আমরা ওড়াবোই শিমুল

Send
নজরুল কবীর
প্রকাশিত : ১৪:৪৮, এপ্রিল ১৩, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩৪, জুন ২০, ২০১৬

নজরুল কবীরসাত সকালে ফাগুনের হাওয়ার ঝাপটা লেগে মন কেমন করে ওঠে। চৈত্রের খরতাপ যেন কিছুটা পরাস্ত, এই উথাল–পাথাল হাওয়ায়। রাজধানীর মধ্যবিত্ত জীবনের যাপিত ভোরে দরজার ফাঁক গলে আসা সংবাদপত্র হাতে নিই। তবে ইদানিং মন টানে না। খুন,ধর্ষণ, চুরি, ট্যাক্স ফাঁকি, নিখোঁজ, সহিংসতা, কোপাকুপি- এমন সংবাদ দিয়ে সকাল শুরু করার কোনও মানে হয়! নিজে সংবাদকর্মী হয়েও কেমন যেন গা গুলিয়ে আসে! পত্রিকা মেলে ধরতেই সিঙ্গেল কলামের ছোট্ট একটি রিপোর্ট পড়ে সকালের সেই রোমান্টিক আবহ উবে গেল। বিবৃতি নির্ভর একটি রিপোর্ট।
ইসলামের হেফাজতের নাম করে চট্টগ্রামের হাটহাজারি মাদ্রাসার শফী হুজুরের নেতৃত্বাধীন হেফাজতে ইসলাম বিবৃতি দিয়ে বর্ষবরণের কর্মসূচিকে বিজাতীয়, বিধর্মীদের অনুষ্ঠান হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। শুধু তাই নয়, নারীদের নসিহত করেছে, তারা যেন গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী লাঞ্ছনার কথা মনে রেখে পহেলা বৈশাখে রাস্তায় বের না হন। বলুন তো দেখি, এরপর কি মাথা ঠাণ্ডা রাখা যায়? সংবাদের নিচের দিকে লেখা, আওয়ামী ওলামা লীগও একই দাবি জানিয়েছে। লজ্জায়-অপমানে-ঘৃণায় নিজেকেই ধিক্কার জানাতে থাকি।
কিন্তু পরে মনে হলো- এই দেশটা তো শুধু শফী হুজুরদের নয়। আওয়ামী ওলামা লীগের নয়। আমি কেন লজ্জা পাবো? এই দেশ তো রক্তের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া। এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে, নিজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে প্রিয় পাঠক, আপনাদের কাছেও কিছু প্রশ্ন রাখতে এই লেখার সূচনা।
আরও পড়তে পারেন: নাজিমউদ্দিন হত্যা এবং এরশাদের দাবি
বড্ড টালমাটাল সময় পার করছে বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের হাত দিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে নতুনভাবে প্রাণ পায় রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের ধারণাটি। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার পরিপন্থী হলেও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটি তা অনুমোদন করিয়ে নেয় সংসদে। স্বৈরাচার জিয়া ও এরশাদের অপকর্মের বৈধতা আসে ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ শেখ হাসিনার হাত দিয়ে।
এরপর যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে, গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম হয়েছে, হেফাজতে ইসলামের উত্থান ঘটানো হয়েছে, ব্লগার খুন হয়েছে। পেট্রোল বোমায় জীবন্ত মানুষ মারা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে, আমেরিকা, পাকিস্তান, সৌদি আরব, জাতিসংঘ মৃত্যদণ্ড বাতিল করতে বলেছে, হিযবুত সামরিক ক্যু করতে চেয়েছে, হলমার্ক ৪ হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়েছে, বেসিক ব্যাংক লোপাট হয়েছে, দুদক মন্ত্রী-এমপিদের দায়মুক্তি দিয়েছে… ঘটনার ঘনঘটায় আবার নির্বাচন হয়েছে… আবারও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে।

আরও পড়তে পারেন:  তসলিমা নাসরিনরাষ্ট্রধর্ম

 

‘পরিবেশ রক্ষায়’ প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন, সুন্দরবনের পাশে তেলবাহী জাহাজ ডুবেছে, জাতিসংঘ মিশনে নারী সেনাসদস্য গিয়েছেন, কুমিল্লায় সেবানিবাস এলাকায় তরুণী ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ উঠেছে, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের জঙ্গি গ্রেফতার হয়েছে, মার্কিন গবেষণা সংস্থা দেশে আইএস আছে দাবি করেছে, রিজার্ভ থেকে ৮শ’ কোটি টাকা হাওয়া হয়ে গেছে, ক্রিকেট দলে টাইগার মুস্তাফিজ যোগ হয়েছে, তাসকিন-আরাফাত সানি আন্তর্জাতিক ম্যাচ থেকে বাদ পড়েছেন, যোগাযোগমন্ত্রী ৬শ’ বাস ভারত থেকে আনার ঘোষণা দিয়েছেন।

এসবই চলছে, চলবে হরদম। এ আরেক খেলা, খেলারাম খেলে যায়, যাচ্ছে। কিন্তু আমরা কি শুধু দর্শক হিসেবেই দেখতে থাকবো এসব? রাষ্ট্রকে কি নানারকম ‘ধর্ষকামী’ মানসিকতায় বেড়ে উঠতে দেব? আপনাদের মনোভাব জানি না। তবে আন্দাজ করতে পারি। আমার দিককার অবস্থান স্পষ্ট করে বলে দিতে পারি। না, আমি ‘ধর্ষকামী’ মানসিকতার রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ার বিপক্ষে, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার প্রতিবাদ-প্রতিরোধ জারি রাখছি, রাখবো। এমন দৃঢ়চেতা প্রত্যয় রাখায় স্পর্ধা আমাকে শিখিয়েছে, আমার পূর্ববর্তী প্রজন্ম।

আমি তো ধারণ ও লালন করি কাঙাল হরিনাথের চেতনা। আমি তো জানি, পিতৃতান্ত্রিক গুণীণ বরাহের বিপরীতে সাধারণ কৃষিজীবীর পক্ষে দাঁড়ানো খনার লড়াই ও আত্মত্যাগের কথা। সূর্যসেন, রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের পাশাপাশি প্রীতিলতা- ইলা মিত্রের লড়াইয়ের ময়দানে সারথি হওয়ার কথা। ভুলি নাই আরজ আলী মাতুব্বরকে যৌক্তিক সত্য প্রচারে কতটা প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয়েছে, সেই কথা। শাহ আবদুল করিম, জালালউদ্দিন খাঁর মানবিকতার সুর। আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ কিংবা হেনা দাস, ড. আলী আজগরকে কারা ‘মুরতাদ’ আখ্যা দিয়েছিলো, তাদেরও  ঠিক চিনে রেখেছি।

আরও পড়তে পারেন: নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্র: সহিংসতার পরও উদ্ধার হয় না


কাদের জন্য শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’র অভিযোগ মাথায় নিয়ে মরতে হয়েছিল, তাও মনে রেখেছি। কারা এবং কেন বিশেষ ক্ষমতা আইন, জননিরাপত্তা আইন, সন্ত্রাস দমন আইন, হাল আমলের সাইবার ক্রাইম অ্যাক্ট করেছে- করছে, সেই শানেনুজুলও জানা আছে।
ইতিহাস থেকে পাঠ নিয়েছি, ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর সময়কার হৃদরোগ আক্রান্ত হয়ে ‘মৃত্যুবরণ’ করা, ‘ক্রসফায়ার’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’, ‘নিখোঁজ হওয়া’, আবার ‘নিখোঁজ থেকে ফিরে আসা’র মানে কী! সুতরাং-‘ভয় কী মরণে, মাতঙ্গী মেতেছে আজ…’

রাষ্ট্রের প্রতিপালকেরা যতই ‘হেফাজত’ বটিকা খাওয়াক, বিএনপি-জামায়াত জুজুর ভয় দেখাক, আইএস-জঙ্গিবাদের ধুয়া তুলে যুক্তরাষ্ট্র চোখ রাঙাক; আমাদের স্পষ্ট অবস্থান তাদের বিপরীতে। আমি দাঁড়িয়েছি, দাঁড়াবোই। ‘বুড়ো বটগাছ শেকড়শুদ্ধ তুলে আমরা দাঁড়াবোই।’

এবার বর্ষবরণে দ্বিগুণ নয়, বহুগুণে আমাদের সশব্দ ও সক্রিয় উচ্চারণ— তোমরা যতই করতে চাও আমাদের ঊন্মুল, রোদ পিঠে করে আমরা ওড়াবোই শিমুল।.

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

Save

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ