আমলারা কেন সহজ শিকার?

Send
মাসুদুল হক
প্রকাশিত : ১৯:৩১, জানুয়ারি ২১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩৬, জানুয়ারি ২৪, ২০১৬

মাসুদুল হকরাষ্ট্র পরিচালনা করে সরকার। সরকারকে সহায়তা করেন কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী। সরকার পরিবর্তন হলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থেকে যান—এটাই সত্য। নতুন একটি সরকার এলে তা আমলতন্ত্রকে বিদায় না জানালেও আমলাতন্ত্রের ভেতরে ব্যক্তি পর্যায়ে পরিবর্তন ঘটে থাকে। নিজের আস্থাভাজন অথবা বিশ্বস্ত আমলাদের প্রতিস্থাপন করা হয় আগের আমলাদের জায়গায়। বাংলাদেশের প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার মধ্যেই প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে একাধিকবার।
বর্তমান প্রচলিত আমলাতন্ত্র কার্যকর না অকার্যকর, তা নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক সরকার। এখন পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক দল প্রচলিত আমলাতন্ত্রকে অদক্ষ মনে করেনি। তবে, আমলাতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের জন্য সময় সময় নানারকম সংস্কার সাধন করেছে। এ সব সংস্কারের উদ্দেশ্য আমলাতন্ত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা আনয়ন করা এবং সরকারি কাজকে গতিশীল করা। এ সব সংস্কার যথেষ্ট ফলদায়ক হয়েছে কি না কিংবা আরও সংস্কার প্রয়োজন কি না, তা অনুধাবন করতে পারবেন কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্ব। আবার আমলাতন্ত্র যদি সংস্কারের পরও যথেষ্ট কার্যকারিতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয় তবে যেকোনও রাজনৈতিক সরকার চাইলেই আমলাতন্ত্রের মডেলটি পরিবর্তন করে ফেলতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আমলাদের কিছুই করার থাকবে না। সুতরাং আমলাতন্ত্র কেমন হবে, কিভাবে এগজিস্ট করবে তা অবশ্যই রাজনৈতিক সরকারের ইচ্ছা; অন্য কারও নয়।
আজকের যে আমলাতন্ত্র তা অনেক পরিবর্তন, সংযোজন-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে একটা রূপ পরিগ্রহণ করেছে। আমলাতন্ত্র এখন আর রাজস্ব আদায়ের হাতিয়ার নয়। জনপ্রিয়তা লাভের জন্য রাজনৈতিক সরকার বিভিন্ন সময় ভূমির খাজনা মওকুফ করতে করতে এমন একটি জায়গায় এটিকে নিয়ে গেছে যে, এখন আর ভূমি উন্নয়ন করের ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের উন্নয়ন বা সেবামূলক কার্যক্রম চালাতে হয় না। ফলে ‘ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র’-এর মূল চিহ্নটি হারিয়ে গেছে ১০০ বছর আগেই। আমলাতন্ত্র এখন মাঠ পর্যায়ে এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উন্নয়ন সমন্বয়, পলিসি তৈরিতে সরকারকে সহায়তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কাজের মান বৃদ্ধি, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও পরীবিক্ষণের মতো কাজে সরকারকে সহায়তা করে। যারা আমলাতন্ত্রকে ‘ঔপনিবেশিক’ বলে প্রোপাগান্ডা চালান, তারা এর ভেতরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলোকে কখনও মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করার সময় করে উঠতে পারেন না।  সবচেয়ে বড় কথা, এক সময় আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত সামরিক সরকারের সঙ্গেও আমলাতন্ত্রকে কাজ করতে হয়েছে দীর্ঘদিন। খেয়াল করলে দেখা যাবে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য যে আচরণ বিধিমালা তা তৈরি হয়েছে ১৯৭৯ সালে। অর্থাৎ সামরিক শাসনকালে।  আবার ১৯৮৫ সালে তৈরি করা হয়েছে শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা। আরও বেশ কিছু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য আইন আছে। যা তৈরি হয়েছে সামরিক আমলাদের হাতে। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র-ই সম্ভবত একমাত্র আমলাতন্ত্র যা প্রতিপক্ষের (ধারণাগত বা প্রচলিত অর্থে) হাতে বিভিন্ন সময় পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয়, সামরিক সরকারও প্রচলিত অমলাতন্ত্রকে সংস্কার করেছে কিন্তু নির্মূল করতে চায়নি।
অন্য দেশের কথা জানি না, বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র খুবই নিরীহ ধাঁচের। নিঃশব্দে বয়ে চলা নদীর মতো। এদের লাঠি নেই, নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থা নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ যেসব কার্যক্রমকে ভয় পায় তেমন সরাসরি কোনও কিছু করার ক্ষমতাও নেই। সরকারের সন্তুষ্টিই তাদের টিকে থাকার একমাত্র উপকরণ। সরকার যে রকম চায় তেমন পলিসি প্রণয়নে সরকারকে সাহায্য করা এবং যদি সরকার পলিসি বাস্তবায়নে তার ভূমিকা প্রত্যাশা করে কেবল তখনই ভূমিকা রাখা তার কাজ।

বাংলাদেশে এখন যারা মন্ত্রী হন, তারা সবাই কম-বেশি শিক্ষিত। অনেকে উচ্চশিক্ষিত। সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে কাজ করেন, এমন অনেকে আছেন, যারা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। রাজনৈতিক নেতাদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো, দীর্ঘদিন ধরে মাঠ পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা। একজন রাজনৈতিক নেতার বাসার ড্রইংরুমে যত শ্রেণি-পেশার মানুষ অবস্থান করেন, তা না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবেন না। ফলে, আমরা যতই রাজনৈতিক নেতাদের মূর্খ, অন্যের দ্বারা প্রভাবিত বলে প্রচার চালাতে চেষ্টা করি, বাস্তব অবস্থা কিন্তু তা নয়। একটি মন্ত্রণালয়ে জনসম্পৃক্ত কোনও সিদ্ধান্ত মন্ত্রীর অনুমোদন না নিয়ে করা সম্ভব নয়। যদি করা হয়, তবে তা অবৈধ বলে গণ্য হবে। আর অবৈধ কাজটি যিনি করবেন, তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। নিজের প্রফেশনের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে গুটিকয়েক আমলা নিজের এবং পরিবারের ভবিষ্যত অন্ধকারের দিকে ঢেলে দেবেন, এমন মূর্খ যে কেউ নন, তা বুঝতে খুব বেশি উচ্চশিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। সাধারণ জ্ঞানই যথেষ্ট।

আমলাতন্ত্রের কাজের ধরনই এমন যে, সরকারের কোনও সাফল্যেই তিনি অংশীদারিত্ব দাবি করেন না, করা উচিতও নয়। কারণ দেশের যেকোনও উন্নয়নের দাবিদার সরকার। বেতন ও কিছু প্রণোদনার বিনিময়ে সরকারি চাকরিজীবীরা তাদের সাহায্য করে থাকেন। সাহায্য করাই তাদের কাজ। আমলাতন্ত্রকে নিজেদের মিশন-ভিশন অনুযায়ী পরিচালনা করার কাজটিও সরকারের। আজকে যদি মন্ত্রিপরিষদ সিদ্ধান্ত নেয়, বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রকে বিলোপ করে দিয়ে বিভিন্ন কলাম লেখক বা সুশীল সমাজকে দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, তবে বাসায় ফিরে যাওয়ার আগে আমলাদের নির্ভুল বানানে নিজের মৃত্যু পরোয়ানাটি প্রস্তুত করে অতপর বাসায় চলে যেতে হবে।

২০০ বছরের অধিক সময়ের ইতিহাসে আমলাতন্ত্র কখনও রাজপথে নামেনি। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী যখন তাদের বারবার নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখনও তারা এক দিনের জন্যও কর্মবিরতি পালন করেননি। অনির্বাচিত সরকারের হাতে যখন জুডিশিয়াল সেপারেশনটি বাস্তবায়িত হলো, তখনও রাজপথে নামেননি বা সরকারের পক্ষ ত্যাগ করেননি। আমলাতন্ত্রের কোনও স্লোগান নেই। মিডিয়ায়ও কোনও প্রচারণা নেই। এদেশের বাজেট কী করে তৈরি হয়, বাজেটে কী করে অর্থ বরাদ্দ হয়, সরকারের নিরাপত্তা কর্মসূচি কী করে প্রণয়ন করা হয়; কিভাবেই প্রজেক্ট তৈরি হয় এবং তা ম্যানেজম্যান্ট করা হয় এবং কী করে একটি প্রজেক্ট বা প্রোগ্রাম সরকারের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে আমলাতন্ত্রের ভূমিকাটি কখনও মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

আমলাতন্ত্রের কোনও মিডিয়া সেল নেই, সরকারের আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী পাবলিকলি নিজেকে সে ডিফেন্ড করতে পারে না, অনেক ভালো বক্তা থাকার পরও মিডিয়ার টকশোয় একজন আমলা পূর্ব অনুমতি ছাড়া যেতে পারে না। তার হাতে অস্ত্র নেই। রাজ-দরবার দখলের ভয়-জাগানিয়া কোনও ইতিহাস নেই। কোনও সম্মানজনক ব্যাক্তিকে অসম্মান করার মতো হাতিয়ারও নেই। ফলে, আমলাদের সমালোচনা করার সময় কারও মুখ আটকায় না।  ক্ষমতাশালীদের হাল্কা ধরনের সমালোচনা করার সময় যারা মনে-প্রাণে অবিশ্বাস করেও ‘দেশপ্রেমিক’ কিংবা ‘জনগণের বন্ধু’ বিশেষণ ব্যবহার করেন, তারাও আমলাদের সমালোচনা করার সময় বীর-বাহাদুর হিসেবে আবির্ভূত হন। নিজের ভাণ্ডারে যত অশ্লীল-অশ্রাব্য কুরুচিপূর্ণ শব্দ আছে, তা ব্যবহার করতে কার্পণ্য করেন না। আমলাকে হেয় না করলে যেন নিজের বাহাদুরি প্রকাশ পায় না। কে কত বড় পেশাজীবী নেতা তা নিরূপণের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে আমলাকে আক্রমণ করার ক্ষমতা।

সরকারকে ভুল বোঝানো ছাড়া আর কিছুতেই যেন আমলারা দক্ষ নন! আমলাতন্ত্র রাজনৈতিক সরকারকে ভুল বোঝায়, সামরিক সরকারকে ভুল বোঝায়, এমনকি তত্ত্বাবধায় সরকারকেও ভুল বোঝায়। তাদের পেশা আর নেশা যেন ভুল বোঝানো। আর তারা যে সবাইকে ভুল বোঝান, সরকারের নির্দেশ অমান্য করে, ফাইল লুকায়—এ সব কাজ সবাই বুঝলেও রাজনৈতিক নেতারা বুঝতে পারেন না। বুঝতে পারেন শুধু মাঠের বাইরে অনেক দূরে গ্যালারিতে বসে থাকা অল্প কিছু মানুষ।

আমলাদের নিয়ে যে পরিমাণ অপপ্রচার করা হয়েছে এবং যেহেতু আমলারা কখনও এইসব অপপ্রচারের প্রতিবাদ করেননি, সেহেতু তাত্ত্বিকভাবে আমলাদের আর কোনও মান-সম্মান থাকার কথা নয়। অথচ দেখা যাচ্ছে, এই আমলারাই সবার মান-সম্মানের মাপকাঠি। তাদের সমান বা তাদের অতিক্রমের ভেতরে লুকায়িত আছে সাফল্য। বাংলাদেশের এই নিরীহ গোবেচারা আমলাদের দেখলেই বুঝা যায়, মান-সম্মান কেড়ে নেওয়ার জিনিস নয়। আদায়ের জিনিসও নয়। মান-সম্মান অর্জনের বিষয়।

লেখক: আন্তর্জাতিক সংস্থায় পরামর্শক হিসেবে কর্মরত



*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ