তখন দুপুর। কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বি-ব্লক। কথা হচ্ছিল কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সঙ্গে। পাশেই অনেকটা জড়োসড়ো হয়ে বসেছিলেন রোহিঙ্গা তরুণী মিনু আরা (ছদ্মনাম)। তার পোশাক, চুলের বিনুনি–ঠিকঠাক, পরিপাটি। শুধু কী এক গভীর বিষাদ ভর করে আছে চোখে-মুখে। সাংবাদিক দেখে জড়ো হওয়া রোহিঙ্গারা জানালেন, মেয়েটি তাদের দেশের সেনাবাহিনীর ‘ভয়ঙ্কর নির্যাতনে’র শিকার। মেয়েটি অন্য রোহিঙ্গাদের সঙ্গে খুব একটা মেশে না; একা একা থাকে এবং যখন-তখন হাউমাউ করে কাঁদে।
মিনু আরার দিকে ভালো করে তাকাতেই দু’টো প্রশ্ন জাগে মনে। এক, দুঃখ-কষ্ট-শোকের কি কোনও দৃষ্টিগ্রাহ্য অবয়ব আছে? দুই, গলার কাছে,বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে ওঠা যন্ত্রণা কেমন করে ছায়া ফেলে ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের চেহারায়?
চোখের নিচে পড়া কালি জমা এই মেয়েটিকে পলকের দেখাতেই কেমন যেন ধাক্কার মতো লাগে বুকে। জড়োসড়ো মেয়েটি থেমে থেমে জানায়, তার বয়স এখনও ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি। মিয়ানমারের আকিয়াব জেলার মংডু উপজেলার আরকান রাজ্যের শীলখালী গ্রামে সে বেড়ে উঠেছে। মেয়েটির ধারণা, তার বাবা-মাকে মেরে ফেলেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। মরতে মরতে বেঁচে গেছে সে।
যে বর্বরতার মধ্য দিয়ে মেয়েটি গেছে তা নিয়ে প্রথমে কথা বলতেই চায়নি সে। তবে রোহিঙ্গা মাঝি মোক্তারের কথায় অভয় পেয়ে কথা বলতে শুরু করে। মিনু আরা বলে, ‘সেদিন ছিল শনিবার। সেনাবাহিনী গ্রামে আসার খবরে ভয়ে শীলখালীর মানুষ এদিকে-ওদিক দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। তখন আমিও দিগ্বিদিক ছুটতে থাকি। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ধরা পড়ে যাই সেনাবাহিনীর ৮ জনের একটি দলের হাতে।’
মিনু আরার ভাষ্য, ‘আমাকে ধরার পর পরই বন্দুক দিয়ে বেধড়ক পেঠাতে থাকে তারা। একপর্যায়ে আমার মুখের ভেতর বন্দুকের নল ঢুকিয়ে মেরে ফেলার ভয় দেখায়। কিন্তু কেন যেন শেষপর্যন্ত মারেনি। পরে আমাকে হাত-পা বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে একটি খালি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আমার ওপর জুলুম (সংঘবদ্ধ ধর্ষণ)করা হয়। এরই একপর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’
অশ্রুসজল চোখে মিনু আরা বলে চলে, ‘জ্ঞান হারালে মরে গেছি ভেবে তারা আমাকে ফেলে রেখে চলে যায়। এরপর পাড়া-প্রতিবেশীরা আমাকে উদ্ধার করে। জ্ঞান ফিরতেই দেখি, আমি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে। টের পাই, আমার খুব রক্তক্ষরণ হচ্ছে; উঠে দাঁড়াতে পারছি না। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই আবার জ্ঞান হারাই।’
বলতে বলতে হাউমাউ করে কাঁদে মিনু আরা। কান্না থামলে নিজ থেকেই বলতে থাকে, ‘রাতের অন্ধকারে নৌকা যখন বাংলাদেশের নাফ নদী অতিক্রম করছিল, তখন ফের জ্ঞান ফিরে আমার। বেঁচে থাকাটা অর্থহীন মনে হওয়ায় নৌকা থেকে নদীতে ঝাঁপ দিই। কিন্তু আমার আত্মহত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। নৌকার মাঝি ও আমার আত্মীয়-স্বজনেরা আমাকে বাঁচায়।’
খানিকক্ষণ থেমে নির্যাতিতা মেয়েটি বলে,‘বাংলাদেশে আসার পর কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এক আত্মীয়ের ঝুপড়ি ঘরে আশ্রয় নেই। এর একদিন পর আমার আত্মীয়-স্বজনেরা কিছু টাকা তুলে আমাকে ক্যাম্পের পাশে ইউএনএইচসিআর হাসপাতালে (জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শরণার্থী সংস্থা চালিত হাসপাতাল) ভর্তি করে। সেখানে আমি দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলাম। এখন আমি অনেকটাই সুস্থ।’
মিনু আরা বলে, ‘ওই দিন অন্যান্যের মতো আমাকেও গুলি করে মারতে চেয়েছিল। কিন্তু মারেনি। কেন মারেনি? এর চেয়ে তো মৃত্যুই অনেক ভালো ছিল।’
ধরে আসা গলায় মেয়েটি বলে, ‘আমার বাবা-মা বেঁচে আছে কিনা জানি না। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অনেক খুঁজেছি, পাইনি। বোধহয় তারা (মিয়ানমার সেনাবাহিনী) বাবা-মাকে মেরেই ফেলেছে।’
মিনু আরা বলে, ‘এখন আমি ক্যাম্পে নিরাপদেই আছি। কিন্তু ঘুমাতে পারি না। চোখ বন্ধ করলেই সেই বর্বরতার ঘটনাগুলো ভেসে আসে; ঘুম ছুটে যায়। কষ্টে কুঁকড়ে যাই আমি।’
রোহিঙ্গা মাঝি মোক্তারসহ কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বি-ব্লকের অনেকের ভাষ্য, গতবছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনে তল্লাশির নামে তাণ্ডব চালায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী মগরা। আগুন দিয়ে একের পর এক গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। অনেককেই আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়, অনেককে মারা হয় গুলি করে। ধর্ষণের শিকার হন অগুনতি কিশোরী-তরুণী-নারী। তাদের একজন মিনু আরা। তার মতো আরও শত শত কিশোরী-তরুণী-নারী রয়েছেন টেকনাফ-উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।







