সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তে মেঘালয় থেকে নেমে আসা বালু-পাথর-কাদামাটিতে ৩০ বছর ধরে নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এ অবস্থা চলতে থাকলে এলাকায় কোনও আবাদযোগ্য জমি থাকবে না বলে আশঙ্কা এলাকাবাসীর। একইসঙ্গে এত দিন ধরে এ সমস্যা জিইয়ে থাকার পরও তা নিরসনে সরকারিভাবে কোনও উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সীমান্তের ওপাড়ে মেঘালয় পাহাড় থেকে অপরিকল্পিতভাবে কয়লা ও চুনাপাথর তোলার ফলে ১৯৮৮ সাল থেকে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে পাহাড় থেকে বালু, পাথর ও কাদা নেমে আসা শুরু হয়। প্রথমে পরিমাণে অল্প হলেও ২০০৭ সালের ২১ আগস্ট রাতে বড় ধরনের পাহাড়ধসে বিপুল পরিমাণে কয়লা, কাদা-বালি নেমে আসে। এতে নষ্ট হয়ে যায় কৃষিজমি, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এরপর থকে প্রতি বছর বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা বালুতে নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি। শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ক্ষতির আশঙ্কা না থাকলেও বর্ষাকালে বেড়ে যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়নের রজনীলাইন, চাঁনপুর, রাজাই ও শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের বুরুঙ্গাছড়া গ্রামের পচাশোল হাওরের এক হাজার কৃষকের ৩৫০ হেক্টর কৃষিজমি ধান চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব জমিতে প্রতিবছর ৪০০ থেকে ৫০০ মেট্রিকটন ধান উৎপাদন হতো।
বড়দল উত্তর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য সম্রাট মিয়া জানান, কয়েক বছর আগেও তাদের যৌথ পরিবারের ২০ কেয়ার জমি ছিল। কিন্তু পাহাড়ি ঢলে তাদের ২০ কেয়ার জমির মধ্যে এখন মাত্র ১০ কেয়ার জমিতে চাষাবাদ করা যায়। বাকি জমিতে বালি পড়ে ধান চাষের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে।
চাঁনপুর গ্রামের ডাক্তার আজিজুল্লাহ বলেন, ‘গত ১০/১৫ বছরের ব্যবধানে তাদের পরিবারের ৮ কেয়ার জমির মধ্যে ৬ কেয়ার জমিতে বালি ভরাট হয়ে চাষাবাদের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এখনও যেভাবে বালু আসছে প্রতিদিন তাতে আবাদযোগ্য জমিগুলোও পতিত জমিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।’
একই গ্রামের কৃষক ইউসুফ আলী বলেন, ‘ঢলের পানিতে যেভাবে বালু নেমে আসে এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে এলাকায় চাষাবাদের কোনও জমি থাকবে না।’ সরকার এখানও কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় কৃষক রাজা মিয়া বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় ছোট-বড় অর্ধশতাধিক পাহাড়ি ছড়া রয়েছে। বর্ষাকালে বৃষ্টি হলে এসব ছড়া দিয়ে বালি নেমে আসে। ফলে রাস্তাঘাট ব্রিজ-কালভার্ট পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতা হারাচ্ছে।’
বড়দল উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবুল কাসেম বলেন, ‘১৯৮৮ সাল থেকে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আজ ৩০ বছর চলছে। কিন্তু কেউ বালির বন্যা আটকানোর কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। এতে তিলেতিলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি ও বিভিন্ন অবকাঠামো।’
তাহিরপুর উপজেলার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, সীমান্তের ওপাড় থেকে নেমে আসা বালিতে তাদের ৩৫০ মিটার সীমান্ত সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৩৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাহাড়ের বালি সড়কের ওপর পড়ে সীমান্ত সড়কের বেশ কিছু স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এছাড়া কমপক্ষে ৫টি কালভার্ট ও ছড়া বালিতে ভরে গিয়ে পানি নিষ্কাষণের ক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে পানি নিষ্কাষণে সমস্যা হচ্ছে। কালভার্টের মুখের বালু সরানো গেলে এগুলো পানি নিষ্কাষণের উপযোগী হয়ে উঠতে পারে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পূর্ণেন্দু দেব বলেন, ‘সীমান্তে বালুর কারণে কৃষিজমিসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নষ্ট হওয়ার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বালু আটকানোর কোনও ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না।’ তবে সীমান্ত এলাকার পাহাড়ি ছড়াগুলোর পানির গতিপথ বদলে দেওয়ার জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।








