দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিতেও ধর্ষণ বন্ধ হবে না

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৫:২৬, অক্টোবর ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৭, অক্টোবর ১২, ২০২০

আমীন আল রশীদসুযোগ পেলেই কি আপনি ধর্ষণ করবেন বা ধর্ষক হয়ে উঠবেন? বিশ্বাস করি, যারা এই লেখা পড়ছেন, তাদের কেউই সুযোগ পেলেও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে জড়াবেন না। কারণ তারা প্রথমত জানেন, এটি অন্যায়। দ্বিতীয়ত এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তৃতীয়ত এটি পাপ। চতুর্থত এই সমাজ ও রাষ্ট্র ধর্ষণ অনুমোদন করে না এবং আপনি সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে হেয় হতে চান না।
এবার এই প্রশ্নটা আমরা যদি একজন ধর্ষককে করি, আপনি কেন ধর্ষণ করলেন বা একজন নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কেন তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করলেন? ধর্ষণে তো যৌনসুখও নেই। তাহলে আপনি কেন এই কাজটি করতে গেলেন? যখন আপনি একজন নারীকে একা বা দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করতে গেলেন, তখন আপনার মনে কি কোনও ভয় তৈরি হয়নি বা আপনার কি এটি মনে হয়নি যে এই ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনেই আপনাকে বড় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবেও আপনি একজন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবেন? শুধু আপনি একা নন, আপনার পুরো পরিবারকে মানুষ ধর্ষকের পরিবার হিসেবে জানবে—এই উপলব্ধিটুকু কি আপনার মনে জাগ্রত হয়নি?

সবচেয়ে জরুরি যে প্রশ্নটির উত্তর জানা দরকার তা হলো, অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলেই কি সেই অপরাধ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়? দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মানদণ্ডই বা কী? প্রচলিত আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে দৃষ্টান্তমূলক হয়, এমন কোনও শাস্তি কি রাষ্ট্র অনুমোদন করে? ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যার সপক্ষেও যে জনমত রয়েছে, তাতে এই প্রশ্নটিও এখন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই যে, বছরের পর বছর ধরেই তো ক্রসফায়ারে মানুষ মারা হচ্ছে। ধরা যাক ক্রসফায়ারে নিহতদের অধিকাংশই বড় অপরাধী। কিন্তু তাই বলে সমাজ কি অপরাধমুক্ত হয়েছে? ক্রসফায়ারে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্তও অনেকে নিহত হয়েছেন। যদিও বিচার শেষ হওয়ার আগে এটি বলার সুযোগ নেই যে তিনি আসলেই ধর্ষণ করেছেন। কিন্তু তারপরও ধরা যাক, ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলার যেসব আসামি এর আগে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন, তারা আসলেই অপরাধটি করেছেন। কিন্তু তারপরও কি ধর্ষণ বন্ধ হয়েছে। তার মানে কি ক্রসফায়ারও ধর্ষণ বন্ধের জন্য যথেষ্ট নয়?

এসব প্রশ্নের উত্তর জানার আগে বরং এই বিশ্লেষণটা জরুরি যে, মানুষ কেন ধর্ষণ করে বা একজন মানুষ কেন এবং কীভাবে ধর্ষক হয়ে ওঠে? এর প্রক্রিয়াটাই বা কী? হঠাৎ করে কেউ কি ধর্ষক হয়ে উঠতে পারে?  

নোয়াখালীর যে ‘মানুষেরা’ ঘরের ভেতরে ঢুকে একজন নারীকে বিবস্ত্র করে পেটালো এবং ধর্ষণের অভিযোগও উঠেছে, তাদের সঙ্গে সিলেটের এমসি কলেজের একটি আবাসিক হলে নিয়ে একজন নারীকে গণধর্ষণের খুব বেশি পার্থক্য নেই। সব ঘটনাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পৌরুষ দেখানোর উদাহরণ। যেহেতু সে নিজেকে পুরুষ দাবি করে, ফলে সে এই পৌরুষের ক্ষমতাটি দেখাতে চায়। সেটি কখনও নিজের স্ত্রীর সঙ্গে; কখনও প্রতিবেশীর সঙ্গে; কখনও রাস্তাঘাটে, শপিংমলে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কিংবা কোনও নিরিবিলি জায়গায়। নারীর প্রতি তার ভালোবাসা-ঈর্ষা-মোহ-লালসা নাকি ক্ষোভ—তা অনেক সময়ই ঠিক বোঝা যায় না। ফলে কখনও সে নারীর শাড়ি ধরে টান দেয়; কখনও জোর করে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে; কখনও নারীকে বিবস্ত্র করে তার অতিস্পর্শকাতর জায়গায় ক্ষমতার দণ্ড লাঠি দিয়ে আঘাত করে।

পুরুষের এই ক্ষমতার পেছনে অনেক সময়ই সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ও বড় ভূমিকা পালন করে। যে লোকগুলো দেখতে মানুষের মতো কিন্তু মানুষ নয়, তারা যখন সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে, যখন তার মধ্যে এই উপলব্ধি ক্রিয়াশীল হয় যে, একজন নারীকে বিবস্ত্র করে পেটালে কিংবা স্বামীর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে ধর্ষণ করলে অথবা প্রকাশ্য রাস্তায় একজন নারীকে নাজেহাল করলেও এই সমাজ ও রাষ্ট্রে তার সুরক্ষার নানারকম উপায় বিদ্যমান—তখন সে সাহসী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ ঘরে ঢুকে একজন নারীকে বিবস্ত্র করলে কিংবা ধর্ষণ করলে যে ভয়াবহ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে—এই বোধটি মনের ভেতরে জাগ্রত না হলেই তার কথিত পৌরুষ জেগে ওঠে।

ধর্ষণসহ আরও নানা অপরাধে যখন বারবার ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নাম আসতে শুরু করে, তখন এই বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা চলে যে, অপরাধীর কোনও দল নেই বা তারা অনুপ্রবেশকারী অথবা ষড়যন্ত্রকারী ইত্যাদি। ধরা যাক, যাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠেছে, এমনকি সম্প্রতি সিলেটে এক নারীকে গণধর্ষণের ঘটনায় ছাত্রলীগের যে কর্মীদের নাম এসেছে, তারা আসলেই অনুপ্রবেশকারী বা সরকার এবং আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে তারা এসব করেছে। প্রশ্ন হলো, এরকম একটি পরিস্থিতি তো তৈরি হয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় থাকলে, তাতে তিনি দলের পুরনো কর্মী হোন কিংবা অনুপ্রবেশকারী—তাতে তিনি একধরনের সুরক্ষা পাবেন। অর্থাৎ তিনি যখন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ কিংবা আওয়ামী লীগের কোনও পরিচয় বহন করেন, তখন তিনি কোনও অপরাধ করলেও যতক্ষণ না এটি নিয়ে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় হচ্ছে, ততক্ষণ পুলিশ তাকে ধরছে না। যতক্ষণ না এটি নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে ততক্ষণ সমাজের মানুষও তার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। দলীয় বা সাংগঠনিক পরিচয় আছে বলেই তো তিনি একজন নারীকে ঘরের ভেতরে ঢুকে ধর্ষণ করার পরে তার আইনি সুরক্ষা তো দূরে থাক, তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা বা এলাকা ছাড়া করার সাহস পাচ্ছেন।

সালিশ ও বিচারের নামে; বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করে দেওয়ার নামে পাড়ায় পাড়ায় যে বিশাল মাস্তান চক্র গড়ে উঠেছে, তাদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের কোনও না কোনও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এসব চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছে—এরকম শোনা যায় না। তার মানে স্থানীয় পর্যায়ে এই যে মাস্তান চক্র গড়ে উঠেছে, যারা স্থানীয়ভাবে নিয়মিত চাঁদাবাজি এবং বিরোধপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় সুরাহার নামে ক্ষমতার প্রদর্শন করে, সেটি প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতিই বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য এবং এই মাস্তানচক্র মিলেই নানারকম অপরাধ করে এবং কথিত অপরাধ দমনের নামে তারা নিজেরাই অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে।  

সুতরাং ঘটনা নিয়ে তোলপাড় হওয়ার পরে অপরাধীদের গ্রেফতার করা হলো, বিচার করা হলো—তাতে নির্দিষ্ট একটি ঘটনার সুরাহা হয়তো হবে, কিন্তু দলীয় বা সাংগঠনিক পরিচয়ে অপরাধ করার যে সাহস, যে প্রবণতা, যে সুরক্ষাবলয় তৈরি হয়েছে, সেটি ভাঙবে কে?

আজ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে বলে দায়টা তার। কিন্তু অতীতে যেসব দল ক্ষমতায় ছিল, তাদের মূল এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও এই দলীয় পরিচয়কেই সুরক্ষাবর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তারাও ঠিক একই কাজ করবেন। সুতরাং একটি দুটি ঘটনা নিয়ে তোলপাড় হলে অপরাধীদের ধরে তথাকথিত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলেও সামগ্রিকভাবে অপরাধ দমনে এটির কোনও ভূমিকা নেই। যতক্ষণ না দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করার প্রবণতা আইনি এবং সাংগঠনিকভাবে নিষিদ্ধ করা না যাচ্ছে। কিন্তু এটি খুব সহজ নয়। কারণ যারা দলীয় বা সাংগঠনিক পরিচয়ে ধর্ষণ, খুন, লুটপাট করেন—তাদেরকে প্রধানত তিনটি কারণে মূল দলের প্রয়োজন হয়। ১. প্রতিপক্ষ দমন, ২. নির্বাচনি দায়িত্ব পালন এবং ৩. স্থানীয় পর্যায়ে মূল দলের বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন। সুতরাং বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি ঘটনায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলেও সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর এই চরিত্র পরিবর্তন করা না গেলে বা না হলে সমাজ থেকে কোনও অপরাধই পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে না। সেই সঙ্গে অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় জানাজানি হয়ে গেলে তাকে অনুপ্রবেশকারী বা ঘটনাকে স্যাবোটাজ (চক্রান্ত) বলে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসা জরুরি।  

এবার আসা যাক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রসঙ্গে। যখনই বড় কোনও অপরাধ হয়, সাধারণ মানুষের তরফে এর দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। এবারও যখন কয়েকটি ধর্ষণ ও গণধর্ষণের খবর গণমাধ্যমের শিরোনাম হলো, তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে লিখেছেন, ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে দেওয়া হোক, প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হোক, ক্রসফায়ার দেওয়া হোক ইত্যাদি। অর্থাৎ মানুষ এমন শাস্তি চায় যাতে এ ধরনের অপরাধ করতে ভবিষ্যতে কেউ সাহস না পায়। কিন্তু একটি বর্বরতার শাস্তি আরেকটি বর্বরতার মাধ্যমে হয় কিনা, সেটিও প্রশ্ন। বিশ্বের বহু দেশ ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করেছে। পক্ষান্তরে বিচারের মানদণ্ডটি যদি ভুক্তভোগীর জায়গায় বসে দেখা হয় তখন এটির ডাইমেনশন আলাদা। যেমন যার সন্তান ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বা যিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তিনি ধর্ষকের হয়তো আরও বড় শাস্তি চান। তার কাছে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে দেওয়া বা তাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলাও হয়তো যথেষ্ট নয়। কারণ অপরাধীর চূড়ান্ত শাস্তি হলেও যে নারী সম্ভ্রম হারিয়েছেন তিনি সেটি কোনোদিন ফিরে পাবেন না। তার ক্ষতিপূরণের কোনও ব্যবস্থা নেই। ওই নারীর পরিবার সারা জীবন যে ট্রমার ভেতর দিয়ে যাবে, তা থেকে বেরিয়ে আসার কোনও ব্যবস্থা নেই। সুতরাং ধরা পড়ার পরে আপনি ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে দিলেন নাকি প্রকাশ্যে ফাঁসি দিলেন অথবা ক্রসফায়ার—তাতে ভুক্তভোগী নারী এবং তার পরিবার হয়তো কিছুটা মানসিক শান্তি পাবেন, আখেরে যেসব কারণে মানুষ ধর্ষক হয়ে ওঠে বা উঠতে পারে, সেই পথগুলো বন্ধ করা না গেলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও কোনও সমাধান নয়।

 

তারাই অপরাধে জড়ায় যারা মনে করে অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে। পুরান ঢাকায় বিশ্বজিৎ নামে এক দর্জি দোকানিকে যে তরুণরা প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল, তারা জানতো এই ঘটনা কারও না কারও ক্যামেরায় বন্দি হবেই। বুয়েটের যে শিক্ষার্থীরা তাদের সহপাঠীকে পিটিয়ে হত্যা করলো, তারাও কি জানতো না কোথাও কোথাও সিসি ক্যামেরায় তাদের গতিবিধি রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে? কিন্তু তাদের মনে এই বিশ্বাস ছিল, তাদের কিছুই হবে না। কারণ তারা ক্ষমতার বলয়ের ভেতরে আছে। যুগে যুগে ক্ষমতার বলয়ে থাকা মানুষেরাই অপরাধে জড়ায়। সুতরাং সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির চেয়েও বেশি জরুরি ক্ষমতার এই বলয় বা বৃত্তকে দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করা। সেটি খুব সহজ কাজ নয়।

লেখক: সাংবাদিক।

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ