ভালো নেই কৃষিযোদ্ধা গ্রামীণ নারী

Send
সানজিদা খান রিপা
প্রকাশিত : ১১:২৫, অক্টোবর ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৬, অক্টোবর ২৯, ২০২০

সানজিদা খান রিপাকরোনাভাইরাস মহামারির প্রলয়ঙ্করী আঘাতে গোটা পৃথিবীর মানুষ যখন শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, তখন গ্রামীণ নারীরা আমাদের প্লেটের খাবার সরবরাহের জন্য কঠিন লড়াই করে চলেছেন। তাদের বসতবাড়ির পুষ্টিবাগান ও খামারগুলো আমাদের সবার ডাইনিং টেবিলে প্রতিদিন তিনবেলা খাদ্য-পুষ্টির জোগান দিয়ে আমাদের মরণঘাতি মহামারি করোনাভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধে জেতার জন্য পর্যাপ্ত ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করছে।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দীর্ঘদিন সরকারি সাধারণ ছুটি থাকায় থমকে গিয়েছিল আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বাড়তি কাজ না থাকায় আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অক্লান্তভাবে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে নারীরা মাঠের ফসল ঘরে তুলেছেন। সব ধরনের পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বাজারজাত তখন সম্ভব ছিল না। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই তাঁরা অধিক কম মূল্যে ফসল বিক্রি করেছেন। সাধারণ সময়ে যখন ১৮শ থেকে ২ হাজার টাকা মণে গম বা খেসারি বিক্রি করতেন, সেখানে করোনার কারণে মণপ্রতি হাজার টাকার নিচে তারা ফসল বিক্রি করেছেন। এছাড়াও, করোনার ভয়াবহতার পাশাপাশি পরপর দুইবার বন্যায় ফসলহানি ঘটেছে। এ সময় গ্রামের নারী কৃষকরা নিজেরা কোনোরকমে খেয়ে না খেয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। তারপরও তারা আশা হারায়নি। মুখে হাসি আর বুকে আশা নিয়ে তারা নতুন স্বপ্নের বীজ বপন করেছেন ফসলের মাঠে।

আমাদের দেশে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার অগ্রগামী যোদ্ধা মূলত গ্রামীণ নারীরাই। তারাই কৃষির মেরুদণ্ড। বর্তমানে আমাদের দেশে ৭২.৬ শতাংশ নারী কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। সরকারের এই হিসাব বলছে কৃষি এখন নারীর হাতে। নারীরাই কৃষি উৎপাদনে ও গবাদিপশু-পাখি পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। একই সঙ্গে তাঁরা পারিবারিক খাদ্য সুরক্ষা ও শিশুদের পুষ্টি সরবরাহের অভিভাবকও বটে। নারীরা একাধারে খাদ্য উৎপাদক, বীজ ও লোকায়ত জ্ঞান সংরক্ষক, কৃষি শ্রমিক, অন্যদিকে খাদ্য প্রস্তুত এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও সংরক্ষণ করে। পুরুষরা কৃষি খাত থেকে অ-কৃষি খাতে বেশি যুক্ত হচ্ছেন এবং কাজের সন্ধানে তাদের শহরমুখী প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষিশ্রমে নারীদের সম্পৃক্ততা দ্রুতহারে বাড়ছে। বর্তমানে কৃষি, শিল্প ও সেবা অর্থনীতির বৃহত্তর এই তিন খাতে ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী কাজ করছেন। এছাড়াও, শুধু কৃষি খাতেই নিয়োজিত আছেন ৯০ লাখ ১১ হাজার নারী। অথচ, তাদের নিজের নামে জমি নেই, কৃষক হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি নেই, সরকারি কৃষিসেবা নেই, প্রয়োজনীয় ঋণ সহায়তা নেই, বাজার ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকারের পরিবেশ নেই আর নিয়ন্ত্রণে থাকা তো দূরের কথা, এমনকি নিজের জন্য পর্যাপ্ত খাবারটুকুও নেই। ক্লান্তিহীনভাবে তিনি সমাজ ও পরিবারের সদস্যদের মাঝে খাদ্য ও পুষ্টি বিলিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বিনিময়ে আমরা তাঁর খাদ্য, পুষ্টি ও অধিকারের কথা চিন্তা করছি না।
জাতিকে ক্ষুধামুক্ত রাখতে এবং অপুষ্টি থেকে বাঁচাতে আমাদের গ্রামীণ নারী কৃষকদের অবদান খুব কমই আলোচিত হয়। তাঁরা উৎপাদন করেন ঠিকই কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের কাজের মূল্যায়ন নেই। তাই তো গ্রামীণ নারীরা তাদের প্রতিদিনের জীবনে নানামুখী প্রতিকূলতা ও লড়াইয়ের মুখোমুখি হন এবং তুলনামূলকভাবে বেশি, বহুমাত্রিক দারিদ্র্যতার শিকার। কৃষি কাজে নিয়োজিত নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিসহ তাদের খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা এখন জরুরি।

কোভিড-১৯ মহামারি গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক অবস্থা, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, এবং স্বাস্থ্যসেবাকে আরও অনেক বেশি হুমকির মুখে ফেলেছে। প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে কোভিড-১৯-এর কারণে নারীরা প্রয়োজনীয় অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যায় মানসম্পন্ন চিকিৎসা, ওষুধ সঠিকভাবে পাচ্ছে না। এমনকি গ্রামীণ নারীরা পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবারও পাচ্ছে না। দেখা গেছে যে কোভিড-১৯ মহামারিতে এবং পূর্বের অন্যান্য দুর্যোগে ও সংকটে গ্রামীণ নারীরাই সবচেয়ে বেশি আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের শিকার হন এবং কষ্ট সহ্য করেন। অথচ ন্যূনতম সুবিধা ছাড়াই গ্রামীণ নারীরা গৃহস্থালি কাজসহ কৃষি উৎপাদন, পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ, প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতা তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় করোনাভাইরাসের প্রভাব নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জীবনকেই নানাভাবে প্রভাবিত ও বিপর্যস্ত করেছে। কিন্তু বিশেষভাবে গ্রামীণ নারীর জীবিকা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহের ওপর এর প্রতিক্রিয়া লক্ষণীয়। কোভিড-১৯ মহামারি সংক্রমণ রোধে দেশে দেশে সরকার মানুষের চলাচলে এবং খাদ্যপণ্য পরিবহণে বিধিনিষেধ আরোপ করে। লকডাউন আর শাটডাউনে খাদ্যপণ্য সরবরাহ এবং বাজারজাত ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে খাদ্য ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় তাঁদের খাদ্য সংকট চরমে পৌঁছায়, বিশেষ করে দরিদ্র প্রান্তিক নারীরা খাদ্য সংকটে ভুক্তভোগী সবচেয়ে বেশি। কারণ, পুরুষরা নানাভাবে সংকট পুষিয়ে নিতে পারলেও নারীরা সে তুলনায় কম সক্ষম। যা গণমাধ্যমে তথ্যচিত্রসহ প্রকাশিত হয়েছে। গ্রামীণ নারীরা তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য নিয়ে বাজারে যেতে না পারার কারণে অধিক কম মূল্যে ফড়িয়াদের নিকট তার কৃষিপণ্যটি বিক্রি করতে বাধ্য হন। তারা যে শুধু ভাইরাসে বেশি সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন তা নয়, তাদের প্রতি সরকারের সুদৃষ্টিও তুলনামূলক কম। স্বাস্থ্যসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা এই দুয়ের মধ্যে কোনোটিতেই গ্রামীণ নারীরা অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। করোনাসৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক এবং সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। আমরা চাই, এই প্যাকেজে বিশেষ করে নারী কৃষক এবং নারী শ্রমিকরা যেন পিতৃতান্ত্রিকতার কষাঘাতে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত না হয়। কোভিড-১৯ সংক্রমণ ও বিস্তার থেকে সুরক্ষায় খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত নারীসহ সব নারী ও শিশুর খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত করা হয়।
 লেখক: প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর, অ্যাসোসিয়েট ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ