নালিশে না পড়ুক পুলিশ

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৭:০২, অক্টোবর ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৩, অক্টোবর ১৭, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহকত মানুষের স্নেহ, ভালোবাসা নিয়ে মহানগরে বয়স বেড়েছে। অবস্থানগত দূরত্ব বাড়লেও তাদের প্রশ্রয়ের চৌহদ্দির মধ্যেই আছি। সেইরকম একজন প্রিয় মানুষের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখলাম সকালে। তার বাড়িতে যাতায়াত ছিল। সেখানে ওনার স্বামীর সঙ্গেও দেখা হতো। কথা হয়েছে দুয়েকবার। তিনি পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তখন। পুলিশের পোশাকের প্রতি আমার আজন্মের প্রেম ও শ্রদ্ধা। বংশলতিকার গোড়ার দিক থেকে অনেকটা সময় জুড়ে পুলিশ বিভাগে আমার স্বজনরা। তাই ওনার প্রতি বাড়তি শ্রদ্ধা ছিল। সেই প্রিয়জন স্ট্যাটাসে পুলিশ বিভাগ নিয়ে কিছু আত্মসমালোচনা করেছেন। দেখলাম কয়েকদিন ধরে, বিশেষ করে সিলেটে পুলিশ হেফাজতে রায়হান নামক এক তরুণের মৃত্যুতে আকবর নামে একজন সাব-ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসার পর থেকে একই কথা ভাবছিলাম। এই ভাবনার ভ্রূণ তৈরি হয় অবশ্য আরও আগে, ঢাকার বাইরে কর্মরত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আড্ডায়। তারা বলছিলেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং মাঠের সাব-ইন্সপেক্টর, সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর কোনও কোনও ক্ষেত্রে কনস্টেবলদের কাছেও তারা জিম্মি হয়ে পড়েন। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, প্রথমত চাকরি পেতে প্রথম দফাতেই তাদের বিনিয়োগ করতে হয়। তারপর ভালো জায়গায় পোস্টিং পেতে বিনিয়োগ। পোস্টিংয়ে ‘নিলাম’ প্রথার কথাও শোনা যায়। এসব বিনিয়োগ অপ্রাতিষ্ঠানিক। কিন্তু যিনি এমন বিনিয়োগ করে চাকরিতে আসবেন, তিনি তো মূলধন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পাশাপাশি লাভ তুলে নিতে চাইবেনই। লভ্যাংশসহ মূলধন তুলে নিতে তিনি অনৈতিকতার আশ্রয় নেন। এবং কোনও আইন, বিধিকে তোয়াক্কা করেন না। নিজের বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার পাশাপাশি সহকর্মীদেরও তাকে তারল্যের জোগান দিতে হয়, তাই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তারা। তখন অনেকক্ষেত্রেই তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ তোয়াক্কা করেন না। দ্বিতীয়ত, এসব পর্যায়ের নিয়োগে রাজনৈতিক পছন্দের বিষয় থাকে। তাই ওই কর্মকর্তারা নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক দল বা তদবিরকারী রাজনৈতিক নেতার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে শুরু করেন। এ কারণেও তারা ঊর্ধ্বতনদের পরোয়া করতে চান না। কিন্তু তাদের অনেকে অনৈতিকতার দায় শুধু ঊর্ধ্বতন কর্তাদেরই না, পুরো পুলিশ বিভাগকেই নিতে হয়েছে এবং হচ্ছে।

স্ট্যাটাসে প্রিয়জন একই কথার প্রতিধ্বনি করেছেন। সিলেটে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ ওঠার পর, আমার একজন সহকর্মী পুলিশের একজন সাবেক বড় কর্তার কাছে ফোন করেছিলেন, মন্তব্য নেওয়ার জন্য। তার মুখেও একই কথা। তিনিও বিব্রত।

অনুযোগ শুনেছি নিচের দিক থেকেও। কোনও কোনও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার খামখেয়ালিপনা, ওপর মহলকে খুশি করার অবাস্তব কর্মকাণ্ড এবং তারল্য জোগানে মাঠের সদস্যদের ও মানসিক চাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে কখনও কখনও। কর্তা বদল হলেই কেবল স্বস্তি। এ ধরনের কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে হয় না। হয় ব্যক্তির খুশিতে। এ ধরনের কাজ করতে গিয়েও বদনামের ভাগিদার হতে হয় পুলিশের সকল স্তরের সদস্যদের। যতটুকু কথাবার্তা হয়েছে পুলিশ কর্তাদের সঙ্গে গণমাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে, বেশিরভাগ দুর্ঘটনাই ঘটেছে কোনও কোনও অতিউৎসাহী সদস্য বা কর্তাদের পারফরমেন্সের জন্য। দায়তো উঠে আসে পুরো পুলিশ বিভাগের কাঁধেই।

আমার সেই প্রিয়জন পুলিশ বিভাগের ব্যাপক সংস্কার নিয়ে কথা বলেননি। তিনি সহজ করে বলেছেন, চাকরি দেওয়ার প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিমুক্ত করা হোক। চাকরির পরীক্ষা যেন লোক দেখানো না হয়। রাজনৈতিক অতীতেই সীমিত না থেকে দেখা হোক ব্যক্তি ও পরিবারের নৈতিকতা। চাকরিতে যারা আছেন, তাদের কতটা অতিরিক্ত ডিউটি করতে হয়? পোস্টিং, পদোন্নতি, পুরস্কারকে যোগ্যতার মাপকাঠিতে আনতে হবে, উৎকোচের ওজনে নয়। গুরুত্ব দিতে হবে প্রশিক্ষণেও। আমারও মনে হয় গোড়ায় গলদ রেখে কারও কাছ থেকে সঠিক সেবা কিংবা চৌকশ পারফরমেন্স প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X