বিচার চাই, দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৬:৩০, অক্টোবর ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩১, অক্টোবর ০৭, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাসারাদেশে একের পর এক ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের ঘটনা, কতজন ধর্ষক সাজা পায়? ধর্ষণের কী পরিমাণ অভিযোগ পুলিশের খাতায় লিপিবদ্ধ হয়? সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি বা তাদের প্রশ্রয়ে যারা ধর্ষণে অভিযুক্ত হয় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব বা অনীহা প্রকাশিত হয় কেন? ধর্ষকের লোলুপ দৃষ্টি এড়িয়ে কবে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করতে পারবে আমাদের নারীরা? কবে সুনিশ্চিত হবে এদেশে নারীর জীবন?
এই প্রশ্নগুলো যখন উঠছে তখন আমরা দেখছি অনেক সচেতন মানুষও ধর্ষক ও নারী নিপীড়কদের ক্রসফায়ার চাচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যমে এই আওয়াজটি যারা তুলেছেন, তাদের অনেকেই সুশাসন ও আইনের শাসনের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে লিখছেন, বলছেন। ক্রসফায়ার সংবিধান প্রদত্ত বিচারব্যবস্থার ওপর চরম অনাস্থার নিদর্শন। তদন্ত নয়, চার্জশিট নয়, শুনানি নয়, কোনও রায়ও নয়, কিন্তু একটা বিচার হয়ে গেলো। দেশের বিচার ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে বিচার করা যায়, সে এক বড় প্রশ্ন। বুঝতে পারি, এই মানুষগুলো বিচারবহির্ভূত কোনও হত্যা সমর্থন না করলেও আবেগের বশবর্তী হয়ে দোষীদের সাজা চেয়েছেন এভাবে।

খাগড়াছড়ি ও সিলেট এমসি কলেজের বর্বরোচিত ধর্ষণের ঘটনার রেশ না কাটতেই নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের গৃহবধূর পৈশাচিক নির্যাতনের ভিডিও দেখে এখন সারাদেশে পুঞ্জীভূত ঘৃণা ও ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। মাদক হোক, সন্ত্রাস হোক বা ধর্ষণ হোক, যেকোনও ক্ষেত্রে ‘ক্রসফায়ার’ নামক ব্যবস্থা রাষ্ট্র, পুলিশ ও প্রশাসনের সাফল্যের চিত্র বহন করে না। আত্মরক্ষার জন্য পুলিশের গুলি চালানোর অধিকার একেবারেই আইনসিদ্ধ। কিন্তু সেটি কখন কতটুকু কীভাবে হতে পারে, সেটারও একটা আইনসিদ্ধ পদ্ধতি আছে।

দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন গতকাল মঙ্গলবার নোয়াখালীর নিষ্ঠুর হিংস্রতা সহ সামগ্রিকভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে প্রথম পাতায় বিশেষ আয়োজন করে অনেক রিপোর্ট করেছে, বিশিষ্টজনদের সাক্ষাৎকার ছেপেছে। ‘এ বীভৎসতার শেষ কোথায়’– শিরোনামের এই অংশে শিক্ষক ও সাহিত্যিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য আন্দোলনে যেতে হবে, কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন বলেছেন, অপরাধীদের শাস্তি দেখলে মানুষ সতর্ক হবে এবং লেখক সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ চাই। তারা তিনজনই বিচার চেয়েছেন, কিন্তু সংবিধান প্রদত্ত বিচার ব্যবস্থার মধ্যেই। যদি আইন পরিবর্তন করতে হয়, আরও  কঠোর করতে হয়, তবে নিশ্চয়ই সরকারকে তা বিবেচনায় নিতে হবে।

দেশজুড়ে ধর্ষণের সংখ্যা ও পরিধি ক্রমশ বাড়ছে। সমতল থেকে পাহাড়, শহর থেকে একদম গ্রাম, ছোট্ট শিশু থেকে সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ এবং ছেলে শিশু-কিশোর–কেউই বাদ যাচ্ছে না ধর্ষণ থেকে। যেখানে সেখানে যেন ওঁৎ পেতে আছে ধর্ষক-নরখাদকের দল। গত ৯ মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৭৫ জন নারী। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৮ জন নারী। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৩ জন হতভাগা নারী। আর আত্মহত্যা করেছেন ১২ জন নারী। সম্প্রতি গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানিয়েছে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। চিত্রটা ভয়াবহ। প্রতিদিনই যেন সংযোজিত হচ্ছে নতুন নতুন ধর্ষণের ঘটনা।

এক মাসেরও বেশিদিন পর বের হয়েছে, নোয়াখালীর ঘটনা। কিন্তু কত ঘটনা লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায় সেটা আমরা জানি না। গুমরে ওঠা বোবা কান্নায় নীরবে শেষ হয়ে যায় কত-শত নারীর জীবন, তার খোঁজও পাই না।

যারা ক্রসফায়ার চেয়েছেন তারা পাল্টা প্রশ্ন করবেন নিশ্চয় যে বিচার প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ থেকে কবে উপযুক্ত সাজা পাবে অপরাধীরা? ধর্ষক ধরা পড়ে, জামিনে বের হয়ে এসে ধর্ষণের শিকার যারা হন তাদের পরিবারকে আরও বেশি নিপীড়ন করতে থাকে। তাই ঘটনার শিকার যারা হন, আর যারা ক্ষুব্ধ হন তারা ক্রসফায়ারের দাবি তোলেন। কিন্তু আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যেতে পারি না, অপরাধ জঘন্যতম হলেও এভাবে তার প্রতিকার করা একদমই সঠিক পথ নয়।

আবেগের তাড়নায় অনেক কিছুই দাবি করা যায়, কিন্তু এমন ব্যবস্থার কথা বলা যায় না যা দেশের আইন-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে পুলিশকে করে তুলবে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তাই জাতির সামনে আজ  বড় প্রশ্ন ক্রসফায়ারকেই কি ধর্ষকদের শাস্তিদানের ক্ষেত্রে নিদর্শন হয়ে উঠবে, নাকি আমরা ভরসা রাখবো বিচারব্যবস্থার ওপর? আস্থা বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপরই রাখতে চাই। আইনের দুর্বলতা যদি থাকে সেটা সংশোধন করা হোক। কী করে ধর্ষণ কাণ্ডের বিচার আরও দ্রুত করা যায় সেটা করা হোক। আমরা সবাই দাবি তুলি–ধর্ষণের ক্ষেত্রে অতি দ্রুততার সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কঠোরতম শাস্তি প্রদানের জন্য নতুন আইন প্রবর্তন করা হোক। একই সঙ্গে প্রতিটি ঘটনায় জবাবদিহিতার আওতায় আনা হোক এলাকার জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের লোকদের।

ধর্ষণ এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি। এই রোগকে দেশ থেকে নির্মূল করতে হলে বিকৃতকাম ধর্ষকদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নিদর্শন স্থাপন করতেই হবে। ধর্ষণের খবর প্রচুর আসছে গণমাধ্যমে ও সামাজিক মাধ্যমে। ধর্ষকদের বিচার হচ্ছে এমন খবরও ব্যাপকভাবে দেখতে চায় মানুষ। অপরাধীর এমন শাস্তি হতে হবে যা দেখে ভয়ে হাড় হিম হয়ে যায় আগামীর ধর্ষকদের শরীর। ভয়ংকর পরিণতির কথা ভেবে কোনও নারীর ওপর নির্যাতন করার আগে যেন সহস্রবার চিন্তা করে ধর্ষকের দল।

অনেক আইন প্রণেতাও বিচারবহির্ভূত হত্যার পক্ষে কথা বলেন অনেক সময়। এটা ঠিক নয়। এই ভাবনাটা মারাত্মক একটা ইঙ্গিত বহন করে। এর ফলে মানুষের আইন এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস ভেঙে যায়। সেই প্রতিষ্ঠান রক্ষা করার দায়িত্ব তাদের এবং আমাদের সবার।

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ