করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবং বাংলাদেশ

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৩:৫৬, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৬, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০

আনিস আলমগীরবছরের গোড়ার দিকে সাফল্যের সঙ্গে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ধীরে ধীরে কমিয়ে দেওয়ার পরে ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে এখন কোভিড-১৯-এর পুনরুত্থান ঘটছে। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০) সকাল অবধি মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩৩ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে (৩,৩০,৮২,৯৯৪ জন) এবং মৃত্যুর পরিমাণ বেড়েছে ৯ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯৯-এরও বেশি। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হিসাব অনুযায়ী, রবিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা ৭০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, পেরু এবং যুক্তরাজ্যকে ছাড়িয়ে ভারত এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম করোনায় আক্রান্ত দেশ, এর মোট করোনা আক্রান্ত লোকের সংখ্যা ৬০ লাখ ৭৫ হাজার। 
ইউরোপের কিছু দেশ যেমন—আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, মন্টিনিগ্রো, উত্তর মেসিডোনিয়ায় অন্য সময়ের চেয়ে আগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি দেখা গেছে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস এবং স্পেন সম্ভবত চরম ভীতির সেকেন্ড ওয়েভকে মোকাবিলা করছে এবং এটি রোধে পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছে। আবার অনেকে বলছেন, এসব দেশে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার কারণ পরীক্ষার পরিমাণও বেড়েছে। বছরের শুরুর দিকে অনেক দেশের এত বেশি পরিমাণে পরীক্ষা করার সক্ষমতা ছিল না।

করোনার সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় ঢেউ থেকে বাংলাদেশ রক্ষা পাবে এমন কোনও গ্যারান্টি নেই। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও করোনা দ্বিতীয়বার আসবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন শীতকালে তার ভয়াবহতা বাড়তে পারে। তবে সমালোচকরা বলছেন বাংলাদেশে দ্বিতীয় ঢেউ আসার এবং আশঙ্কার কথা তখন আসবে যখন প্রথম তরঙ্গ শেষ হবে। বাংলাদেশে কি করোনার প্রথম ধাপ শেষ হয়েছে!

করোনা চীনের উহানে ভয়াবহভাবে দেখা দেওয়ার পর ২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম রোগী শনাক্ত হয় এবং ১৮ মার্চ ২০২০, করোনায় আক্রান্ত প্রথম রোগীর মৃত্যু হয়। বাংলাদেশের করোনা চিত্রে দেখা যাচ্ছে জুন মাসে আক্রান্তের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ছিল। সরকারি হিসেবে এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৪৪ জন লোকের মৃত্যু হয়েছে বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হবে মনে করে সবাই। তবে এটা স্বীকার করতে হবে প্রথম ওয়েভের পর এখন করোনার ভয়াবহতা কিছুটা কমেছে। এ পর্যন্ত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৩ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৫ জন। প্রতিদিন হাজার/দেড় হাজার লোক আক্রান্ত হচ্ছে এবং গড়ে ৪০/৫০ জন মারা যাচ্ছে এখন। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ৭২ হাজার ৭৩ জন।

চীনের উহানে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রথম করোনার আত্মপ্রকাশ ঘটে। তখনই জাতিসংঘের মহাসচিব বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে করোনা প্রতিরোধের পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তখন তৎপর ছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণ দিতে গিয়ে করোনা নিয়ে জাতিসংঘের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন। ভারতের এখন ভয়াবহ অবস্থা। সম্ভবত নরেন্দ্র মোদি এজন্য মনের সাধ মিটিয়ে জাতিসংঘকে দোষারোপ করেছেন। জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের দায়িত্ব পালনে প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ জাতিসংঘের কথায় কর্ণপাত না করলে তাদের করার কী থাকে?
বিশ্ব যখন করোনা নিয়ে ব্যস্ত মোদির প্রশাসন ট্রাম্পকে গুজরাটে সংবর্ধনা, সংখ্যালঘু মুসলমানদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আর দিল্লিতে পরিকল্পিত দাঙ্গা লাগানোর কাজে ব্যস্ত ছিল। অন্যদিকে অধিবেশনের শুরুর দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনার জন্য চীনকে দায়ী করে বক্তৃতা দিয়েছেন এবং চীন উহানে লকডাইন করে সারা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখে করোনা ছড়িয়েছে এই অভিযোগ এনেছেন। ট্রাম্প-মোদি দু’জনই করোনা মোকাবিলায় নিজেদের ব্যর্থতার জন্য নিজ দেশে সমালোচিত।

এটা চীনা ভাইরাস উহানের ল্যাবে উৎপাদন করা হয়েছে ইত্যাদি কথা বলে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট একটা ঝগড়ার সূত্রপাত করে চীনকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছেন। এমনকি নিজের দেশে তা কার্যকরভাবে প্রতিরোধের চেষ্টা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করেননি, সে কারণে আমেরিকা আক্রান্ত ও মৃত্যুর দিক থেকে শীর্ষ স্থানীয় দেশ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমনকি সবার পরামর্শ উপেক্ষা করে নিজে মাস্ক পর্যন্ত ব্যবহার করেননি। 

গত চার বছরে ট্রাম্প একলা চলার মনোবাসনা পূর্ণ করতে গিয়ে বিশ্ব-ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন। কোনও কোনও পণ্ডিত ব্যক্তি এখন জাতিসংঘের কার্যকরিতা ফুরিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করতে শুরু করেছেন। আমেরিকা জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনেস্কো ইত্যাদির অনুদান বন্ধ করে দিয়েছে। ট্রাম্প পুনরায় আগামী চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বিশ্ব-ব্যবস্থা আরও ভেঙে যাবে। ভারতও প্রতিষেধক আবিষ্কারের রাষ্ট্রীয় কোনও উদ্যোগ গ্রহণ না করে প্রতিষেধক হিসেবে গো-মূত্র পান করায় উৎসাহ দিয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জনসাধারণের উদ্ভাবিত প্রচেষ্টার প্রতি নীরব সমর্থন জ্ঞাপন করেছে। সৌদি আরবই একমাত্র দেশ যারা প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য ৫০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছে।

বিশ্ব প্রাচীনকাল থেকে বহু অনুরূপ মহামারি মোকাবিলা করেছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে প্লেগ মহামারি হিসেবে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। তখন প্লেগে বিশ্বে ১৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। ১৫ কোটির মধ্যে শুধু ইউরোপে মানুষ মারা যায় ৫ কোটি। ইউরোপের প্লেগে মরা মানুষের সংখ্যা পূরণ হতে দুইশত বছর সময় লেগেছিল। স্পেনিশ ফ্লুতে ১৯২০ সালে ৫ কোটি মানুষ মারা যায় এবং ৫ বছর স্থায়ী হয়। গত ৮ মাসব্যাপী করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কারের বহু উদ্যোগ চলছে। বলা হচ্ছে রাশিয়া-চীনসহ কয়েকটি দেশের নব-আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন সহসা বাজারে আসবে। এ ভ্যাকসিনগুলো কার্যকর প্রমাণিত হলেই শুধু মানবজাতির উৎকণ্ঠার অবসান হবে।

বিশ্বের ৭৫০ কোটি মানুষের জন্য যে ভ্যাকসিন প্রয়োজন তা কোনও উৎপাদনকারী একক দেশের পক্ষে সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। সুতরাং আগেভাগেই উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থাটা নিশ্চিত করার প্রয়োজন পড়বে। করোনা নির্মূল হবে এটা আশা করা যায় না। প্লেগ যেমন নিস্তেজ হয়ে আমেরিকার ফ্লোরিডার উপকূলে শতাব্দীর পর শতাব্দী বসে আছে হয়তোবা করোনারও অনুরূপ একটা পরিস্থিতি হবে। তবে কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কার হলে মানবজাতি অনেকটা নিরাপদ হবে। এর মধ্যে দেখা গেছে যে করোনা রূপ বদলায়। প্রত্যেক দেশকে সার্বক্ষণিকভাবে রূপ বদলানোর বিষয়টিকেও মনিটর করতে হবে যেন দ্রুত প্রতিষেধক আপটুডেট করা যায়।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অবাঞ্ছিত লোকের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। নানা মহল থেকে বারবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী বদলানোর দাবি উঠেছে, কিন্তু হয়নি। দ্বিতীয় ওয়েভ শুরুর আগে বদলানো হবে এমন কোনও লক্ষণ নেই। বর্তমানে মনে হচ্ছে নিউ নর্মালের নামে আমরা করোনার ভীতিকে ভুলে যেতে বসেছি। কোনও কিছুতেই তো আর বাধা নেই যেন। সরকারের তরফ থেকে দৃশ্যত না হোক অদৃশ্য প্রতিরোধ থাকা দরকার। সেটা অনুপস্থিত। দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে আরও বেশি লোক আক্রান্ত হবে আশঙ্কা করা যায়। প্রয়োজন হবে আরও বেশি চিকিৎসাসেবা, আরও বেশি ডাক্তার। ডাক্তার-স্বাস্থ্য কর্মীদেরকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির দিকেও খেয়াল রাখা দরকার সরকারের। এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০ চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী মারা গেছে। আমরা হারিয়েছি অনেক গুণী-জ্ঞানী মানুষকে। সর্বশেষ হারালাম রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলমকে। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, স্বাস্থ্য অধিদফতর করোনার প্রতিষেধক টিকা ক্রয় করবে। সম্পূর্ণ বিষয়টা কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে। এ অধিদফতর মাল না নিয়ে বিল পরিশোধের অভ্যাসে অভ্যস্ত। সুতরাং তাদেরকে সহজে বিশ্বাস করা যাবে না। আর অনেক অস্থায়ী হাসপাতাল বন্ধ করা হচ্ছে, প্রয়োজনে যেন সেসব খোলা যায় তার প্রস্তুতিও গ্রহণ করে রাখা দরকার।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ