কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নে মধ্যরাতে বৃষ্টির মধ্যে বাড়িতে ঢুকে বাবা-মাকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনা নেহায়েত লুটের উদ্দেশ্যে নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত বলে মনে করছে ওই পরিবারটি। বিভ্রান্ত করার জন্য অভিযুক্তরা বাড়িতে টাকা ও অলঙ্কার লুট করেছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার। প্রাথমিক তদন্তে এমন অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছে পুলিশ। ভুক্তভোগী পরিবার ও জেলা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। ঘটনা তদন্তে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা মাঠে কাজ করছে।
রবিবার (২৬ জুলাই) দিবাগত মধ্যরাতে বৃষ্টির মধ্যে বাড়িতে ঢুকে বাবা-মা ও ছোটবোনকে বেধড়ক পিটিয়ে জখম করে এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে বাড়ির পাশে একটি বাগানে ধর্ষণ করে অজ্ঞাত এক যুবক। এ সময় বাড়িতে লুটপাট ও কিশোরীকে ধর্ষণে তাকে সহায়তা করে আরও দুই যুবক। গুরুতর অবস্থায় কিশোরী ও তার বাবাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন এলাকাবাসী। বর্তমানে তারা উভয়েই কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা জানান, মধ্যরাতে বৃষ্টি থাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। অন্ধকারে তিন যুবক বাড়িতে প্রবেশ করে লোহার তার কাটার একটি যন্ত্র দিয়ে তাকে বেদম মারপিট করে। এ সময় তার মাথা ফেটে যায় এবং বুকে ও পায়ে জখম হয়। তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এরপর ওই যুবকরা তার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে পিটিয়ে ঘরে থাকা টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে এবং তার মেজো মেয়েকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। তারা পাশের একটি বাগানের তারকাঁটার বেড়া কেটে সেখানে তার মেয়েকে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন করে। এ ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার চান তিনি।
আঘাতে কাতর হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভুক্তভোগী এই বাবা বলেন, ‘এই ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত। আমার বাড়ির পাশের জমির মালিক এক প্রকৌশলী। তিনি আমাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করে আসছেন। এছাড়াও আমার ফোনে বিভিন্ন সময় অপরিচিত নম্বর থেকে মেয়েদের উদ্দেশ্য করে অশালীন ভাষায় ম্যাসেজ আসতো। আমার ধারণা, এই দুই পক্ষের কেউ এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। তবে ওই তিন যুবকের সহযোগিতায় আশপাশে একাধিক ব্যক্তি ছিল।’
ভুক্তভোগী কিশোরী জানায়, তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে পাশের বাগানে পাশবিক নির্যাতন করে এক যুবক। এ সময় তাকে দুই দিক থেকে দুই যুবক হাত ধরে রাখে। নির্যাতন শেষে একপর্যায়ে এক যুবক তার হাত ধরে রাখে। এ সময় সে যুবকের হাতে সজোরে কামড় দিয়ে নিজেকে ছুটিয়ে নেয় এবং বাগানের পাশের ছোট একটি ডোবায় লাফ দিয়ে সাঁতরে পার হয়ে ডোবার অপর প্রান্তের এক বাড়িতে আশ্রয় নেয়।
কিশোরী বলে, ‘নির্যাতনের পর আমার শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল, আমার দুই পা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। পরে আমি পালিয়ে একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ওই বাড়ির লোকদের ডেকে তুলি। তখন ওই বাড়ির লোকজন স্থানীয়দের ফোন করে ডেকে আমাকে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেন।’ এ ঘটনায় সম্পৃক্তদের গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে ভুক্তভোগী এই কিশোরী।
ঘটনা তদন্তে পুলিশসহ একাধিক সংস্থা কাজ করছে জানিয়ে পুলিশ সুপার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাটি তদন্ত শুরু করেছি। আমি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং হাসপাতালে গিয়ে ভুক্তভোগী কিশোরী ও তার বাবার সঙ্গে কথা বলেছি। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত। তারা সব প্রস্তুতি নিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। অপরাধীদের পার পাওয়ার কোনও সুযোগ নেই।’
ঘটনা তদন্তে সহায়তার জন্য একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে বলেও জানান পুলিশ সুপার।
এদিকে অভিভাবকদের ওপর হামলা এবং কিশোরী ধর্ষণের প্রতিবাদে সম্পৃক্তদের গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে এলাকাবাসী ও জেলা ছাত্রলীগ পরিবার। মঙ্গলবার সকালে ছিনাই ইউনিয়নের কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়কে এলাকাবাসী এবং কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে ছাত্রলীগ পরিবারের ব্যানারে পৃথক দুটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
আরও খবর: বাবা-মাকে পিটিয়ে বেঁধে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ








