হেফাজতের প্রধান না হতে পারেন—সেই প্রচেষ্টাও ভিন্ন মহল থেকে থাকবে। আহমদ শফীর সঙ্গে ওই দুই বাবু নগরীর অনুসারীরা সর্বশেষ যা করেছে সেই অমানবিক ক্ষত মুছে তারা সহজে সফল হবেন কিনা জানি না। তারা নেতৃত্বে এলে হাটহাজারী মাদ্রাসা এবং হেফাজত ভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ করবে এমন একটা আশঙ্কা রয়েছে, যদিও এটা পরিষ্কার যে আল্লামা আহমদ শফীর সমতুল্য কোনও নেতার উত্থানের সম্ভাবনা আপাতত খুবই ক্ষীণ।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

 

 

 
/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X