রংপুরের আর কে রোড এলাকায় বিআরটিসি’র (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন) ডিপোতে চলছে বাসের যন্ত্রাংশ লুটপাটের মহোৎসব। প্রকাশ্যে বিভিন্ন বাস থেকে টায়ার, ইঞ্জিনসহ মূল্যবান যন্ত্রাংশ খুলে বিক্রি করা হচ্ছে। অন্যদিকে নগরীর তাজহাট এলাকায় পরিত্যক্ত স্থানে পড়ে আছে অর্ধশতাধিক বাস। বেশির ভাগ বাসের ইঞ্জিন, চেসিসসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে শুধু খোলস দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়া বাসগুলো থেকে প্রতিদিন যে আয় হয় তার অর্ধেকও জমা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রংপুর থেকে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বিআরটিসির অর্ধশতাধিক যাত্রীবাহী বাস লক্কর-ঝক্কর। ফিটনেস, রুট পারমিটসহ কাগজপত্র নেই এসব বাসের। ফলে প্রতিনিয়ত বাসগুলো দুর্ঘটনার মুখে পড়ছে। গত দু’ বছরে বিআরটিসির এই বাসগুলোর দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪৫ জন যাত্রী। তারপরও বিআরটিএ বা প্রশাসন এসব বাস চলাচল বন্ধে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি।
সরেজমিনে নগরীর আর কে রোড এলাকায় বিআরটিসি বাস ডিপোতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রধান ফটকে পাহারাদার দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে যাতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কেউ ভেতরে ঢুকতে না পারে। ভেতরে ঢুকে দেখা গেলো- বিভিন্ন বাসের ইঞ্জিনসহ মূল্যবান যন্ত্রপাতি খোলা হচ্ছে।
এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তার নাম জানতে চাইলে কোনও কর্মচারীই জানাতে রাজি হচ্ছিলেন না। পরে ‘ম্যানেজার অপারেশন’ সাইন বোর্ড দেখে ভেতরে ঢুকে দেখা গেলো- একজন বড় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন। সিসি ক্যামেরায় দৃশ্য দেখছেন টিভির মনিটরে। সাইন বোর্ডে তার নাম লেখা- জামসেদ আলী। তিনি এবং ওই কক্ষে থাকা আরও দু’জন বারবার ছবি তুলতে নিষেধ করেন প্রতিবেদককে। একপর্যায়ে ছবি না তোলার শর্তে কথা বলতে রাজি হন তিনি।
তিনি জানান, রংপুর ডিপোতে একশ’ চারজন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। ডিপোর অধীনে ২৪টি বাস রংপুর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করে। আর ১৮টি বাস প্রধান কার্যালয় থেকে লিজ নিয়ে বেসরকারি মালিকরা চালায়। তিনি স্বীকার করেন, সব বাসের ফিটনেস সার্টিফিকেট ছিল না। সম্প্রতি রংপুর বিআরটিএ অফিস থেকে ফিটনেস করানো হয়েছে। ম্যানেজার জানান, বাসগুলো আসলেই চলাচলের অযোগ্য। কোনটির ব্রেক ভালো নয়, টায়ারের অবস্থা ভালো না, ইঞ্জিনগুলো পুরাতন। তবে নতুন বাস আসছে জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন বাস আসলে এসব সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে। এক প্রশ্নের উত্তরে ডিপোতে বাসের মূল্যবান মালামাল লোপাটের অভিযোগ ঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দু’জন কর্মচারী জানান, বিআরটিসি ডিপোতে চলছে লুটপাটের মহোৎসব। এখানে যে কয়েকটি বাস চলে সেখান থেকে প্রতিদিনের আয়ের অর্ধেকও জমা হয় না। এর বড় অংশ ম্যানেজার অপারেশনসহ কয়েকজন ভাগাভাগি করে নেয়। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন জামশেদ আলী।
এদিকে মেডিক্যাল মোড়ে অবস্থিত বিআরটিসি কাউন্টারের দু’জন কর্মচারী স্বীকার করেন, বিআরটিসি বাসের কোনোটারই ফিটনেট নেই। সবগুলোই লক্কর-ঝক্কর। এ ব্যাপারে কয়েকজন বিআরটিসি বাস যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে আরও ভয়ঙ্কর তথ্য।
পঞ্চগড় যাওয়ার জন্য বাসে উঠেছেন সোলায়মান আলী নামে একজন চাকরিজীবী। তিনি বলেন, ‘একটি কারণে বিআরটিসি বাসে ওঠেন তিনি। সিটগুলো একটু প্রশস্ত, ভালো মতো বসা যায়। এই বাসগুলো ২৫ থেকে ৩০ বছরের পুরোনো। বেশির ভাগ দিন মাঝ রাস্তায় বাস বিকল হলে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।’ একই কথা জানালেন সৈয়দপুরগামী যাত্রী আকলিমা আজিজ। তিনি বলেন, ‘বাসগুলো কোনোভাবেই চলাচলের উপযোগী না। তারপরও বাধ্য হয়ে যাতায়াত করতে হয়।’ বিআরটিসির এক ড্রাইভার নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস চালাই। বাসের ব্রেক ভালো না, টায়ারের অবস্থা খারাপ। ইঞ্জিনের অবস্থা বলা যায় না। তারপরও জীবিকার প্রয়োজনে বাস চালাই।’
এসব বিষয়ে জানতে বিআরটিএ’র (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) রংপুরের সহকারী পরিচালক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, রংপুর থেকে ৬০টিরও বেশি বিআরটিসি বাস চলাচল করে যার একটিরও ফিটনেস নেই। তাদের (বিআরটিসি) কাছে বিপুল পরিমাণ বকেয়া রয়েছে যা বারবার বলার পরও পরিশোধ করছে না। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধে আমরা অভিযান শুরু করেছি।’ তবে এখন পর্যন্ত একটি বিআরটিসি বাসও আটক করার খবর পাওয়া যায়নি।








