হাকালুকিতে পাহারাদারের হাতেই নিধন হচ্ছে অতিথি পাখি!

সাইফুল ইসলাম, মৌলভীবাজার
১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২১:১৬আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২১:২৭

শিকারের পর পাখি সংগ্রহ করা হচ্ছে

হাকালুকি হাওরে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখি নিধন হচ্ছে। পাখি ধরতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিষটোপ। হাওর দেখাশুনার জন্য নিযুক্ত পাহারাদাররা রাতে অতিথি পাখির বিচরণস্থলে বিষ মেশানো খাদ্য ছিটিয়ে রেখে কাছাকাছি পাড়ে লুকিয়ে থাকেন। এরপর বিষাক্ত খাদ্য খেয়ে পাখিগুলো অসুস্থ হয়ে ঢলে পড়লে সেগুলো ধরে তারা সিলেট ও মৌলভীবাজার শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। পাহারাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে একইভাবে পাখি নিধন করেন পেশাদার শিকারিরাও। শুধু বিষটোপ নয়; জাল ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতেও পাখি নিধন হচ্ছে। পেশাদার শিকারি ছাড়া সৌখিন শিকারিরাও বন্দুক দিয়ে অতিথি পাখি নিধন করছেন। এতে একদিকে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ফসলি জমিতে ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ বাড়ছে।

মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার ৫টি উপজেলাজুড়ে হাকালুকি হাওরের বিস্তার। এটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হাওর। ৪৮ হাজার হেক্টরের এ হাওরে ২৩৮টি বিল ও ১০টি নদী রয়েছে। এখানে প্রতি বছর শীতের শুরুতে সাইবেরিয়া ও হিমালয়ের পাদদেশ লাদাক থেকে ৫০-৬০ প্রজাতির লাখো অতিথি পাখি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে আসে। এসব ভিনদেশি বিচিত্র রঙের পাখি দেখার জন্য পর্যটকরাও ছুটে আসেন এ হাওরে।

অতিথি পাখিরা এ হাওরের চকিয়া, কাংলি, গোবরকুড়ি, গৌড়কুড়ি, জল্লা, হাওরখাল, পিংলা, কালাপানি, মালাম, বাইয়াগজুয়া, নাগুয়ালরীবাই, ফুটবিল ও কৈয়াকোনা বিলেই সাধারণত আশ্রয় নেয়। তাই এ বিলগুলো শীতের দিনগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই হাজারো পর্যটকে মুখর থাকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেশাদার ও সৌখিন পাখিশিকারিদের কারণে হাকালুকি হাওর অতিথি পাখির জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।

ফাঁদ পেতে নিধন করা অতিথি পাখি

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘সিএনআরএস’ হাওরের বিভিন্ন বিলের পাখি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের নিয়ে বিভিন্ন সমিতি গঠন করে দিয়েছে। এসব সমিতি কিছু ব্যক্তিকে হাওরের পাহারদার নিযুক্ত করেছে। অভিযোগ আছে, এসব পাহারাদাররাই অবাধে অতিথি পাখি শিকার করছেন। এছাড়া তাদের সঙ্গে আঁতাত করে পেশাদার ও সৌখিন শিকারিরা বিষটোপসহ নানা ফাঁদ পেতে পাখি নিধন করেন।

হাওরপাড়ের বাসিন্দারা জানান, নিরাপদ বিচরণের অভাব ও শিকারিদের উৎপাত বাড়ায় অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার হাওরে পাখি কম এসেছে।

হাওরের বোরো চাষি আব্দুল হালিম জানান, পেশাদার পাখি শিকারিরা দিনে গরু-মহিষ ও হাঁস চড়ানোর নামে বিষটোপ ফেলে পাখি ধরে। পরে সুযোগ বুঝে এসব পাখি বস্তায় ভরে নিয়ে যায়। পাহারাদারদের ‘ম্যানেজ’ করে রাতেও তারা এ কাজ করে। অনেকে দিনের বেলায় পাহারাদারের অস্থায়ী বাসায় অবস্থান নেয়। পরে রাতে জাল দিয়ে ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করে ভোর হওয়ার আগেই হাওর ত্যাগ করে।

বিষটোপ দিয়ে মারা পাখি

সরকারের অভয়াশ্রম ঘোষিত পলোভাঙ্গা বিলের পাড়ে একটি অস্থায়ী ঘর রয়েছে। সম্প্রতি এ ঘরে গিয়ে দেখা যায়, ২০-২৫ জন লোক থাকার জিনিসপত্র রয়েছে এখানে। এ ঘরের বাইরে বড় একটি হাঁড়িতে এক ব্যক্তি ভাত রান্না করছেন। নুরুল ইসলাম নামের ওই ব্যক্তি নিজেকে সিএনআরএসের পাহারাদার বলে দাবি করেন। তিনি আরও জানান, অন্য লোকজন বিলের অপর পাড়ে রয়েছেন। এ ঘরের পাশেই বেশ কিছু অতিথি পাখির ডানা ও পশম পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ নিয়ে প্রশ্ন করলে নুরুল ইসলাম বলেন, ’১০-১২ দিন আগে একটি বক শিকার করেছিলাম। সে পাখির পশম পড়ে আছে।’

কুলাউড়া উপজেলায় হাকালুকি হাওর রক্ষায় নিয়োজিত ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ইকোসিস্টেম অ্যান্ড লাইভলিহুডস (ক্রেল) প্রকল্পের ফিল্ড অর্গানাইজার মো. হেলাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাকালুকি হাওরের একটি অংশ কুলাউড়ায় পড়েছে, এটাই আমার সাইট। এবার আমার সাইটে কড়া নজর রাখছি। এখানে বিষটোপ বা বন্দুক দিয়ে কোনও অতিথি পাখি শিকার হয় না। তবে বড়লেখা এলাকায় কিছু পাখি শিকার হলেও হতে পারে।’

পাহারায় নিয়োজিতদের হাওর পাড়ে নির্মিত অস্থায়ী ঘরের পাশে পড়ে থাকা পাখির পশম

ক্রেল প্রকল্পের এনআরএম ফ্যাসিলেটর মো. সিকান্দর আলী মুঠোফোনে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হাকালুকি হাওরের দুই শতাধিক বিলের মধ্যে ৫টি মাছের অভায়শ্রম। সেগুলো আমরা দেখাশুনা করি। মাছের এই অভায়শ্রমগুলো পাহারা দেন সিএনআরএসের পাহারাদাররাও।’ পলভাঙ্গা বিল, টুলার বিল, বাইয়া বিল, কৈয়ার কোনা বিল, পায়া গজুয়া বিলে অতিথি পাখি আসে না বলে দাবি করেন। তবে বড়লেখার ইসলামপুরের বাসিন্দারা পাখি নিধন করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। 

কুলাউড়ার উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. সুলতান মাহমদ স্থানীয় মৎস্যজীবী বরাত দিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিএনআরএসের পাহারাদারসহ স্থানীয়দের বিরুদ্ধে অতিথি পাখি নিধনের অভিযোগ পেয়েছি। এদের কারণে অতিথি পাখি আর আগের মতো আসে না। আগে ৫০-৬০ প্রজাতির পাখি আসলেও এবার বড়জোর ৩০-৪০ প্রজাতির পাখি এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে হাওর একসময় পাখিশূন্য হয়ে পড়বে। পাখি শিকার বন্ধ করা না গেলে চরম হুমকিতে পড়বে হাওরের জীববৈচিত্র্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতা জরুরি।’ পাখিশিকারি চক্রকে ধরিয়ে দিতে সবার এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

বিষাক্ত খাদ্য খেয়ে অসুস্থ হয়ে ঢলে পড়া পাখি বিল থেকে কুড়িয়ে এনেছে শিশুরা

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সুহেল মাহমুদ বলেন, ‘শুনেছি, সিএনআরএসের পাহারাদারদের মদদে শিকারিরা অতিথি পাখি শিকার করে। হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। কোনোভাবেই অতিথি পাখি নিধন করা যাবে না। পাখিশিকারিদের ধরা গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে শাস্তি দেওয়া হবে।’

 

/এমএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ওপেনএআই’র নতুন বাজি ‘কোডেক্স’
ওপেনএআই’র নতুন বাজি ‘কোডেক্স’
বহু কাজ এখনও বাকি, কীভাবে চালু হবে শিশু হাসপাতাল
বহু কাজ এখনও বাকি, কীভাবে চালু হবে শিশু হাসপাতাল
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে খেলতে পারবেন তো ইয়ামাল? 
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে খেলতে পারবেন তো ইয়ামাল? 
রাজশাহীতে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল
রাজশাহীতে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের