তেঁতুলিয়ার টুপিপল্লিতে ভিড় বাড়লেও লোকসানে ব্যবসায়ীরা

সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ, পঞ্চগড়
০১ জুন ২০১৮, ১৬:৫১আপডেট : ০২ জুন ২০১৮, ১০:১৮

মাথাফাটা গ্রামের টুপিপল্লি

রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার মাথাফাটা গ্রামের টুপিপল্লিতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। দিনরাত কারখানাগুলোতে চলছে টুপি তৈরির কাজ। ঈদ উপলক্ষে টুপির চাহিদা বেশি হওয়ায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন শ্রমিকরা। জানা যায়, নতুন ডিজাইন, মানসম্মত ও আকর্ষণীয় টুপির কারণে শুধু দেশেই নয়; তেঁতুলিয়ার টুপি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সৌদি আরব, মিশর, কুয়েত, ইন্দোনেশিয়া, তাজিকিস্তান, পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশেও রফতানি হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় এবারও ঈদকে কেন্দ্র করে এই টুপিপল্লি সরগরম হয়ে উঠলেও স্বস্তি নেই ব্যবসায়ীদের মনে। তাদের অভিযোগ, তুরস্ক ও চীন থেকে আমদানি করা টুপির কারণে বাজারে মার খাচ্ছে স্থানীয়ভাবে তৈরি করা এসব টুপি। গুণগতমানসম্পন্ন কিছু টুপি উৎপাদন মূল্যের চেয়েও কমদামে বিক্রি করতে হচ্ছে।   

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯১ সালে তেঁতুলিয়ার মাথাফাটা গ্রামে প্রথম টুপি তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে। ১৯৯৪ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে কারখানাগুলো দেশের পাশাপাশি বিদেশে টুপি রফতানি শুরু করে। পঞ্চগড় নুরুন আলা নূর কামিল মাদ্রাসার অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মো. আব্দুল হান্নান সর্বপ্রথম এখানে টুপি তৈরি শুরু করেন। বর্তমানে ওই এলাকায় বেশ কয়েকটি কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় শত শত পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি অর্ধ-শতাধিক নারী শ্রমিকও কাজ করেন। একজন নারী টুপি কারখানায় কাজ করে মাসে দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা আয় করছেন। টুপি শিল্পে কাজ করে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। গ্রামীণ অর্থনীতির মাইলফলক হিসেবে সম্ভাবনাময় এই শিল্প তেঁতুলিয়ার প্রত্যন্ত এলাকার প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকার গতিপথ বদলে দিয়েছে।

মাথাফাটা গ্রামের টুপিপল্লি

আল-খাইয়্যাত নামে একটি টুপি কারখানার শ্রমিক ও কলেজছাত্র সুমন ইসলাম বলেন, ‘লেখাপড়ার পাশাপাশি ঈদের সময়ে টুপির কারখানায় কাজ করি। এ সময় যে বাড়তি আয় হয়, তা দিয়ে পড়ালেখার খরচ তো চলেই যায় এবং পরিবারকেও সহযোগিতা করি।’

সরেজমিন জানা যায়, ঈদ সামনে থাকায় কারখানাগুলোতে ব্যস্ততা অনেক বেশি। একটি কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, ৪০ থেকে ৫০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। প্রথম দিকে মাসে কারখানাটিতে ১২ থেকে ১৫ হাজার টুপি তৈরি করা হতো। এখন প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০টি টুপি তৈরি করা হয়। বিভিন্ন মডেল ও ডিজাইনের একটি টুপি তৈরি করতে খরচ পড়ে ৮০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা। কিছু কিছু মডেলের টুপি তৈরিতে বাজার মূল্যের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি পড়ে যায় বলেও জানান ব্যবসায়ীরা।

কারখানা মালিকদের অভিযোগ, বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সুতাসহ টুপির প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং উৎপাদিত টুপির ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। শ্রমিকরাও পাচ্ছেন না উপযুক্ত মজুরি। এছাড়া চীন ও তুরস্কের নিম্নমানের টুপি বাংলাদেশের বাজারে কম দামে বিক্রি হওয়ায় কারণে দেশি টুপির চাহিদার ওপর তার প্রভাব পড়ছে। 

মাথাফাটা গ্রামের টুপিপল্লিতে তৈরি টুপি

আলিঙ্গন টুপি কারখানার স্বত্বাধিকারী শাহিদা খাতুন (৪০) বলেন, ‘যে হারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, সে হারে টুপির দাম পাচ্ছি না। এই কারখানা চালাতে গিয়ে জমি বিক্রি করতে হয়েছে। সরকারি কোনও সহায়তা পাইনি। তাই কাজ করার মতো বহু নারী শ্রমিক থাকলেও তাদের কাজ দিতে পারছি না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে অনেকের মতো আমাকেও কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে।’

দেশীয় এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে ও টুপিপল্লির ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প বিকাশে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এসব টুপি কারখানা থেকে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রান্তিক এ জেলার টুপিশিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

একটি কারখানা মালিক জানান, ইতোপূর্বে বিদেশের টুপির বাজার বাংলাদেশের দখলে ছিল। কিন্তু বর্তমানে চীন সে বাজার দখল করে নিয়েছে। তাদের কারখানাগুলো সরকারের সহযোগিতায় কম দামে টুপি তৈরি করতে পারে। তাই তারা কম দামে টুপি বিক্রি করছে।

চীন ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টুপি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কুটিরশিল্পের নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে হবে। নইলে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা যাবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



/আইএ/এএইচ/চেক-এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
চার অঞ্চলে ঝড়ের আভাস
চার অঞ্চলে ঝড়ের আভাস
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিফতরে অবিবাহিতদের চাকরির সুযোগ, লাগবে না অভিজ্ঞতা
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিফতরে অবিবাহিতদের চাকরির সুযোগ, লাগবে না অভিজ্ঞতা
মাজারের কুমিরটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণে
মাজারের কুমিরটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণে
শিশু রামিসা হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক আজ, আদালতে আনা হয়েছে আসামিদের
শিশু রামিসা হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক আজ, আদালতে আনা হয়েছে আসামিদের
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের