মার্কিন নির্বাচন: কে জিতবে এখনও তা সংশয়হীন নয়

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:৫৮, অক্টোবর ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০০, অক্টোবর ২৯, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী২০১৬ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে-পরে অনেক কলাম লিখেছিলাম। তার মধ্যে বাংলা ট্রিবিউনে ১২ মে তারিখে প্রকাশিত লেখার শিরোনাম ছিল ‘মার্কিন নির্বাচন: ট্রাম্পকে পরাজিত করতে পারেন ট্রাম্পই’। অথচ তখন বিশ্বব্যাপী ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের জয়ধ্বনি। ট্রাম্পের জয় সম্পর্কে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্ম নেওয়ার তিনটি কারণ ছিল। প্রথমত, হিলারি একজন মহিলা আর স্বাধীনতার পর ওই দেশের মানুষ প্রেসিডেন্ট পদে কখনও কোনও মহিলাকে নির্বাচিত করেনি। দ্বিতীয় কারণ ছিল, ২০০৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় ছিল। সুতরাং ওই নির্বাচনে অ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্ট-এর একটি প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে হবে। আর তৃতীয় কারণটা ছিল, ট্রাম্পের বর্ণবাদী প্রচারণা উগ্র জাতীয়তাবাদের বিষবাষ্প এমনভাবে ছড়িয়েছে যে সাধারণ মানুষকে বিভক্ত করে ফেলেছিল। আমার ধারণা অহেতুক প্রমাণিত হয়নি। ট্রাম্প পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এবার ২০২০ সালে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও দ্বিতীয়বার রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট পদে ট্রাম্প প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার জন্য ট্রাম্প মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সাধারণত মার্কিনিরা কাউকে একবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করলে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত করার নজির রয়েছে। অনেকে সে হিসাবে মনে করছেন যে ট্রাম্প এবারও নির্বাচিত হবেন। আবার প্রথমবারের রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়টা যে ভোটাররা বিবেচনা করে না তাও নয়। জিমি কার্টারের দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জেতার ব্যর্থতার মুখ্য কারণ ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় তার দুর্বলতাই। ২০১৬ সালে ট্রাম্প ছিল নবাগত, ২০২০ সালে তিনি আর নবাগত নন। তার কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করার জন্য বিগত চার বছরের খতিয়ান ভোটারদের সম্মুখে রয়েছে। যদিওবা তিনি দাবি করেছেন তার ঊর্ধ্বে রয়েছেন শুধু যীশু খ্রিস্ট।
এ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী জো বাইডেন দীর্ঘদিনব্যাপী সিনেটর ছিলেন। সিনেটের বিদেশ বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যানও ছিলেন। আবার ২০০৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। গুণগতমান বিচার করলে উভয় প্রার্থীর মাঝে জো বাইডেন উত্তম।
অন্যদিকে গত চার বছরের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদের ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন। এক বারবনিতার সঙ্গে যৌন কেলেঙ্কারি প্রকাশের হুমকির মুখে তিনি ওই যৌন কর্মীকে কয়েক মিলিয়ন ডলার দিয়েছিলেন। অথচ তিনি এখন নির্বাচনি প্রচারে বলছেন যে, দুর্ভাগ্য জো বাইডেনের মতো এক অযোগ্য প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে তাকে। আফসোস করে বলছেন, যদি পরাজিত হন তবে তাকে দেশ ছেড়ে যেতে হবে।
ট্রাম্পের বেহায়াপনা কোনও ডিগ্রি দিয়ে মাপা যাবে না। তিনি একনাগাড়ে মিথ্যা কথা বলেন। নিজের আত্মীয়-স্বজনকে হোয়াইট হাউজে এনে নিয়োগ দিয়েছেন। আবার নিজের ক্ষমতা তার ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের অতীতে বিরল ঘটনা। বলা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প অন্যতম ধনী লোক অথচ তিনি ট্যাক্স ফাঁকি দেন। তৃতীয় বিশ্বের দেশেও মিথ্যা ট্যাক্স রিটার্ন দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। বিশ্বের মানুষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ, গত চার বছর বিশ্ব ব্যবস্থায় ট্রাম্পের কারণে ভাঙন ধরেছে। বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে গেলে বিশ্ব এক বিশৃঙ্খলার মাঝে পতিত হয়ে অবর্ণনীয় দুর্দশার মাঝে পড়বে।
ট্রাম্প নির্বাচিত হলে আমেরিকা সুপার পাওয়ার হিসেবে গণ্য হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে, এমনকি এখনও বলা যায় এক যুগ আগে আমেরিকার যে পজিশন ছিল সেটা আর নেই। প্যারিস চুক্তি থেকে সরে এসে ট্রাম্প সারা বিশ্বে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন। তিনি বিশ্বাসই করেন না জলবায়ু পরিবর্তন মনুষ্যসৃষ্ট জিনিস। চীনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমনকারী দেশ। ট্রাম্প যদি আবার নির্বাচিত হয় তাহলে বিশ্বের তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং এটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
মুসলিম বিদ্বেষী আমেরিকান রাষ্ট্রপ্রধান এর আগে দেখা যায়নি। নির্বাচিত হওয়ার পর সাতটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মানুষের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ সীমিত করে দেন এবং বর্তমানে ১৩টি দেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রেখেছেন ট্রাম্প। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নির্বাচিত হলে বিদেশে নিয়োগকৃত মার্কিন সৈন্য ফেরত আনবেন। কিন্তু কোনও দেশ থেকেই পুরোপুরি সৈন্য প্রত্যাহার করেননি এবং আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া সব জায়গায় তাদের সৈন্য আছে, তবে আগের তুলনায় কম। ফিলিস্তিন সমস্যা আরও জটিল করেছেন তিনি। ২০১৮ সালে ইসরায়েলের মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে আনেন তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে এবং অধিকৃত জেরুজালেমসহ পুরো শহরটিকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু করেছেন শপথ নেওয়ার আগেই। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টকে ২০১৬ সালে ফোন করেন অথচ আমেরিকার ১৯৭৯ সাল থেকেই তার সঙ্গে সম্পর্ক অনানুষ্ঠানিক করেছে। আর চীন তার ‘এক চীন’ নীতির ঘোরতর পক্ষে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে প্রায় যুদ্ধ বাঁধানোর তালে ছিলেন। তাদের সঙ্গে করা চুক্তি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নিয়ে কড়া অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছেন। সর্বশেষ ইরানের সবচেয়ে শক্তিধর জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করেছেন।
শাসক হিসেবেও ট্রাম্প আমেরিকায়ও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেননি। কোভিড-১৯-এর ভয়াবহভাবে আমেরিকায় প্রাদুর্ভাব হয়েছে। কোভিড-১৯-এ সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে আমেরিকায়। এমনকি ট্রাম্প নিজেই কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। তিন দিন হাসপাতালে থাকার পর তিনি হোয়াইট হাউজে ফিরে এসে নির্বাচনি প্রচারণায় নেমে গেছেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজেস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মতে তার ১৪ দিন আইসোলেশনে থাকার কথা, তিনি তা থাকেননি। তিনি কোভিড-১৯-মুক্ত এ কথাও ঘোষণা দেননি।
অসুস্থতাজনিত কারণে তার কর্মদক্ষতা এবং জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠেছে। ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন এই মহামারিতে বিশ্বের ৫ কোটি মানুষ মারা যায়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তিনি ধীরে ধীরে প্যারালাইজড ও অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কথাটা হোয়াইট হাউজ গোপন রেখেছিল। কিন্তু যখন বিষয়টা প্রকাশ হয়ে যায় তখন সংবিধানে ২৫ সংশোধনী মতে তার বিরুদ্ধে অক্ষমতা, অসুস্থতা ও অকমন্য ইত্যাদির প্রশ্ন তুলে অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। যদি এ নির্বাচনে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হনও তবে তাকে হয়তো পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য মেডিকেল টিমের সম্মুখীন হতে হবে। সে সম্পর্কে কথা উঠেছে।
আমেরিকার নির্বাচন ব্যবস্থা অন্যান্য দেশের মতো নয়। সেখানে পপুলার ভোটের সঙ্গে ৫৩৮টি ইলেকট্রোরেল ভোটও রয়েছেন। পপুলার ভোটে জিতলেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন না যদি ইলেকট্রোরাল ভোটের ন্যূনতম ২৭০ ভোট না পান। পপুলার ভোটে যদি জয় পরাজয় নির্ধারিত হয় তবে ঘুরে ফিরে বড় রাজ্যের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীই বারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। তাকে প্রতিহত করার জন্য মার্কিন স্থপতিরা ইলেকট্রোরাল ভোটের ব্যবস্থা রেখেছেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন পপুলার ভোটে বেশি পাওয়ার পরও ইলেকট্রোরাল ভোট কম পাওয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেননি।
আজকে পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে জনমত জরিপে জো বাইডেন বেশি রাজ্যে এগিয়ে আছেন। যদিওবা জনমত জরিপে শতাংশ আস্থা রাখা যায় না। যাহা হোক, জনমত জরিপকে ভিত্তি ধরে যদি নির্বাচনি ফলাফল সম্পর্কে কথা বলতে হয় এবং যদি ৬০ শতাংশ রাজ্যের জনমত জরিপের কথা সত্য হয়, তবে জো বাইডেনই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। কারণ, যে রাজ্যে যে পপুলার ভোট বেশি পাবেন তিনি ওই রাজ্যের ইলেকট্রোরাল সব ভোটের মালিক হবেন। তাতে জো বাইডেন পপুলার ও ইলেকট্রোরাল ভোট বেশি পাওয়ার কথা। তবে ভোটটা হাড্ডাহাড্ডি হচ্ছে এ কথা উপেক্ষা করা যায় না।
ট্রাম্প পোস্টাল ভোট নিয়ে বিতর্ক তুলেছেন এবং তার বাহিনী নির্বাচনে হেরে গেলে দেশব্যাপী গণ্ডগোল বাঁধানোর পাঁয়তারা করছে। সম্ভবত এবারের নির্বাচনের পর মার্কিন প্রজাতন্ত্রের ভাঙনের ধ্বনি উঠবে। এ বিশ্বে ৩৫০ বছরের ওপরে কোনও সাম্রাজ্য টিকেনি। আমেরিকা শুধু ৫০ প্রদেশ নিয়ে গঠিত দেশ নয়, তার কার্যক্রম সাম্রাজ্যের মতোই। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও বহু আগে থেকে অনুরূপ বার্তা দিয়েছেন। আমেরিকা বিশ্বের একটা বড় দেশ, বড় অর্থনীতি। আমেরিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্বের বিপদ হবে। আমরা কামনা করি আমেরিকা অক্ষত থাক, সুষ্ঠু নেতৃত্ব পাক।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ