আগে জানুন মেট্রোরেল কেমন

Send
রোকেয়া লিটা
প্রকাশিত : ১৩:১৬, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২১, মার্চ ২১, ২০১৭

রোকেয়া লিটাকয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাপ হচ্ছিলো। আলোচনার বিষয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেল। তো, খেয়াল করলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থীর মধ্যে মেট্রোরেল নিয়ে অনেক ধরনের আতঙ্ক। তার মধ্যে একটি হলো, এমনিতেই এখন ভিক্ষুক, হিজড়াদের চাঁদাবাজির কারণে ক্যাম্পাসে চলাফেরা যায় না। আর মেট্রোরেল হলে যে কী হবে! তার উত্তরে আমি বললাম, মেট্রোরেল তো যাবে মাথার ওপর দিয়ে, আর এসব ট্রেনে সচরাচর টয়লেটও থাকে না। তাহলে ভয়ের কী হলো? সে এবার রীতিমত হতভম্ব।
কারণ, ট্রেনে টয়লেট থাকবে না। সে আর কোনও কিছুই ভাবতে পারছে না। ট্রেনে টয়লেট না থাকলে কেন এতো উদ্বিগ্ন হতে হবে, সে বিষয়টিও আমার মাথায় ঢুকলো না! কারণ, এ ধরণের দূরত্বে যেসব বাস চলাচল করে, তাতেও কোনও টয়লেট থাকে না। অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থীর উদ্বেগের কারণ আমার কাছে পরিস্কার হয়ে গেল। সে বললো, ‘মাথার ওপর দিয়ে ট্রেনে যাবে, সেই ট্রেনে আবার টয়লেট থাকবে না! আমরা বাঙালিরা যা সভ্য! তাই বললাম, ক্যাম্পাসের অবস্থা যে কী হবে ভাবা যাচ্ছে না’। এই শিক্ষার্থীর কথা শুনে আমি বুঝতে পারলাম, মেট্রোরেল সম্পর্ক তার ধারণা স্পষ্ট নয়। শুধু তাই নয়, এ ধরনের পরিবহন কত দ্রুত গতিতে যায়, টয়লেট থাকে কি না, জানালা-দরজা খোলা থাকে কি বন্ধ থাকে, সেই দরজা-জানালা দিয়ে নিচে ময়লা ফেলা সম্ভব কি সম্ভব না-এ বিষয়ে কোনও ধারণা নেই তার।
আমার অনুমান, ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেল যাওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর ধারণা একই রকম। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ক’জন শিক্ষার্থীর সুযোগ হয় বিদেশে গিয়ে মেট্রোরেলে চড়ে বেড়ানোর! ছাত্রজীবনে এমন সুযোগ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই তারা ভাবতেই পারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর দিয়ে মেট্রোরেল গেলে বা ক্যাম্পাসে একটি স্টপেজ হলে, তা হয়তো বাংলাদেশের আর দশটা রেলওয়ে স্টেশনের মতই হবে এবং তা যথারীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নোংরা করবে। নিজের ক্যাম্পাসকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার পক্ষে আন্দোলন করার অধিকার সব শিক্ষার্থীরই আছে। তাই তাদের আন্দোলনটাও যৌক্তিক।
এখন আসি মূল প্রসঙ্গে। বুঝলাম, ছাত্ররা বিদেশে গিয়ে মেট্রোরেলে উঠে নাই। তাই মেট্রোরেল নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতাও নেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষককেও দেখেছি, ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেল যাওয়ার বিরোধিতা করেছেন। আমি নিশ্চিত নই, তারাও কি শিক্ষার্থীদের মতো একই কারণে ক্যাম্পাসে মেট্রোরেলের বিরোধিতা করছেন? কারণ গবেষণা, লেখাপড়াসহ বিভিন্ন কারণে বছরে দুই/একবার শিক্ষকদের তো বিদেশে যেতেই হয়। আর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেল যাওয়ার অসংখ্য উদাহরণ তো আছেই। যাইহোক, আন্দোলনের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অধিকার সবার আছে। তবে, মেট্রোরেল নিয়ে যে শিক্ষার্থীদের হাস্যকর চিন্তা-ভাবনা, তা শুধরে দেবে কে? কে তাদের বুঝিয়ে দেবে, মেট্রোরেলের স্টেশনে ঢুকতে হলে অটোমেটিক ফেয়ার কালেকশন কার্ডের প্রয়োজন হবে। আর অটোমেটিক ফেয়ার কালেকশন কার্ডে টাকা না থাকলে সাধারণ যাত্রীরাই এ ধরনের স্টেশনে ঢুকতে পারে না। সেক্ষেত্রে মেট্রোরেলের স্টেশনের ভেতরে হকার, ভিক্ষুক, ছিনতাইকারীর আস্তানা গড়ে ওঠার সুযোগ কই?  আর কে শিক্ষার্থীদের বোঝাবে যে, মেট্রোরেল এতো দ্রুতগতির পরিবহন যে তার বন্ধ দরজা-জানালা ভেদ করে কেউ ক্যাম্পাসে ময়লা ফেলতে পারবে না। আর বন্ধ দরজা-জানালা দিয়ে ময়লা ফেলবে কিভাবে? এছাড়া মেট্রোরেলে যে সিসি ক্যামেরা থাকে আর ময়লা ফেলার উচ্চহারে জরিমানা করা হয়, সেগুলো শিক্ষার্থীদের জানাবে কে? ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেল হোক বা না হোক, শিক্ষার্থীদের মেট্রোরেল সম্পর্কে অন্তত প্রাথমিক ধারণাগুলো দেওয়ারও কি কেউ নেই ক্যাম্পাসে?

ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেলের বিরোধিতাকারী শিক্ষার্থীরা এক পর্যায়ে বলতে শুরু করলো, তারা মেট্রোরেলের বিরোধিতা করে না। তবে তাদের প্রশ্ন হচ্ছে, মেট্রোরেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে না গিয়ে, শাহবাগ-মৎস ভবন অথবা শাহবাগ-শিশুপার্কের ভেতর দিয়ে গেলে ক্ষতি কী? এরই মধ্যে অবশ্য মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ট্রেন টার্নিং নেওয়ার জন্য যে বড় জায়গা দরকার, সেটা মৎস্য ভবন এলাকায় নেই। বাকি থাকলো শাহবাগ-শিশুপার্কের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেল যাওয়ার পথ।

আমি হাসবো নাকি কাঁদবো ঠিক বুঝতে পারছি না। পাঠকের অনুমতি নিয়েই একটু রসিকতা করতে চাই। ঢাকা শহরে তো শিশুদের জন্য একটাই বিনোদনকেন্দ্র আছে। সেই শিশুপার্কটিও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের দাবির কারণে কেড়ে নেওয়া হোক। সম্ভব হলে, শিশুপার্কে শিশুদের জন্য যে রেলগাড়ি আছে, তার সাথে মেট্রোরেলের একটি সংযোগ করে দেওয়া হোক।  শিশুপার্কের ওপর দিয়েই হোক মেট্রোরেল। তারপরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে যেন মেট্রোরেল না যায়।  আকাশ কিংবা বাতাস থেকেও মেট্রোরেল আনা যেতে পারে, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেন সেটাতে উঠতে পারে। কারণ তারা মেট্রোরেলের বিরোধিতা করে না। তারা শুধু ক্যাম্পসের পরিবেশ ঠিক রাখার জন্য আন্দোলন করছে।   

এখন আমার সর্বশেষ ট্রেন যাত্রাটির একটু বিবরণ তুলে ধরতে চাই। বেশ কয়েকদিন আগের কথা। ঢাকা থেকে দিনাজপুরে যাবো। ট্রেন ছাড়বে সন্ধা ৭.৪০ মিনিটে। আমি বাসা থেকে বের হলাম ৬.১০ মিনিটে। রাস্তায় একটি ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে দেরি হয়ে গেল। এদিকে ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে যাচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের পরে স্টেশনে পৌঁছলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে স্টেশনের অনলাইন কাউন্টার থেকে টিকেট সংগ্রহ করলাম। প্ল্যাটফরমে এসে শুনি ট্রেন ছাড়তে চার ঘণ্টা দেরি হবে। অবশেষে রাত আড়াইটায় ট্রেন ছাড়লো। অথচ এতক্ষণে দিনাজপুর পৌঁছে যাওয়ার কথা।

ট্রেন যাত্রার এই বিড়ম্বনার কথা নিয়ে বহু কথা বলা হয়েছে। আমরা এই বিড়ম্বনার অবসান চাই। আমি তো বলবো, পর্যায়ক্রমে দেশের সব শহরে চালু হোক মেট্রোরেল। যেন নিমিষেই একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত চলে যাওয়া যায়।

লেখক: সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ