দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো নাটোরেও এখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে ফুল। আর ফাল্গুনে চাহিদা মেটাতে প্রস্তুত নাটোরের ফুল চাষিরা। এই ফুল চাষ করে নাটোরের বেকার যুবকরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। পাশাপাশি কর্মসংস্থান হয়েছে শত শত নারীর। নাটোরে উৎপাদিত ফুলের মধ্যে রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা, কাঠবেলী, গ্লাডিউলাস, চেরী ও চায়না বেলি ফুল অন্যতম।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, ‘জেলার সিংড়া, লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলায় মোট ৭৬ জন ফুলচাষি বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ করছেন। তাদের মধ্যে সিংড়া উপজেলায় দশমিক ১৩ হেক্টর জমিতে ১ জন, লালপুর উপজেলায় ৬২ হেক্টর জমিতে ৫০ জন কৃষক আর বাগাতিপাড়া উপজেলায় ৫ দশমিক ২৬ হেক্টর জমিতে ২৫ জন কৃষক ফুল চাষ করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নাটোরের ফুল চাষিরা রাজধানী ঢাকা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, যশোর, দিনাজপুর ও খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় ফুল বিক্রি করছেন। পাশাপাশি তারা ফুলের বীজ ও বাজারজাত করছেন।’
বাগাতিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বাবলু কুমার সূত্রধর বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘ঠেঙ্গামারা এলাকায় জাহাঙ্গীর ও রবিউল প্রথম ফুল চাষ শুরু করেন। এরপর আরও অনেক যুবক ফুল চাষে আগ্রহী হন। ফুল চাষে সফলতা আনতে চাষিদের উপজেলা কৃষি অফিস থেকে ট্রেনিং, মনিটরিং ও কিট দমনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়।’
তিনি আরও জানান, আগে এক বিঘা জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করে মাত্র ৪/৫ হাজার টাকা লাভ হতো। এখন বিঘাপ্রতি প্রায় ১ লাখ টাকা লাভ থাকে। তাই কৃষকরা ফুল চাষে ঝুঁকছেন।’
লালপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাবিবুল ইসলাম খান জানান, ‘লালপুর উপজেলা মূলত একটি উষ্ণ এলাকা হওয়ায় এখানে আখ ছাড়া তেমন কোনও ফসল উৎপাদন হতো না। এখানে পদ্মার চরও রয়েছে। এ কারণে বেশ কিছু জমি রয়েছে যা অনুর্বর। দীর্ঘদিন থেকে এই জমিগুলো পরিত্যাক্ত ছিল। উপজেলা কৃষি বিভাগের সহায়তায় কয়েকজন যুবক এখন এসব জমিতে ফুল চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।’
তিনি আরও জানান, ‘ফসলি জমি লিজ নিয়েও বেকার যুবকরা এখন বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ করছেন। তবে আখের চেয়ে ফুল চাষে তিনগুণ লাভ হয়।’
নবীনগর গ্রামের ফুল চাষি আফজাল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘৩৫ বছর আগে লালপুর উপজেলায় আমিই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু করি। প্রথমে তিনি ১৫ হাজার টাকা বছর হিসেবে ২০ বছরের চুক্তিতে ৩ বিঘা জমি লিজ নিয়ে ফুলের চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে ফুলের চাষ করছেন। তার বাগানের ফুল নিয়ে মালা গেঁথে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন উপজেলার প্রায় ১০ হাজার মহিলা।
তিনি আরও জানান, ‘একজন নারী সংসারের কাজের ফাঁকে প্রতিটি ফুলের মালার জন্য একটাকা পান। দিনে গড়ে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা আয় করছেন। তার বাগানের ফুল রাজধানী ঢাকার শাহবাগ, আগারগাঁও ছাড়াও রাজশাহী, বগুড়া, সিলেট ও নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়।’
আফজাল আরও জানান, ‘ফুলের একটি চারা রোপন করার পর ফুল ধরতে শুরু করলে তা প্রতিদিনই ধরে। বছরে একটি গাছ ৯ মাস ফুল দেয় আর শীতের তিন মাস কোনও ফুল হয় না। বর্তমানে আমি প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করছি।’
অপরদিকে বিশ্ব ভালবাসা দিবস উপলক্ষে ক্রেতাদের কাছে ফুল বিক্রি করতে ইতোমধ্যেই যশোর, ঢাকা ও নাটোরের ফুলচাষিদের কাছ থেকে ফুল কিনে জমা করতে শুরু করেছেন ফুল বিক্রেতারা। বিশ্ব ভালবাসা দিবসে ফুল বিক্রি করতে নিয়মিত বিক্রেতা ছাড়াও উপজেলার বাজার এলাকায় নতুন নতুন ফুল বিক্রির দোকান খুলে বসেছেন অনেকেই। কিছু কিছু দোকানে ইতোমধ্যেই বিক্রি হতে শুরু হয়েছে গোলাপ, জবা ও জারবেড়া ফুল।
নাটোর শহরের ছায়াবানি সিনেমা হল মোড়ের ফুল বিক্রেতা মাহবুব আলম সজল জানান, ‘আমি রজনীগন্ধা স্টিক ১৫ টাকা, গোলাফ ২০/৩০ টাকা ও গাদা চেইন ৫০/৬০ টাকা দরে বিক্রি করছি। রবিবার সকাল থেকে তিনি প্রায় ২শটি গোলাপ, দেড়শ রজনীগন্ধা ও ৫০টি জারবেড়া বিক্রি করেছি।’
দোকানি মোজাম্মেল জানান, ‘গত বছর বিশ্ব ভালবাসা দিবসে আমি প্রায় ৫০ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করেছিলাম। যার অধিকাংশ গ্রাহকই ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন।’
/এমডিপি/এসএনএইচ/








