একজন প্রকৃত কবির কাজ শুধু স্বপ্ন দেখা নয়, তার সময়ে, তার জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন ভঙ্গের যে বেদনা, সেই বেদনাও কবিকে তুলে আনতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন কবি হেলাল হাফিজ।
বাচিক শিল্প চর্চা কেন্দ্র ‘তারুণ্যের উচ্ছ্বাস’ এর উদ্যোগে আয়োজিত কবির ৭০তম জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে একথা বলেন তিনি।
‘যে জলে আগুন জ্বলে’ শিরোনামে শনিবার (৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সংগঠনটি।
কবি হেলাল হাফিজ বলেন, ‘একজন প্রকৃত কবির কাজ শুধু স্বপ্ন দেখা নয়, তার সময়ে, তার জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন ভঙ্গের যে বেদনা, সেই স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনাও কবি তার কাব্যে তুলে আনবেন। এই সমগ্রতা, এই সামগ্রিক দৃশ্যপট যখন একজন কবির কাব্যে আমরা পাবো, তিনি তার কালে এবং তার কালকে অতিক্রম করে ভবিষ্যতে তার সৃষ্টি সম্ভারকে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবেন।’
তিনি বলেন, ‘কবিতার এই জটিল ও তাত্ত্বিক দিক আজকের আলোচ্য বিষয় নয়। কিন্তু কথাগুলো যারা কবি, এমনকি যারা আবৃত্তিকার তাদের জন্য কিছুটা হলেও প্রাসঙ্গিক।’
এর আগে কবি তার কবিতা লেখার পেছনের গল্প শোনান।
কবি হেলাল হাফিজ বলেন, ‘মাতৃ বিয়োগের বেদনা এতটাই প্রবল প্রখর সর্বগ্রাসী ছিল যে, সেদিন মনে হয়েছিল, আমাকে যদি বাঁচতে হয়, এই বেদনাকে শিল্পে রূপান্তরিত করতে হবে। সেই শিল্প আমার যাপিত জীবনের কাহিনী হলেও, আমি যেন তা সকলের মাঝে সঞ্চারিত করতে পারি। আমার কথামালা দিয়ে যেন মানুষ সংক্রমিত হয়, আলোড়িত হয়, তাদের করোটিতে, মনে, মগজে আমার শব্দমালা যেন অনুরণন তৈরি করে। এমনি এক অসাধ্য অকল্পনীয় আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কাঙাল যুবক যাত্রা শুরু করেছিল। খুব সৌভাগ্য হয়েছিল, এ ভূখণ্ডের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা আমার জীবনের প্রথম যৌবনে এবং মধ্য জীবনের সংঘটিত হয়েছিল। যেগুলো আমাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এতটাই প্রভাবিত করেছে যে, এই ভূখণ্ডের মানুষের স্বপ্ন, তার আকাঙ্ক্ষা, তার বাসনা আমি আমার শব্দমালায় গেঁথে দিতে চেষ্টা করেছি।’
তিনি বলেন, ‘যে বিরহের কথা যে বেদনার কথা একটু আগে উল্লেখ করলাম এবং বললাম, এই বেদনাকে শিল্পে রূপান্তরিত করাই একজন কবির কাজ।’
চট্টগ্রামের সঙ্গে নিজের ভালোবাসার কথা তুলে ধরে কবি বলেন, ‘আমার কাব্য জীবনে চট্টগ্রাম কিভাবে কতটা জড়িয়ে আছে, তার অল্প কয়েকটি দৃষ্টান্ত আপনাদের কাছে নিবেদন করতে চাই। ওই যে আমার মাতৃহীনতার কথা বললাম। ওইটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনা। কিন্তু ওই কষ্টটা আমি অনুভব করতে পারিনি। কারণ, তখন আমার বয়স মাত্র তিন বছর। আনন্দকেই যে শুধু উপভোগ করা যায়, তা কিন্তু নয়। বেদনাও উপভোগের বিষয়। একবার যদি তা আয়ত্ত করতে পারেন, বেদনাকে উপভোগ করতে শেখেন এবং তা শিল্পে রূপান্তরিত করতে পারেন, আপনাকে আর কে ধরতে পারে, কেউ নাগাল পাবে না।’
কবি বলেন, ‘আমার আরেকটি বেদনা আছে, আজ থেকে ৫৬/৫৭ বছর আগে আমার বয়স তখন ১০/১১ বছর হবে। আমার নানা হজে যাবেন, তখনতো এতগুলো মানুষ উড়োজাহাজে যাওয়ার বিষয় ছিল না, জাহাজে যাবেন। তিনি নেত্রকোনা থেকে চট্টগ্রামে যাবেন। আমার সেই যে কান্নাকাটি, আমি নানার সঙ্গে চট্টগ্রাম যাবো, তাকে জাহাজে তুলে দেবো। কিন্তু বাস্তবতার কারণে এটি সম্ভব হয়নি। আমাকে চট্টগ্রাম থেকে আবার কে নিয়ে যাবে? আমাকে নানা ধরনের উপঢৌকন ঘুষ যাকে বলে, অনেক কিছু দিয়ে নানা একাই জাহাজ ধরলেন। এটি আমার জীবনের দ্বিতীয় বেদনা। যেহেতু আমি মাতৃহীন ছিলাম, অসম্ভব স্নেহ আদর নানা আমাকে করতেন। কিন্তু বাস্তবতার কারণে আমাকে আনা সম্ভব হয়নি। ওই দিন ওই ঘটনা থেকে চট্টগ্রাম আমার বুকের ভেতরে এক ধরনের দ্রোহের জন্ম দিয়েছে। ভালোবাসার জন্ম দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জন্মস্থানকে (নেত্রকোনা) আমি বোন বলে সম্বোধন করি। আজ অত্যন্ত আনন্দ এবং গৌরবের সঙ্গে বলছি, আমার বোনেরও একটা সতীন আছে তার নাম চট্টগ্রাম।’
এর আগে সন্ধ্যা সাতটার দিকে মো. মুজাহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় শুরু হয় অনুষ্ঠান। শুরুতে উদ্বোধনী কথামালা নিয়ে মঞ্চে আসেন বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. আহকাম উল্লাহ। পরে একে একে কবিকে নিয়ে কথা বলেন বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রণজিৎ রক্ষিত, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত নন্দিত শিশু সাহিত্যিক রাশেদ রউফ, কবি ও সাংবাদিক কামরুল হাসান বাদল ও সম্মিলিত আবৃত্তি জোটের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মশরু হোসেন প্রমুখ।
কথামালার ফাঁকে ফাঁকে চলে কবিতা আবৃত্তি। নিজ কণ্ঠে নিজের কবিতা আবৃত্তি করেন কবি হেলাল হাফিজ।






