ভাষার অধিকার

Send
গর্গ চট্টোপাধ্যায়
প্রকাশিত : ১২:০০, মার্চ ১২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৩, মার্চ ১২, ২০১৬

গর্গ চট্টোপাধ্যায়একুশে ফেব্রুয়ারি হলো পূর্ব বাংলার এক গৌরবের দিন। পূর্ব বাংলার ভাষা মূলত বাংলা হলেও স্রেফ জাতীয়তাবাদ, ঐক্য ও সংহতির নামে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল অন্যের ভাষা। পূর্ব বাংলার মানুষ নিজেদের মাতৃভাষার এই অপমান ও লাঞ্ছনা সহ্য করেনি। ফেটে পড়েছিল আন্দোলনে, দখল করে নিয়েছিল রাজপথ।
জনবিরোধী রাষ্ট্র-মাত্রই নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালায় তাদের মাইনে দিয়ে পোষা পুলিশ-নামক বাহিনী লেলিয়ে। ১৯৫২’র একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে শহীদ হয়েছিলেন ৪ বীর বাঙালি।  আমি বাঙালি তাই তারা আমারও ভাই। তাদের মৃত্যু ব্যর্থ না হতে দেওয়ার দায় বাঙালি হিসেবে আমারও। আমরা পশ্চিম বাংলার বাঙালি- বাংলার দেশের (বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নয়) ভাঙা পশ্চিমভাগ। এই ভাষা আমাদেরও প্রাণের ভাষা, বেঁচে থাকার অবলম্বন, ভালোবাসার মাধ্যম, পূর্বসুরীর স্মৃতি, উত্তরসুরীর উত্তরাধিকার, ব্রতের ভাষা- ধর্মের ভাষা-রাজনীতির ভাষা- ঘাম ঝরানো কর্মের ভাষা - প্রেমের ভাষা- ফোপানোর ভাষা - খোঁটার ভাষা - অপরাধের ভাষা- দাঙ্গার ভাষা-যৌনতার ভাষা -না বলা কথার ভাষা - ভুলে যাওয়া দিনের ভাষা - আগামীকালের ভাষা- মুক্তির ভাষা। আমরা বাঙালি।
এই বাংলার জন্য রক্ত শুধু ঢাকায় ঝড়েনি।  রক্ত ঝড়েছে শিলচরে। বরাক উপত্যকার বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষার অধিকারের জন্য, অসমীয়া চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে ১৯ মে ১৯৬১-র জমায়েতে গুলি করে ফের সেই পুলিশ। মারা যান ১১ জন। মারা যান ১৬ বছর বয়সের কমলা ভট্টাচার্য্য। আমাদের পরিচয়ে ভাষার অধিকারের যদি কোনও গুরুত্ব থেকে থাকে, তাহলে আমাদের বুঝতে হবে যে এই ১১ জনের বলিদান কোনও মাতঙ্গিনী হাজরা বা ক্ষুদিরাম বসুর থেকে কম না। এই ভাষার জন্য রক্তাক্ত হয়েছেন মাতৃভূমির বাংলা-ভাষীরা।
দীর্ঘ আন্দোলনের চাপে তাদের আবাদভূমির কিছু অংশজুড়ে দেওয়া হয় পশ্চিমবঙ্গে। এখনও ঝাড়খণ্ডে ও বিহারে বাংলা-ভাষীরা বিক্ষিপ্তভাবে তাদের ভাষা অধিকারের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন অজস্র প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম করে। এ সংগ্রাম দৈনিক কারণ আমাদের আত্মপরিচিতি দৈনিক পাল্টায় না।

আগের উদাহরণগুলোতে বাংলা হলো নির্যাতিত।  আবার এই বাংলা কখনও কখনও দেখা দিয়েছে আধিপত্যবাদীর ভূমিকায়, অন্যের ভাষা অধিকার অস্বীকার করার ভূমিকায়। এ অত্যন্ত লজ্জার কথা যে ইংরেজ আমলে নিজেদের সর্বক্ষেত্রে আধিপত্যের সুযোগ নিয়ে বাঙালি পন্ডিতেরা অসমীয়া ও ওড়িয়া ভাষাকে বাংলার উপভাষা বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। এইসব জায়গার স্কুল ছিল বাংলা মাধ্যমের - অসমীয়া বা ওড়িয়া মাধ্যমের নয়। এমনকি সুদূর মণিপুরেও বৈষ্ণব আধিপত্যের হাত ধরে সেখানকে জনগণের ওপর বাংলা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেখানকার মহারাজকে হাত করে।

বাংলা তখন একরকম এলিট স্টেটাস সিম্বল। ত্রিপুরার নিজস্ব ভাষাগুলোকে ত্রিপুরায় প্রান্তিক করে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বাংলা-ভাষীদের দায় কম নয়। এসকল অপকর্মের ফল ভোগ করতে হয়েছে বাঙালিকে বহুদিন - এই সকল এলাকার মানুষ যখন নিজভূমে নিজেদের ভাষাকে প্রান্তিক হয়ে যাওয়াটা দেখে রাগে ফুসেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অধীনে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম, সেখানকার আদি বাসিন্দাদের ভাষার অধিকার নির্বিচারে হরণ করা হয়েছে। চাকমা, ম্রো এবং আরও অনেক ভাষা আজ বাঙালির দাপটে গুটিয়ে গেছে। যে দেশের মাটি থেকে বিশ্ব পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাত্রই ভাষা দিবস, সেই মাটিতে যখন অন্যের ভাষা অধিকার এইভাবে কেড়ে নেওয়া হয়, প্রান্তিক করে দেওয়া হয় তাদের নিজেদের পরিচিতি, তখন সকল বাঙালির লজ্জিত হওয়া উচিত। অন্যের ভাষা অধিকার ও আত্মপরিচিতি কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা পাওয়ার জন্য বাংলার ভাষা সৈনিকেরা প্রাণ দেননি।  

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে আজকে স্রেফ বাংলা ভাষা  দিবস হওয়া রেখেছে সারা বিশ্বের উপমহাদেশের নানা অবাঙালি জনগণ। যেমন, পাঞ্জাবে সতনাম মানক ও অজিত সংবাদপত্র গোষ্ঠী প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ‘মা বোলি’ দিবস করেন কয়েক হাজার মানুষের সাথে, ভাংড়া নাচ ও লাইভ কনসার্টসহ। বড় করে ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করে হয় তামিল নাডুতে যেখানে ১৯৬৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকারি বাহিনী ও পুলিশ মাইল শতাধিক তামিল দুবাকে খুন করে প্রকাশ্য রাস্তায়। তাদের অপরাধ যে, তারা কেন্দ্রীয় সরকারের হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার নীতি নিঃশব্দে মেনে নেয়নি। সেই থেকে পথ দেখিয়েছে তামিল নাডু। ঝাড়খণ্ড হওয়ার আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতির রাজ্য - কেন্দ্রীয় সরকারের গড়া ঝাড়খণ্ডে বহিরাগতরাই ক্ষমতায়, হিন্দি-ই সেখানকার প্রভুত্বের ভাষা। আজকে ছত্তিসগড়ের বস্তর জেলায় সেখানকার আদিবাসী  জাতি শিশুদের ভারত সরকার জোর করে হিন্দি স্কুলে পাঠাচ্ছে। সপ্রতিভ গোন্ডিতে পারদর্শী শিশুরা স্কুলে হয়ে উঠছে ভীত, নিষ্প্রভ। এভাবে শিক্ষার নাম, ঐক্যের নাম, সংহতির নাম, রোজ এই ভারতীয় সাংস্কৃতিক দমন। এই বৈচিত্র্যময় উপমহাদেশে জাতির ও গোষ্ঠীর অধিকার হরণকে আমরা কালচারাল জেনোসাইড বা সাংস্কৃতিক গণহত্যা। এই কালচারাল জেনোসাইড হলো হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান গঠনের এক প্রাথমিক শর্ত। আবার তার বিরুদ্ধে দানা বাঁধছে বিক্ষোভ। যে কন্নড়-ভাষীদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বেঙ্গালুরুতে, তারা আজ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে আস্তে আস্তে। তাদের নতুন প্রজন্ম টুইটারে নেতৃত্ব দিচ্ছে ডিজিটাল যুগের ভাষা আন্দোলনের। এবারের একুশে ফেব্রুয়ারিতে নতুন দিল্লিতে হচ্ছে/হয়েছে ৪০টি ভাষার মহাসম্মেলন। সেখানকার সম্মেলনের দুটি মূল দাবি। সকল ভাষার সমান অধিকার চাই এবং  অহিন্দি এলাকায় হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া চলবে না।   

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের ঝটিকা বাহিনী সম্প্রতি যে হিংসাত্মক কার্যকলাপ চালালো, তার নেপথ্যে রয়েছে অন্য একটি অশনি সংকেত। সেদিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাধারণ সভা বা জেনারেল বডি মিটিং-এ সেই একই গোষ্ঠী "হিন্দি মে বোল" ইত্যাদি বলে বাংলা বন্ধ করে ছাত্র প্রতিনিধিদের হিন্দিতে কথা বলতে বাধ্য করে। এ লজ্জা আমরা রাখবো কোথায়?  আমরা কি হিন্দি পারি? কখনও এরকম কোনও পরিস্থিতির কথা ভাবতে পারি?  না, পারি না এবং সেটি কাম্যও না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে কেন এটা কলকাতায় বাংলাকে দমন করে হিন্দি চাপানো সম্ভব কিন্তু  দিল্লিতে হিন্দিকে পাশে সরিয়ে তামিল বা বাংলা চাপানো সম্ভব না। আমাদের বুঝে নিতে হবে এই বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের বাণীতে ফাঁকিটা ঠিক কোথায়, কে রাজা আর কে প্রজা, কে প্রথম শ্রেণির নাগরিক আর কে শ্রেণির নাগরিক, কার ভাষা রাষ্ট্র ঐক্যকে দৃঢ় করে আর কার ভাষা এহেন ঐক্যকে নড়বড়ে করে, কে জন্মেই রাষ্ট্রবাদী আর কাকে সারাজীবন নিজের আত্মস্বত্তা বদলে রাষ্ট্রবাদী হওয়ার প্রমাণ দিতে হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি আসলে সুযোগ করে দেয় ভাবতে - আমরা মানে কারা, কেন আমার রাষ্ট্র আমার করের টাকায় অন্যের ভাষা প্রচার করে কিন্তু আমারটা করে না। আমাদের ভেবে দেখতে হবে যে কে কারোর নিজের নিপীড়িত মাতা থাকতে বিমাতাকে পূজা করতে যে রাষ্ট্র শেখায়, সে রাষ্ট্র কার আর সে রাষ্ট্র কার নয়?

 লেখক: স্থিত মস্তিষ্ক-বিজ্ঞানী

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ