পূণ্যতোয়া ব্রহ্মপুত্র এখন সর্বগ্রাসী, ভিটেহারা শত শত পরিবার

আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম
২৭ জুলাই ২০২০, ১৮:১০আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২০, ১৮:২১

ব্রহ্মপুত্র তার রুদ্ররূপে সংহারী মূর্তি ধারণ করেছে। ভেঙে চুরমার করছে নদীতটের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি।

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের মাঝের চরের বাসিন্দা ছিলেন তারা। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ভিটে হারিয়ে একই ইউনিয়নের চর সাতাশ দাগে সদ্য বসতি গড়েছিলেন মশিউর রহমান, সরুত ইসলাম ও বাদশা ফকিরসহ বেশ কয়েকটি পরিবার। কিন্তু, ব্রহ্মপুত্রের বৈরিতা থেকে এখানেও রক্ষা পাননি তারা। নদের ভাঙন পিছু নেওয়ায় আবারও পরিবার ও গবাদি পশু নিয়ে বসতি সরাতে বাধ্য হয়েছেন নতুন চরের নব বাসিন্দারা। শুধু মশিউর কিংবা বাদশা ফকির নন, তাদের মতো জেলার নদ-নদী অববাহিকার হাজারো বাসিন্দার হৃদয় ভাঙা বেদনা দৃশ্যমান না হলেও তাদের ভিটেমাটির ভাঙনের দৃশ্য এখন নিয়মিত হয়ে পড়েছে। বান আর ভাঙনে দুর্বিসহ হয়ে পড়েছে এসব প্রান্তিক মানুষের জীবন।

একটি নদের রুদ্ররূপ কতটা ভীষণ ও ভয়ঙ্কর হতে পারে তার সর্বগ্রাসী চেহারা নিয়ে হাজির এখন বৃহত্তম নদ ব্রহ্মপুত্র, সর্বস্বান্ত করছে অববাহিকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষদের। বানের পানি উগড়ে দিয়ে কয়েক লাখ মানুষকে পানিবন্দি করার পাশাপাশি তীব্র ভাঙনে গ্রাস করছে শত শত বসত ভিটা। পূণ্যতোয়া ব্রহ্মপুত্র এখন অববাহিকার বাসিন্দাদের জন্য সর্বনাশের অপর নাম। অথৈ পানি আর ভাঙনে দিশেহারা বানভাসি লাখো মানুষ। গত কয়েক সপ্তাহে ব্রহ্মপুত্রের স্রোতে আর ভাঙনে বিলীন হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উপসনালয়সহ কয়েকশ’ বাড়িঘর।

ব্রহ্মপুত্রের যে রুদ্ররূপ তাতে পাড়ের এই বাড়িটি টিকবে কিনা কেউ জানে না।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী চলমান বন্যায় নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে অন্তত ৫শ’ পরিবার। এতে প্রায় ২ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। তবে ভাঙন কবলিত এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাস্তবতা আরও ভয়াবহ।

সদর উপজেলার হলোখানা ও পাঁচগাছী ইউনিয়নের ধরলা অববাহিকা, যাত্রাপুরে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা, উলিপুর, রৌমারী ও চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার কয়েকটি ইউনিয়নের শত শত পরিবার ভাঙনে সর্বস্বান্ত হয়ে ছিন্নমূল জীবন যাপন করছে। এছাড়াও নাগেশ্বরীতে দুধকুমার আর রাজারহাট ও উলিপুরের পশ্চিম ভাগে তিস্তার গ্রাসে ভিটে হারা হয়েছে কয়েকশ’ পরিবার।

চিলমারীর নয়ারহাট ইউনিয়নের  দক্ষিণ খাউরিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভাঙনে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়। ওই ইউনিয়নের খেদাইমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাঙন হুমকিতে রয়েছে।

ওই ইউনিয়নের বাসিন্দা তৌহিদ আহমেদ বলেন, ‘আমার প্রাণের বিদ্যাপীঠ দক্ষিণ খাউরিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে বিলীন হচ্ছে। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার নেই। অথচ কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে ভাঙন থেকে চরের বাতিঘর এই বিদ্যালয়টিকে রক্ষা করা যেতো।’

ব্রহ্মপুত্র পাড়ে এখন বন্যার পানি নেমে গেছে তবে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।

ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু হানিফা জানান, চলতি মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র দানবীয় রূপ নিয়েছে। একদিকে বানের পানি অপর দিকে ভাঙন। কোনও কিছুই মানছে না এ নদ।  ইউনিয়নের উত্তর খাউরিয়া এলাকায় শতাধিক বাড়ি এবং  খেরুয়া ও দুইশ’ বিঘা এলাকায় দেড় শতাধিক পরিবারের বাড়িঘর ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিলীন হয়েছে। ভিটেহারা এই পরিবারগুলোকে সামান্য খাদ্য সহায়তা ছাড়া তাদের পুনর্বাসনে কোনও সহায়তা করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের কবলে রয়েছে জেলার সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চর গোয়াইলপুরি, চর যাত্রাপুর, পোড়ার চর গ্রাম। ব্রহ্মপুত্রের দু’দফা ভাঙনে এসব গ্রামের শতাধিক পরিবার ভিটেহারা হয়ে উদ্বাস্তু জীবন যাপন করছে।

যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার জানান, বন্যা আর নদী ভাঙনে মানুষ দিশাহারা। খাদ্য আর আবাসন সংকটে চরাঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। প্রথম দফা ভাঙনের শিকার ৭৭ পরিবারের তালিকা করে উপজেলা প্রশাসনে পাঠানো হয়েছে কিন্তু এখনও কোনও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। দুই একদিনের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় ভাঙনের শিকার শতাধিক পরিবারের তালিকা করে কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

ব্রহ্মপুত্র সব ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ জানে না এরপর কী হবে।

তবে ভাঙনে ভিটেহারা পরিবারগুলোর জন্য এই মুহূর্তে কোনও সুখবর নেই। ছিন্নমূল অবস্থায় অনেক পরিবার জীবন নির্বাহ করলেও পরিসংখ্যান পাওয়ার আগ পর্যন্ত আপাতত খাদ্য সহায়তা ছাড়া তাদের পুনর্বাসনের কোনও বরাদ্দ নেই বলে জানিয়েছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল হাই সরকার।

তিনি বলেন,‘ আমাদের কাছে টিন থাকলেও ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর বিস্তারিত পরিসংখ্যান না পাওয়ায় এই মুহূর্তে সেগুলো বিতরণ সম্ভব হচ্ছে না। তবে বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাদেরকে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় পুর্নবাসিত করা হবে।’

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘আপাতত বানভাসি ও ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান হাতে পেলে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

/টিএন/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ঈদুল আজহা: ১৩ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৮১
ঈদুল আজহা: ১৩ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৮১
এবছরই সব স্কুলে ফিডিং চালুর পরিকল্পনা, পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা: শিক্ষামন্ত্রী
এবছরই সব স্কুলে ফিডিং চালুর পরিকল্পনা, পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা: শিক্ষামন্ত্রী
দুই দল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে ৬২ জন আহত
দুই দল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে ৬২ জন আহত
বাংলাদেশ সফরের ব্যাখ্যা দিলো আইসিসি
বাংলাদেশ সফরের ব্যাখ্যা দিলো আইসিসি
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান