গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের জমি থেকে উচ্ছেদের পর খোলা আকাশের নিচে ত্রিপলের তাবুতে আশ্রয় নিয়েছেন সাঁওতালরা। তবে তীব্র শীতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাপ-দাদার জমি উদ্ধার করতে আন্দোলনরত সাঁওতালরা।
মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ার সাঁওতাল পল্লীতে এক মাস ১৬ দিন হলো এনজিও’র দেওয়া ত্রিপলের (তাবু) নিচে বসবাস করছেন সাঁওতাল-বাঙালির প্রায় ৪ শতাধিক পরিবার। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের দেওয়া চাল, ডাল খেয়ে সীমাহিন কষ্টে দিনাতিপাত করলেও এখন নতুন করে কষ্টে পড়েছেন শীতের তীব্রতায়। সন্ধ্যার পর থেকে কুয়াশা আর শীতের তীব্রতা বাড়তে থাকে। আর হালকা বাতাস হোয়ায় কাহিল হয়ে পড়েছেন খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষ।
কয়েকদিন ধরে গাইবান্ধা জেলাসহ উত্তর জনপদে শীতের তীব্রতা অনেকটা বেড়েছে। দিনের বেলাতেও গায়ে গরম কাপড় পড়ে বের হতে হয়। রাত যতো গভীর হয় কুয়াশা যেন বৃষ্টির মতো ঝড়তে থাকে। সকাল ৭-৮টা পর্যন্ত শুধু কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকে চারদিক।
মাদারপুর ও জয়পুরপাড়াসহ পরিত্যাক্ত একটি স্কুলের ভবনের সামনে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন সাঁওতাল-বাঙালিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার পর কিছু ব্যক্তি ও বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান কম্বল দিয়ে সহযোগিতা করেছিল। কিন্তু যেভাবে শীতের তীব্রতা বাড়ছে তাতে শীত নিবারণ সম্ভব নয়।
অপরদিকে, শীতের তীব্রতা বাড়ায় অনেক শিশু ও বৃদ্ধরা শীতজনিত সর্দি, জ্বর-কাশিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ মুহূর্তে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দরকার হলেও তারা সেটা পাচ্ছেন না।
মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীতে আশ্রয় নেওয়া কিসকো সরেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তাবুতে থাকলে শীত বেশি লাগে। তাবুতে রাতে বেশি বাতাস প্রবেশ করে। সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশার কারণে তাবুর ওপর দিয়ে পানি ঝরে। এতে আরও বেশি শীত লাগে। ঘরে যা কম্বল, চাদর আছে তা দিয়ে শীত নিবারণ হচ্ছে না।’
বার্নাবাস নামের এক সাঁওতাল বলেন, ‘নারী-পুরুষরা খড়খুটো জ্বালিয়ে কোনও রকম শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। কিন্তু বৃদ্ধ ও শিশুরা শীতের তীব্রতায় থরথর করে কাঁপছে। সন্ধা থেকে ভোর পর্যন্ত এখানে বসবাস করা মানুষের আরও কষ্ট ও দূর্ভোগ বাড়ে।’
আমেনা মুরমুর বলেন, ‘হামলা ও আগুন দিয়ে উচ্ছেদের ঘটনায় ঘরে যা ছিল সব পুড়ে ছাই হয়েছে। এখন খোলা আকাশের নিচে তাবুতে থাকতে হচ্ছে। শীতে অনেকে কম্বল দিয়েছে। কিন্তু ওই কম্বল গায়ের নিচে দিয়ে থাকতে হয়। গায়ের ওপরে দেওয়া বা তাবুর বাইরে বের হওয়ার মতো কম্বল, চাদর বা গরম কাপড় না থাকায় কষ্ট পেতে হচ্ছে।’
রিনা হেমরম বলেন, ‘বাপ-দাদার জমি ফেরত পেতে আমাদের এতো কষ্ট। সব তো গেছে তবুও জমি চাই। তাবুর নিচে খেলা আকাশের নিচে আশ্রয় নেওয়া ঘরে অন্ন নেই। তার ওপর এখন তীব্র শীত পড়ছে।’
ফুলমনি হাসদা বলেন, ‘আমরা ক্ষুদ্র জাতি। আমাদের বাপ-দাদার সম্পতি ফেরত পাচ্ছিনা। আমাদের ওপর হামলা, মামলা, ঘরে আগুন দিয়ে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এখন শীতের দিনে ছেলে-মেয়ে নিয়ে কষ্টে আছি।’
কর্নেল টুডু বলেন, ‘হামলা ও উচ্ছেদ ঘটনার এক মাস ১০ দিন হলো। কিন্তু এখনও খেয়ে না খেয়ে খোলা আকাশের দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। কিছু ব্যক্তি, সংগঠন ও এনজিও যে ত্রাণ দিয়েছে তা দিয়ে কোনও রকমে সংসার চলছে। সাঁওতাল পল্লীর বাইরে গিয়ে কাজকর্ম করতে না পারায় আয়ও করতে পারছি না। আমাদের বাপ-দাদার জমি ফিরিয়ে দিক সরকার। আমরা সকলে সেখানে খেয়ে না খেয়ে বসবাস করবো। এমনতি অনেক কষ্ট তার পর আবার শীতের তীব্রতায় কষ্ট ও দুর্ভোগ বাড়ছে।’
উল্লেখ্য, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ১৯৬২ সালে আখ চাষের জন্য গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ এলাকায় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কাছ থেকে এক হাজার ৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ওইসব জমিতে মিল কর্তৃপক্ষ আখ চাষ না করে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর কাছে লিজ দেয়। তারা লিজ নেওয়ার পর ওইসব জমিতে তামাক, ধান, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করতে থাকে। এছাড়া এসব জমিতে ১২টি পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছে প্রভাবশালীরা। এদিকে মিলের জমিতে আখ চাষ না হওয়ায় দুইবছর আগে এসব জমি বাপ-দাদার জমি ফেরৎ দেওয়ার কথা বলে প্রভাবশালী নেতারা এসব সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অসহায় লোকজনকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে। চলতি মাসের ৬ তারিখে পুলিশ-ইক্ষু শ্রমিক ও সাঁওতালদের সঙ্গে ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিন সাঁওতালের মৃত্যু হয়। আহত হয় পুলিশসহ ৩০ জন। এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি ও সাঁওতালদের পক্ষ থেকে দুটি মামলা দায়ের হয়। মামলায় এ পর্যন্ত পুলিশ ২৫ জনকে গ্রেফতার করেছে।
/এসএনএইচ/








