বাসার কলাপসিবল গেটের ভেতরে আটকে পড়েছিলেন কলেজছাত্রী শাহিনা আক্তার (২২)। গেটের ফাঁক দিয়ে হাত বের করে প্রতিবেশীদের হাত ধরে তিনি বাঁচাও-বাঁচাও বলে আর্তচিৎকারও জুড়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবেশীরা এসে গেটের তালা ভেঙে বের করার আগেই আগুনে তার শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে যায়।
বুধবার (২৫ এপ্রিল) দিনগত রাত সোয়া ২টার দিকে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের ভোজবল গ্রামে আগুনে পুড়ে মারা যান শাহিনা আক্তার। এদিন শাহিনার সঙ্গে তার মা রোকেয়াও (৫৫) চলে যান না ফেরার দেশে। এ ঘটনায় দগ্ধ হন শাহিনা আক্তারের ভাই মুন্না আজিজ (২০)। তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
শাহিনা আক্তারের খালাতো ভাই বদরুল আলম চৌধুরী জানান, শাহিনার সঙ্গে ইতালি প্রবাসী এক ছেলের বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। কথা ছিল, ২৬ এপ্রিল ছেলে পক্ষ এসে বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করবে। সেভাবেই প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু বুধবার রাতের আগুনে সব শেষ হয়ে গেল।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, বুধবার (২৫ এপ্রিল) দিনগত রাত সোয়া ২টার দিকে রাজনগর সদর ইউনিয়নের ভোজবল গ্রামে মৃত ওয়াছির মিয়ার স্ত্রী রোকেয়া আধাপাকা (সেমি পাকা) বসতঘরে বৈদ্যুতিক শর্ট-সাকিট থেকে আগুন লেগে যায়। আগুন পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজন এবং মৌলভীবাজার ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
শাহিনা আক্তারের খালাতো ভাই বদরুল আলম চৌধুরী আরও জানান, প্রবাসী ওয়াছির মিয়া গত একবছর আগে দেশে ফিরে হার্ট-অ্যার্টাকে মারা যান। তার তিন মেয়ের মধ্যে দুই মেয়ের আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়ে শাহিনা ও একমাত্র ছেলে মুন্না আজিজ এখনও অবিবাহিত।
বদরুল আলম চৌধুরী জানান, শাহিনা মৌলভীবাজার মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। আর মুন্না আজিজ মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে বিবিএ প্রথম বর্ষে পড়াশুনা করছেন। শাহিনাকে বুধবার বিকালে নানার বাড়ি সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের আলাপুর গ্রাম থেকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন মুন্না আজিজ। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে সবাই ঘুমিয়ে পড়েন। এরপরই ঘটে ওই দুর্ঘটনা।
রোকেয়া বেগমের দেবর শামছুল হক বলেন, গভীর রাতে প্রচণ্ড শব্দ শুনে ঘর থেকে বের হই। বের হয়েই দেখতে পাই, রোকেয়া বেগম ও শাহিনা আক্তার কলাপসিবল গেটের সামনে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছেন। তখন আরও কয়েকজন প্রতিবেশীও সেখানে ছুটে আসেন। শাহিনা আমাদের হাত ধরে বাঁচার আকুতি জানান।
ঘটনার এ প্রত্যক্ষদর্শী আরও বলেন, ‘কলাপসিবল গেটে তালা দেওয়া থাকায় দরজা খোলা যাচ্ছিল না। এদিকে, ঘরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। পাশের বাড়ির একজন শাবল নিয়ে আসেন। এর আগেই রোকেয়া বেগম ও শাহিনা আক্তারের গায়ে আগুন ধরে যায়। গেটের তালা ভাঙতে ভাঙতেই আগুনে পুড়ে যান মা-মেয়ে। তালা ভেঙে যখন তাদের বের করা হয়, তখন তারা পুড়ে গেছেন। তাদের ধরা যাচ্ছিল না।’ শাহিনা ঘটনাস্থলেই মারা যান বলেও জানান তিনি।
শামছুল হক আরও বলেন, ‘এদিকে, মুন্না আজিজ ঘরের পূর্ব পাশের বাথরুমে ঢুকে পানি ঢালতে থাকেন। এরপরও তার পিঠ ও পা পুড়ে গেছে।’
তিনি জানান, পরে খবর পেয়ে রাজনগর থানার পুলিশ ও মৌলভীবাজার ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে এসে স্থানীয়দের সহায়তায় আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্স আসার পর মুন্না আজিজ ও তার মা রোকেয়া বেগমকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ঢাকা নেওয়ার পথে শ্রীমঙ্গল এলাকায় রোকেয়া বেগম মারা যান। পরে তাকে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যার হাসপাতালের মর্গে নিয়ে আসা হয় এবং মুন্না আজিজকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।
রাজনগর থানার ওসি শ্যামল বণিক বলেন, বৈদ্যুতিক শটসার্কিট থেকে ফ্রিজের কমপ্রেসার বিস্ফোরণ হলে দগ্ধ হয়ে মারা যান শাহিনা ও তার মা রোকেয়া। উভয়ের ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার ভুজবল গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়।








