গৌরনদীতে পুলিশের অনিয়ম-দুর্নীতি: শাস্তি শুধুই প্রত্যাহার

আনিসুর রহমান স্বপন, বরিশাল
০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৯:৪৮আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১১:৪৩

প্রত্যাহার হওয়া চার ওসি (বাঁ থেকে) সাজ্জাদ হোসেন, আলাউদ্দিন মিলন, ফিরোজ কবির ও মনিরুল ইসলাম অনিয়ম-দুর্নীতি ও  দায়িত্বে বহেলাসহ নানা অভিযোগে গত আড়াই বছরে বরিশালের গৌরনদী থানার চার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে। আর শাস্তি হিসেবে শুধু তাদের বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার ও ডিআইজি কার্যালয় এবং বরিশাল পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। সেখান থেকে দুই কর্মকর্তা এরইমধ্যে বিভিন্ন থানায় ওসি হিসেবে যোগও দিয়েছেন।
গৌরনদী থানা ও জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, আগৈলঝাড়া থানা থেকে ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর গৌরনদী থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে যোগদান করেন সাজ্জাদ হোসেন। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ২০১৫ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে ওসি মো. সাজ্জাদ হোসেনকে গৌরনদী থানা থেকে বরিশাল পুলিশ লাইনসে ক্লোজড করা হয়। দীর্ঘদিন বরিশাল পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত থাকার পর ২০১৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বানারীপাড়া থানায় ফের তিনি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে যোগদান করেন।
জানা যায়, ২০১৫ সালের ১৬ জুলাই ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদী উপজেলার নিলখোলায় বিআরটিসির একটি বাস দুর্ঘটনা কবলিত হলে মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বরিশাল রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি মো. হুমায়ুন কবির তখন সাংবাদিকদের জানান, খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গেলেও সেখানে থানার কোনও পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। এজন্য দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বরিশাল জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার এস এম আক্তারুজ্জামান ওইদিনই (১৬ জুলাই) গৌরনদী থানার ওসি সাজ্জাদ হোসেনকে পুলিশ লাইনসে ক্লোজড করেন।
গৌরনদী থানার আরেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলাউদ্দিন মিলন গৌরনদী থানায় ২০১৫ সালের ১০ আগস্ট যোগদান করেন। ২০১৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গৌরনদীর কটকস্থল গ্রামের হীরা মাঝিসহ তিন মাদক বিক্রেতাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। বরিশাল জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার এসএম আক্তারুজ্জামান তখন মাদক বিক্রেতাদের সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগে ৩০ মার্চ ওসি আলাউদ্দিন মিলনকে ক্লোজড করে বরিশাল ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করেন। দীর্ঘদিন ডিআইজি অফিসে সংযুক্ত থাকার পর ওসি আলাউদ্দিন মিলন ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর পটুয়াখালীর কলাপাড়া থানায় ওসি হিসেবে যোগদান করেন।
২০১৭ সালের ১ এপ্রিল গৌরনদী থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে যোগদান করেন ফিরোজ কবির। কিন্তু যোগদানের এক মাস পর মাদকবিরোধী অভিযান ও মাদক নির্মূলের অন্তরালে ঘুষ বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে ওসি ফিরোজ কবিরের বিরুদ্ধে। এরপর নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগে চার মাসের মাথায় ৩১ জুলাই ওসি ফিরোজ কবিরকে গৌরনদী থানা থেকে ক্লোজড করে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। তখন ওসি ফিরোজ কবির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমাকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরিশাল পুলিশ অফিসে যুক্ত করেছে। তবে কোনও অভিযোগের ভিত্তিতে নয়।’
এরপর আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলামকে ২০১৭ সালের ১ আগস্ট গৌরনদী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আসামি ছেড়ে দেওয়াসহ নানাবিধ অভিযোগের ভিত্তিতে যোগদানের ৫ মাস ২৫ দিন পর চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি ওসি মনিরুলকে ক্লোজড করা হয়।
জানা গেছে, উপজেলার পালরদী মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র ও ছাত্রলীগকর্মী সাকির গোমস্তা হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ফাহিমকে গ্রেফতারের পর ২১ নভেম্বর ২০১৭ দুপুরে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ অভিযোগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির তদন্তে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় ওসি মনিরুলকে ২৬ জানুয়ারি ২০১৮ রাতে গৌরনদী থানা থেকে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘আসামি ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলামকে ২৬ জানুয়ারি রাতে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। অন্য তিন ওসি আমার যোগদানের আগেই ক্লোজড হয়েছিলেন। তারা কী কারণে শাস্তি পেয়েছিলেন তা বলতে পারছি না।’
বরিশাল জেলা মানবাধিকার জোটের সভাপতি ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, একদিকে কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেন অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যেই তাদের ক্লোজড করা হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পরেই তারা অন্যখানে পদ পেয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। এভাবে পুলিশ বাহিনীকে দুর্নীতিমুক্ত এবং জবাবদিহিমুখী করা যাবেনা। এজন্যে প্রয়োজন দ্রুত কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
বরিশালের জেলা পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ক্লোজ করা একটি শাস্তিমূলক বিভাগীয় ব্যবস্থার চলমান প্রক্রিয়া। মূলত তদন্ত কাজে নিরপেক্ষতার খাতিরেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরপর তদন্তসাপেক্ষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বেতন, প্রমোশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বন্ধ-হ্রাস, চাকরিচ্যুতি বা বদলির মতো বিভাগীয় শাস্তি দেওয়া হয়।
এছাড়া পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকলে সংশ্লিষ্ট দফতর বা ভিকটিমরা সবসময়েই আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।

/এমও/এফএস/টিএন/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
পশ্চিমবঙ্গে যেকারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
কী, কেন, কীভাবেপশ্চিমবঙ্গে যেকারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামে নেওয়া যাবে না পানির বোতল
বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামে নেওয়া যাবে না পানির বোতল
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম