কুড়িগ্রামে একটি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের সনদ জালের অভিযোগে দুই শিক্ষকের বেতন-ভাতা সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। কিন্তু বিদ্যালয়ের সভাপতি ও তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীন প্রধান শিক্ষককে নির্দেশ দেন অভিযুক্ত দুই শিক্ষকের বেতন ছাড় করতে। আইনগত ঝামেলার বিষয়টি সামনে এনে প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম এই নির্দেশনা মানতে অপারগতা প্রকাশ করে জেলা প্রশাসককে কারণ ব্যাখ্যা করে চিঠি দিলে এতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন তিনি (জেলা প্রশাসক)। অভিযোগ রয়েছে, এরপর পদাধিকার বলে বিদ্যালয় কমিটির সভাপতি হিসেবে তিনি প্রধান শিক্ষককের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন। তার সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে মো. নজরুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন। তবে এই সুপারিশে যেসব বিষয়কে সামনে আনা হয় পরবর্তীতে হাইকোর্টে তা বাতিল হয়েছে এবং আদালত জেলা প্রশাসকের এই আদেশ বাতিল করে প্রধান শিক্ষককে পুনর্বহাল করে বেতন চালুর নির্দেশ দিয়েছে। সেসময় উচ্চ আদালত থেকে জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারিও হয়। এরপরও তাকে পুনর্বহাল না করে তার বিরুদ্ধে দুই বছর পর বিভাগীয় মামলা দায়ের করেছে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। ভুল আইনে পাঠানো এই আদেশটিও জেলা জজ কোর্ট স্থগিত করে দেয়। ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক শেখ নজরুল ইসলামের অভিযোগ, এখনও তিনি তার দায়িত্ব ফিরে পাননি। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি বেতন-ভাতা বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এরমধ্যে জেলা প্রশাসক বদল হলেও তার সমস্যার সমাধান হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের দুই সহকারী শিক্ষক ইলমুন নাহার ও বকুল হোসেনের নামে সনদ জালের অভিযোগ থাকায় ২০১৫ সালে ওই শিক্ষকদের বেতন ভাতা সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। কয়েক দফা প্রশাসনিক তদন্তে সনদ জালের অভিযোগের সত্যতাও মেলে। সনদ জালের অভিযোগ ও অভিযুক্ত শিক্ষকদের বেতন বন্ধে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও বিদ্যালয়ের সভাপতি মোছা. সুলতানা পারভীন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ মো. নজরুল ইসলামকে অভিযুক্ত শিক্ষকদ্বয়ের বেতন ছাড়ের নির্দেশ দেন। তবে এই নির্দেশনামূলক চিঠির লিখিত জবাবে শিক্ষকদ্বয়ের বিরুদ্ধে সনদ জালিয়াতির অভিযোগ থাকার কথা উল্লেখ করে বেতন ছাড় দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন প্রধান শিক্ষক। এতে সংক্ষুব্ধ হয়ে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনকে পত্র দেন ডিসি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ২৪ জুলাই প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশন ও জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করলে ২০১৮ সালের ৯ ডিসেম্বর হাইকোর্ট প্রধান শিক্ষককে পুনর্বহাল করে বেতন চালুর নির্দেশ দেন। কিন্তু তৎকালীন ডিসি সুলতানা পারভীন হাইকোর্টের নির্দেশও তোয়াক্কা না করে ওই শিক্ষককে পুনর্বহাল থেকে বিরত থাকেন। এমনকি তার খোরপোশ ভাতার সঙ্গে বরখাস্ত হওয়ার আগের ১০ মাসের বেতনও বন্ধ রাখেন ডিসি সুলতানা ।
এদিকে, হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করায় প্রায় এক বছর পর ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর হাইকোর্ট ডিসি সুলতানার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করে। এর মধ্যেই সাংবাদিক নিপীড়নের দায়ে ডিসি সুলতানা পারভীনকে কুড়িগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এরপর ডিসি বদল হলেও এখন চাকরিতে বহাল হতে পারেননি প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম। বরং এই ডামাডোলের মধ্যেই চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর বরখাস্ত করার দুই বছর পর ওই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন।
যোগাযোগ করা হলে প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম বলেন,‘‘ আমি ডিসি সুলতানা পারভীনের আক্রোশের শিকার। আমাকে বেআইনিভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। আমি সরকারি কর্মচারী না হলেও আমাকে ২০১৮ সালে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫’ অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে মহামান্য হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়ে আমাকে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দিলেও ডিসি সুলতানা পারভীন আমাকে চাকরিতে পুনর্বহাল না করে আমার বেতন-ভাতা বন্ধ রাখেন। আমার বেতন ও খোরপোশ বন্ধ রাখা হয়। এখন উল্টো সাময়িক বরখাস্ত করার দুই বছর পর আমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেটাও ২০১৯ সালে তৈরি নীতিমালায়!’
তার প্রশ্ন, ‘জাল সনদধারী দুই শিক্ষকের বেতন ছাড় না করায় ২০১৮ সালে আমাকে বেআইনিভাবে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করান ডিসি সুলতানা পারভীন। ২০১৮ সালে বরখাস্তের পর ২০১৯ সালে তৈরি নীতিমালায় বিভাগীয় মামলা হয় কীভাবে? এরপরও আমি বিভাগীয় মামলার জবাব দেওয়ার পাশাপাশি আইনি লড়াইও চালিয়ে যাবো। আমি অন্যায়ের কাছে নত হবো না।’
এ বিষয়ে সাবেক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু জানান, ‘‘প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলামকে দুই বছর আগে যে আইনে ‘[সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫]’ সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে সে আইন তার জন্য প্রযোজ্য ছিল না। কারণ, তিনি কোনোভাবেই সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর পর্যায়ে পড়েন না। সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে অপরাধ সংঘটনের সময় যে আইন ছিল সে আইনে বিচার হওয়া উচিত কিন্তু যে আইনে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে সে আইন যেহেতু তার জন্য প্রযোজ্য নয় এবং সে সময় প্রতিবন্ধী স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে অন্য কোনও আইনে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার আদেশ দেওয়া হয়নি, তাই দুই বছর পর ২০১৯ সালে ঘোষিত আইন (প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা, ২০১৯ এর ২৩ ও ২৪ নং অনুচ্ছেদ) দিয়ে তার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা সম্পূর্ণভাবে অসাংবিধানিক ও বেআইনি।’
বর্তমানে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াছমিনের সঙ্গে কিছুদিন আগে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘সাময়িক বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক শেখ নজরুল ইসলামের পুনর্বহাল নিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বিষয়ে আমার জানা নেই। আমি দীর্ঘদিন ছুটিতে (মাতৃত্বকালীন ছুটি) থাকায় ফাইল না দেখে কিছু বলতে পারছি না। তবে তার খোরপোশ ভাতা প্রদান সংক্রান্ত সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা সম্বলিত চিঠি পেয়েছি। সে মোতাবেক প্রতিবেদন পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।’
এদিকে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের শিক্ষা ও কল্যাণ শাখা হতে সাময়িক বরখাস্ত প্রধান শিক্ষককে বেতন ভাতা প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও পত্র ইস্যুর ৫ মাস পরও বকেয়া বেতন ভাতা পাননি ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক।
এ বিষয়ে অগ্রগতি জানতে ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে গেলে ইউএনও তাকে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থাকাকালে সেখানকার সব কিছুর ভালোমন্দ দেখার চেষ্টা করেছি। তবে এটা প্রায় এক বছর আগের বিষয়, স্মৃতি থেকে অনুমানভিত্তিক কোনও মন্তব্য করা ঠিক হবে না। এটা অফিসিয়াল বিষয়। অফিসে এ সংক্রান্ত কাগজপত্র আছে। সেখানে খোঁজ নিলেই সব জানা যাবে।
কুড়িগ্রামের বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিমের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই শিক্ষক হাইকোর্ট থেকে যে রায় পেয়েছেন সে বিষয়ে তিনি অবহিত। ওই রায়সহ পুরো বিষয়টিই সিদ্ধান্তের জন্য সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অন্তর্গত জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে পাঠানো হয়েছে। এখন সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।






