ধর্ষণের লাইসেন্স কী?

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ২২:০৭, অক্টোবর ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১৯, অক্টোবর ০২, ২০২০

রুমিন ফারহানাএমসি কলেজে ধর্ষণের ঘটনায় পুরো দেশ যখন উত্তাল তখন নিতান্ত কৌতূহলবশতই আমি ছাত্রলীগ, ধর্ষণ এই দুটো শব্দ দিয়ে গুগল সার্চ দেই। আমার উদ্দেশ্য ছিল যেহেতু গত কয়েক বছরে পত্রিকায় খবর হওয়া ধর্ষণের অভিযুক্তদের ব্রুট মেজরিটি সরকারি দলের কোনও না কোনও অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে জড়িত, তাই পুরো বিষয়টি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া। যে খবরগুলো আমার সামনে এসেছে তার কয়েকটির শিরোনাম উল্লেখ করছি নিচে–
১) গৃহপরিচারিকার ধর্ষণ মামলায় ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার (বাংলা ট্রিবিউন ০১.১০.২০২০);
২) রংপুরে ছাত্রলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে শিক্ষিকার ধর্ষণ মামলা (কালের কণ্ঠ ০৭.০৯.২০২০);
৩) ধর্ষকদের তাড়িয়ে দিয়ে গৃহবধূকে ধর্ষণ করল ছাত্রলীগ নেতা (যুগান্তর ২৭.১০.২০২০);
৪) ভূঞাপুরে ধর্ষণ মামলায় ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার (০৪.০১.২০২০);
৫) ছাত্রলীগ নেতার নেতৃত্বে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ (পাবনা, দেশ রুপান্তর ২৩.০৩.২০২০);
৬) ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে কলেজছাত্রীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ (বরিশাল, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১২.০২.২০২০);
৭) ভুয়া কাবিনে বিয়ে করে ধর্ষণ, ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার (চট্টগ্রাম, ডিবিসি নিউজ, ০৬.০১.২০২০);
৮) রূপগঞ্জে স্কুলছাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ: ছাত্রলীগ নেতা বহিষ্কার (বণিক বার্তা, ১৩.০১.২০২০);
৯) কেরানীগঞ্জে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার (ইত্তেফাক ১৩.০৬.২০২০)
১০) নেত্রীকে ধর্ষণ মামলায় ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার (সিরাজগঞ্জ, প্রথম আলো ১২.০৩.২০১৮)।

প্রতিটি সংবাদ-শিরোনাম নেওয়া হয়েছে একেবারে মূল ধারার প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া থেকে। লেখার কলেবর সীমিত রাখার স্বার্থে হেডলাইনের সংখ্যা আর বাড়াইনি, কিন্তু যে কেউ চাইলে এই সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন সারা দেশের প্রতিটি জেলা কীভাবে ধর্ষণের জনপদে পরিণত হয়েছে।
পাঠক খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই, প্রতিটি হেডলাইনের সঙ্গে সেটা কোন পত্রিকায় কত তারিখে এসেছে সেটাও যুক্ত করেছি। এর পেছনে একটা গল্প আছে যেটা বললেই বোঝা যাবে আমাদের দেশে এই সমস্যা কেন এই পর্যায়ে গেছে। এমসি কলেজের বর্বর ঘটনাটি ঘটার ঠিক পরপর আমি একটা টিভি টকশোতে অংশ নিই। সেই শোতে আমি এখানে লিখিত কিছু হেডলাইন পড়তে গিয়ে পড়েছিলাম ভীষণ বিপত্তিতে। আমার লেখা হেডলাইনগুলোর ১০ নম্বরটি আবার উল্লেখ করতে চাই– নেত্রীকে ধর্ষণ মামলায় ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার (প্রথম আলো ১২.০৩.২০১৮)। ঘটনাটি সিরাজগঞ্জের। জায়গার নাম উল্লেখ করে এই হেডলাইনটি পড়ার কিছুক্ষণ পরেই আমার সহ-আলোচক আওয়ামী লীগ নেতা এবং এমপি (যার আসন সিরাজগঞ্জে) কর্কশভাবে চিৎকার করে জানালেন, তিনি নাকি শো’র মধ্যেই এলাকার ছাত্রলীগ নেতার কাছ থেকে বয়ান জোগাড় করেছেন– ‘সিরাজগঞ্জের কোথাও কোনও ধর্ষণ হয়নি।’ তিনি আমাকে মিথ্যাবাদী প্রমাণের চেষ্টায় চাপ দিতে লাগলেন যেন আমি তখনই লিংকটি দর্শকদের জানাই। বাসা থেকে ফোনে ইন্টারনেটে টেলিভিশনে যুক্ত থাকা অবস্থায়, তিনি খুব ভালো জানেন, লিংক বের করা কতটা অসম্ভব। শো চলতে থাকা অবস্থায়ই পরে আমি বাসার আরেকটা ফোনে বাধ্য হয়ে ইন্টারনেট প্যাক কিনে ডেটা কানেক্ট করে দর্শকদের সেই খবরের হেডলাইন দেখিয়ে দেই। তখন তিনি নতুন গল্প ফাঁদেন। প্রথমে তিনি পুরো সিরাজগঞ্জের দায়িত্ব নিয়ে ফেললেও লিংক দেখানোর পরে তিনি বলতে শুরু করেন, যে থানায় ঘটনাটি ঘটেছে সেটি তার সংসদীয় আসনের বাইরে।
এই টকশো’র ক্যাপশন ছিল ‘ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের আচরণ কেন এমন?’– সেদিন আমি হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছিলাম ক্ষমতাসীন দলের উচ্চাসনে বসা ব্যক্তিদের দম্ভ, অস্বীকারের সংস্কৃতি, অভিযোগ আমলে নেওয়ার বদলে যিনি অভিযোগ করেছেন তাকে হেনস্থা করার চেষ্টা, এই সবকিছুই ধর্ষককে উৎসাহিত করে, সাহস জোগায়, আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় এই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটানোর।
অস্বীকার করে যদি পরিস্থিতি সামাল না দেওয়া যায় তখন চেষ্টা হয় সমঝোতার। এমসি কলেজের ঘটনাটিও সমঝোতার মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মিহিত গুহ চৌধুরী বাবলার বয়ানে জানা যাক সেটা। ছাত্রাবাসের গেটে এসে তিনি দেখেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতা এবং যুবলীগের এক নেতাসহ কয়েকজন সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। এরপর কিছুক্ষণ পর পুলিশও ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয়। ছাত্রাবাসে প্রবেশের জন্য কলেজ প্রশাসনের অনুমতি পেতে পুলিশের বেশ কিছু সময়ক্ষেপণ হয় জানিয়ে তিনি বলেন, এ সময় সেখানে উপস্থিত ওই নেতারা প্রথমে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করেন। তারা আপসের চেষ্টাও চালান। আর এই চেষ্টায় শাহপরান থানার ওসিও তাদের সহায়তা করার উদ্যোগ নেন। বাবলা জানান, তিনি এরকম আপসের প্রস্তাব মানেননি। বাবলাকে ধন্যবাদ।  
এমসি কলেজের ঘটনার পর বিবিসি বাংলার প্রবাহ অনুষ্ঠানে সিলেট আওয়ামী লীগ নেতার বক্তব্য শুনছিলাম। তিনি মনের কষ্টে বলছিলেন, এই ধর্ষণের সঙ্গে ছাত্রলীগের কেউ জড়িত না। এখন অনেক বিএনপি-জামায়াতের লোক অপরাধ করে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ বলে নিজেদের পরিচয় দেয়। আমার প্রশ্ন হলো কেন সবাই আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ হতে চায়? কী সুবিধা পাওয়া যায়? এর পেছনে রহস্য কী? রহস্য কী এটাই, মানুষ আজকাল বিশ্বাস করে লীগের ছায়াতলে আসতে পারলে যে কোনও অপরাধ করে পার পাওয়া যায়, পুলিশ-প্রশাসন সহ সকলেই তখন অপরাধীকে বাঁচাবার জন্য তৎপর হয়ে পড়ে অপরাধ যাই হোক না কেন?
এরইমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের সামনে এক বক্তৃতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাস বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধী ছাড়া অন্য কোনো নারী যদি নির্যাতনের শিকার হয়...তা প্রতিহত করব’।
ধর্ষণের শিকার নারীরও যে জাতিভেদ আছে, যাদের কারও ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করা যায় আর কারও ক্ষেত্রে প্রশ্রয় দেওয়া যায়, তা এই বক্তব্যে স্পষ্ট। প্রথমত, কোনও ফৌজদারি অপরাধ বন্ধ বা প্রতিহত করার দায়িত্ব ছাত্রলীগকে কে দিলো? দ্বিতীয়ত, কে স্বাধীনতার পক্ষে আর কে বিপক্ষে সেটা নির্ধারণ করবে কে? তৃতীয়ত, সবাই যদি একমত হয় কোনও নারী স্বাধীনতাবিরোধী, তাহলে জনাব সঞ্জিতের বক্তব্য অনুযায়ী ধর্ষকদের অধিকার জন্মে বাংলাদেশের মাটিতে সেই নারীকে ধর্ষণ করার? চতুর্থত, যেহেতু সরকারি বয়ানমতে বিএনপি-জামায়াত স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি তাহলে বিএনপির কোনও নারী কর্মী/সমর্থক যদি ধর্ষণের শিকার হয় তাহলে দেশের মাটিতে তার বিচারের কোনও সম্ভাবনা নেই।
এটা অবশ্য ইতোমধ্যে ২০১৮-এর নির্বাচনের পর পর ধানের শীষে ভোট দেওয়ার অপরাধে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের এক নারীকে ধর্ষণের ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করে ছেড়েছে।
ধর্ষণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা সামাজিক, অর্থনৈতিক, কিংবা রাজনৈতিক যে কোনোটিই হতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা বাকি অন্যসব ক্ষমতার উৎস, সেহেতু যার হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতার এই অস্ত্র আছে সে যেকোনও অপরাধ করতে পারে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে পার পায়। প্রাথমিকভাবে দল তাকে আশ্রয় দেয়, একেবারে অপারগ হলে তার দলীয় পরিচয় অস্বীকার করে।
লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ