ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাইবার আগে ভাবুন

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:১১, অক্টোবর ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৬, অক্টোবর ১২, ২০২০

ডা. জাহেদ উর রহমানচারদিকে ‘মৃত্যু চাই’-এর গগনবিদারী আওয়াজ উঠছে; ধর্ষণ-নারী নির্যাতনকারীদের মৃত্যু। মৃত্যু চাওয়ার মধ্যে আবার দুই পক্ষ আছে–এক পক্ষ বিচারের ধার ধারে না, তারা বলেন অভিযুক্তকে ধরে ঠান্ডা মাথায় স্রেফ খুন করে ফেলো। এই দলে এখন শুধু সাধারণ মানুষই নয়, আছে ‘অসাধারণ’ মানুষও–রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বিরাট কবি, বিরাট সাংবাদিক। আরেক পক্ষ অবশ্য সংবিধান আর আইনে বিশ্বাসী, তাই তারা বিচারিক পথে মৃত্যু চান; ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানান।
আমাদের দেশে সবাই মনে করছে অপরাধের জন্য মানুষকে মেরে ফেললেই অপরাধ কমে যাবে। গত বছর পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকায় যাওয়ার পথে মূল্য বাড়ানোর সিন্ডিকেটের কয়েকজনকে ক্রসফায়ার করে হত্যার পরামর্শ এসেছিল সংসদে। করোনার সময় স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি এবং করোনা টেস্টের ফলাফল জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের ক্রসফায়ার করে মেরে ফেলার পরামর্শ এই সংসদেই এসেছিল। 

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের এবারের ঘটনাটি দেখে কিংবা তার আগে যারা বিচারবহির্ভূত হত্যা করা নিয়ে কথা বলেছেন সেটা নিয়ে কোনোরকম কোনও আলোচনাই হতে পারে না। এমন দাবি যারা করেন একটা আধুনিক রাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের সীমাহীন মূর্খতাকে নিয়ে করুণাই করা যায় শুধু।

আলোচনা হতে পারে বিচারিক মৃত্যুদণ্ড নিয়ে। মৃত্যুদণ্ড বীভৎসতম অপরাধ কমাতে পারে এই ধারণার কোনও যৌক্তিক এবং পরিসংখ্যানগত ভিত্তি নেই। যে কোনও অপরাধের শাস্তি হিসেবে বিচারিক মৃত্যুদণ্ড‌ও বন্ধ করার ব্যাপারে আমাদের সমাজে আলোচনা শুরু হ‌ওয়া উচিত ছিল অনেক আগেই। কিন্তু হয়নি সেটা। এই বিষয়টা নিয়ে সহসাই লিখবো আশা করছি।

ভারতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ছিল না। ২০১২ সালে ‘নির্ভয়া’ ছদ্মনামের এক নারী দিল্লিতে বাসে গণধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করার পর তুমুল আন্দোলনের মুখে ভারতে ধর্ষণের আইনের সংস্কার করে তাতে মৃত্যুদণ্ড যুক্ত করা হয়। আমরা জানি এই বছরেরই মার্চে সেই ধর্ষণে জড়িতদের চারজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।

সারা ভারতকে কাঁপিয়ে দেওয়া উক্ত ধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটির তিন বছর পর ২০১৫ সালে বিবিসি ‘India’s daughter’ নামের একটি ডকুমেন্টরি তৈরি করেছিল। সরকারের বাধার মুখে ভারতে সেটা সম্প্রচারিত হতে না পারলেও ইউটিউবে প্রকাশিত হয়েছিল। এখন অবশ্য ডকুমেন্টরিটি ইউটিউবেও পাওয়া যায় না। 

ওই প্রামাণ্যচিত্রে নির্ভয়ার ধর্ষকদের একজন, মুকেশ সিং-এর (তখন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত) বক্তব্য আছে। সেখানে সে অনুতাপহীনভাবে যা বলেছে তা মোটামুটিভাবে এরকম—‘নির্ভয়ার কোনোভাবেই উচিত হয়নি ধর্ষণে বাধা দেওয়া। সে যদি বাধাহীনভাবে ধর্ষণ করতে দিতো তাহলে তারা তাকে ধর্ষণ করে নিরাপদে ছেড়ে দিতো। তার কথামতো ভদ্র মেয়েরা কখনও রাত ৯টার দিকে ঘুরে বেড়ায় না। ধর্ষণের জন্য একটা ছেলে যতটা দায়ী, একজন মেয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী। মেয়েদের কাজ হলো ঘরের কাজ করা, সংসার সামলানো। রাতে ডিসকো নাচে যাওয়া ও বারে ঘুরে বেড়ানো, আজেবাজে কাজ করা, ভুলভাল পোশাক পরা তাদের কাজ নয়। এ ধরনের মেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার অধিকার অন্যদের আছে। কেবল ২০ শতাংশ মেয়ে ভালো।’ 

মুকেশ সিং আর যা বলেছে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে বলেছিল ধর্ষণের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হলে তাতে ধর্ষণ তো কমবেই না, বরং আরও খারাপ হবে। তার ব্যাখ্যা হচ্ছে, মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হলে ধর্ষকরা সাক্ষী না রাখার জন্য ধর্ষণের শিকার নারীকে আর বাঁচিয়ে রাখবে না, স্রেফ মেরে ফেলবে। মুকেশ সিং কি সঠিক? 

মুকেশ সঠিক। এটা এখন পরিসংখ্যানগতভাবেই বলা যায়, মৃত্যুদণ্ডকে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করার পর ভারতে ধর্ষণের পর ধর্ষণের শিকার নারীকে হত্যার প্রবণতা বেড়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার নারীদের হত্যার হার ৩১ শতাংশ বেড়েছে। ভারতের বিশ্লেষকরাও বলছেন মৃত্যুদণ্ডের সাজার কারণে চরম সাক্ষীকে বাঁচিয়ে রাখাটাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে ধর্ষকরা।

বেগমগঞ্জের ঘটনাটির পরে চারদিক থেকে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার জোর দাবি উঠেছে। দেখা যাচ্ছে সরকার এই দাবি মেনেও নিয়েছে। আইনমন্ত্রীও জানিয়ে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে আজ (১২ অক্টোবর) মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২০’ চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশে সর্বোচ্চ শাস্তি করা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। মামলা শুরু থেকে বিচার শেষ করতে হবে ছয় মাস বা ১৮০ দিনের মধ্যে।

আমরা যারা ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দাবি করছি, তারা কি এটা ভেবে দেখেছি, এর মাধ্যমে আমরা অনেক নারীর মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করছি? এটা এখন তাত্ত্বিকভাবে ভাবার বিষয় না। ভারতের পরিস্থিতির পরিসংখ্যান আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে আছে। আরেকটা দিকও আছে এর। 

ঢাকার মঞ্চে সর্বাধিক মঞ্চায়িত নাটক কঞ্জুস-এর কথা মনে পড়ছে নোয়াখালীর বীভৎস নির্যাতনের ঘটনাটির পর আমাদের প্রতিক্রিয়া দেখে। ওই নাটকে কঞ্জুসের বাসায় দুজন কর্মী কাজ করে—লাল মিয়া আর কালা মিয়া। সংলাপটা কার মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল সেটা খুব মনে পড়ে না, তবে এই দুইজনের একজনের। সে বলে কঞ্জুস তাদেরকে বেতন দেয় না, কিন্তু যখনই তারা বেতন চাইতে যায়, তখনই তাদের বেতন বাড়িয়ে দেওয়া হয়। 

আমরা ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি চাইছি মৃত্যুদণ্ড। আমরা কি জানি ধর্ষণের সাজার হার কত? বাংলাদেশে নানা কারণে ধর্ষণের মামলা হয় প্রকৃত ধর্ষণের সংখ্যার এক অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। আবার মামলা হওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে ধর্ষকের সাজা হয় তিন শতাংশ ক্ষেত্রে। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ অভিযুক্ত পার পেয়ে যায়। বর্তমান সাজাই যেখানে আমরা নিশ্চিত করতে পারছি না, সাজা হবার পরিমাণ এত তুচ্ছ,‌ সেখানে ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড করলেই বা কী? বর্তমান শাস্তি নিশ্চিত না করে আরও বেশি শাস্তি আইনে যুক্ত করা মানে কি কঞ্জুস নাটকের গৃহকর্মীকে বর্তমান বেতন না দিয়ে বেতন বাড়িয়ে দেওয়ার মতো হয়ে গেলো না?

আমরা কি কেউ খেয়াল করেছি ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড চেয়ে গগনবিদারী আওয়াজ তুলে আমরা আসলে ধর্ষণের বিচারহীনতার বিষয়ে মনোযোগ হারিয়ে ফেলছি? সেই বিচারহীনতা কেন, তার পেছনে কী কী বিষয় জড়িত, সেগুলো নিয়েও আমরা আলাপ-আলোচনা করছি না প্রায়। এর অবশ্যম্ভাবী ফল হচ্ছে ধর্ষণ-নারী নির্যাতনের ভয়ঙ্কর সব ঘটনার নিয়মিত পুনরাবৃত্তি।

ধরে নেওয়া যাক কিছুদিনের মধ্যেই সরকার ঘোষণা দিয়ে দিলো ধর্ষণের সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড হবে। তো আমরা সবাই কি বাড়ি ফিরে যাবো? আমরা সবাই ফেসবুকেও হট্টগোল বন্ধ করে দেবো? আমরা সবাই কি আশ্বস্ত হয়ে যাবো যে মৃত্যুদণ্ড রেখে আইন প্রণয়নই হবে নারীর রক্ষাকবচ?

না, রক্ষাকবচ হবে না। একটা উদার, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করে সত্যিকারভাবে অপরাধ কমানোর জন্য কাঠামোগত পদক্ষেপ না নিলে অপরাধ কমবে না। বরং আমাদের মৃত্যুদণ্ড প্রীতি সম্ভবত বেশ কিছু ধর্ষণ ভিকটিমের প্রাণনাশের কারণ হতে যাচ্ছে।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ