হাইকোর্টের নির্দেশে অবশেষে চিকিৎসাধীন তিন সাঁওতালের হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের পুলিশি পাহারা আরও জোরদার করা হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় তাদের হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়।
রংপুর রেজ্ঞের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুখ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই সাঁওতালের হাতকড়া ও কোমড়ের রশি খুলে দেওয়া হয়েছে।’
গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় সাহেবগঞ্জ আখের খামার এলাকার সাঁওতাল পল্লীতে পুলিশের হামলায় তারা আহত হন। এরপর তাদের আটক দেখিয়ে হাতকড়া পড়িয়ে ও কোমরে রশি বেঁধে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল।
সোমবার দুপুরে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়া চিকিৎসাধীন সাঁওতালদের হাতকড়া খুলে দেওয়ার আবেদন জানিয়ে একটি রিট আবেদন করেন। এই আবেদনের ওপর শুনানি শেষে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে হাইকোর্ট বেঞ্চ চিকিৎসাধীন তিন সাঁওতালের হাতকড়া খুলে দিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার, রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি এবং গাইবান্ধার এসপিকে নির্দেশ দেন।
সোমবার সন্ধ্যায় সরেজমিনে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১৫ নম্বর সার্জিকাল ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে গুলিবিদ্ধ চরণ সরেনের কোমড়ের রশি ও হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়েছে। এ সময় তাকে বেশ আয়েশিভাবে বসে থাকতে দেখা গেছে।
এ সময় তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেনই বা কোমড়ে রশি লাগানো হলে আর হাতে হাত করা পড়ানো হলো আর কেনইবা খুলে দেওয়া হলো তা আমি জানি না।’
চরণ সরেনের স্ত্রী পানি মুরমু জানান, ‘সাংবাদিকরা বার বার ছবি নিয়ে যাওয়ার পর কেন জানি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আর পুলিশ সোমবার বিকেলে এসব খুলে দিয়ে গেছে। তবে তার স্বামীকে পাহাড়া দেওয়ার জন্য ৪ পুলিশকে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ‘রবিবার ঢাকা থেকে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতারা আসছেন খবর পেয়ে দুপুরের পর থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আর পুলিশ তাদের খাতির যত্ন শুরু করে। দুপুরে মাছ মাংস ডালসহ ভালো খাবার দেওয়া হয়। নেতারা আসার আগে সন্ধ্যার দিকে হাতকড়া আর কোমড়ের রশি খুলে দেয় পুলিশ। এরপর সন্ধ্যার পর আওয়ামী লীগের নেতারা এসে খোঁজ খবর নেন এবং উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে নেতারা চলে যাওয়ার পর রাতে আবারও কোমড়ে রশি আর হাতে হাতকড়া পড়িয়ে দেওয়া হয়।’
চরণ সরেন জানান, ‘আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে সব মালামাল লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন সুস্থ হলেই হাসপাতাল থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাবে। কিন্তু আমি তো কোনও অপরাধ করিনি। আমি মারও খেলাম আবার আমাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।’
এ সময় অবিলম্বে পুলিশি পাহারা প্রত্যাহার করে যাতে স্বাধীন মানুষের মতো চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান চরণ সরেন।
অন্যদিকে হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন বিমল কিসসোরও কোমড়ের রশি ও হাতকড়া খুলে দিয়েছে পুলিশ।
বিমল কসসো বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘রবিবার বড় বড় লোক আসার আগে এসব খুলে দেওয়া হলেও রাতে আবার লাগানো হয়।’
বিমলের স্ত্রী চিচিলী কিসকো জানান, ‘আমাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে মালামাল লুট করা হয়েছে। এখন স্বামী সুস্থ হলেই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করবে। ফলে আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।’
এ ব্যাপারে দুই সাঁওতালের পাহারারত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা কোনও কথা বলতে রাজি হয়নি। তবে এক পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশে তাদের কোমড়ের রশি ও হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের পাহারা দেওয়া অব্যাহত রাখতে বলা হয়েছে।’
এদিকে রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু জানান, ‘রবিবার রাতে ঢাকা থেকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ বিষয়ক সম্পাদক টিপু মুন্সিসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা গোবিন্দগজ্ঞে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। রাতে হাসপাতালে এসে গুলিবিদ্ধ দুই সাঁওতালের চিকিৎসার খোঁজখবরও নিয়েছেন।’
উল্লেখ্য, এ বিষয়ে গত ১১ নভেম্বর বাংলা ট্রিবিউনে ‘হাসপাতালেও আহত সাঁওতালদের হাতে হাতকড়া (ভিডিও)’ এবং ‘চিকিৎসাধীন ‘আসামির’ হাতকড়া নিয়ে পুলিশের নেই স্পষ্ট ধারণা’ শিরোনামেও দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
/এসএনএইচ/







