বসতভিটা বেচে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন বিদেশ, ফিরছে মরদেহ

আসাদুজ্জামান সরদার, সাতক্ষীরা
১৪ মে ২০২৬, ১১:১৮ আপডেট : ১৪ মে ২০২৬, ১১:২৪

সুরঞ্জন দাসের এখন আর কোনও জমি নেই। তিন বছর আগে সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভার শ্রীপতিপুর গ্রামে একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই এক শতক বসতভিটাটুকুও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। নিয়েছিলেন চড়া সুদে ঋণ। লক্ষ্য ছিল একটাই, মেজ ছেলে শুভ দাসকে (২৫) লেবাননে পাঠিয়ে সংসারের অভাব ঘোচানো। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন শেষ হয়ে গেছে। সোমবার রাতে লেবাননের মাইফাদুন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন শুভ।

বুধবার বিকালে শ্রীপতিপুর গ্রামে সুরঞ্জনের ভাড়া বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। জরাজীর্ণ ঘরের বারান্দায় বসে ডুকরে কাঁদছেন মা শিখা দাস। একটি ভ্যানের ওপর বসে নির্বাক হয়ে বসে আছেন বৃদ্ধ বাবা সুরঞ্জন। তার পাশে বসে সান্ত্বনা দিচ্ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি শাহাদাত হোসেনসহ কয়েকজন প্রতিবেশী। প্রতিবেশী ও স্বজনদের ভিড়ে বাড়িটি শোকাতুর হয়ে উঠেছে। সবার চোখেমুখে একটাই আকুতি– ছেলের মুখটা শেষবারের মতো দেখা।

পেশায় ভ্যানচালক সুরঞ্জন দাস জানান, বাড়ি বিক্রি করেও শেষ রক্ষা হয়নি। চড়া সুদে এনজিও এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে আরও চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুভকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। ভিটে হারিয়ে গত তিন বছর ধরে স্বপরিবারে এক হাজার টাকা ভাড়ার একটি বাসায় থাকছেন তিনি। প্রতি মাসে শুভ ৩৫ হাজার টাকা করে পাঠাতেন। সেই টাকা দিয়েই ঋণের কিস্তি শোধ আর ছোট দুই ভাই-বোনের পড়াশোনা চলছিল।

বিলাপ করতে করতে মা শিখা রানী দাস বলেন, ‘সংসারের হাল ফেরাতে ছেলেটা বিয়েও করেনি। বলেছিল, আরও কিছুদিন থেকে টাকা জমিয়ে বাড়ি ফিরে ঘর বাঁধবে। ভগবান কেন আমাদের কপাল পুড়িয়ে দিলো? এখন ঋণের টাকা কে শোধ করবে, আর আমার মানিককেই বা কই পাবো?’

শুভর ছোট বোন সাধনা দাস কলারোয়া সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে। কান্নারত কণ্ঠে সে বলে, ‘রবিবার রাতে দাদার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। দুই মাস টাকা পাঠাতে পারেনি বলে দাদা খুব আফসোস করছিল। দাদাই আমাদের পড়াশোনার খরচ চালাতো। দাদাকে তো আর ফিরে পাবো না, কিন্তু এখন আমরা থাকবো কোথায়? আমাদের পড়াশোনাই বা হবে কীভাবে?’

প্রতিবেশী সুমন দাস বলেন, ‘শুভ খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। এলাকার সবার সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। তার এই অকাল মৃত্যু পুরো গ্রামকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।’

শুভসহ দুই দিনের মধ্যে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় সাতক্ষীরার মোট তিন জন প্রবাসী নিহত হয়েছেন। তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এখন পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

স্থানীয় ইউপি মেম্বর শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘সুরঞ্জন দাসের এখন আর কোনও নিজের জমি নেই। তিনি এখন পরিবার নিয়ে থাকেন ধানের চাতালের ফেলে রাখা খুপড়ি ঘরে। তিন বছর আগে সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভার শ্রীপতিপুর গ্রামে তার একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই এক শতক বসতভিটাটুকুও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। চড়া সুদে এনজিও ও স্থানীয়দের কাছ থেকে আরও চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুভকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। সেই শুভ ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় মারা যাওয়ার খবরে গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দ্রুত শুভর মরদেহ যেন দেশে আনা হয়, আমরা সরকারের কাছে সেই দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে এই অসহায় পরিবারটি যেন মাথা গোজার ঠাঁই পায় সে ব্যাপারেও সরকার যেন সহায়তা করে।’

কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। শুভর পরিবার যাতে দ্রুত মরদেহ ফিরে পায়, সে জন্য আমরা কনস্যুলেট ও সংশ্লিষ্ট দফতরে যোগাযোগ করছি। একই সঙ্গে সরকারিভাবে সব ধরনের আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল জানিয়েছেন, প্রবাসীদের মরদেহ ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

অভাবের তাড়নায় যে ছেলেকে ভিনদেশে পাঠিয়েছিলেন সুরঞ্জন দাস, এখন সেই ছেলের নিথর দেহটুকু ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় কাটছে তার প্রতিটি প্রহর। ঋণের বোঝা আর শোক– দুইয়ের ভারে ন্যুব্জ এই পরিবারটির ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

/এমএএ/
সম্পর্কিত
মাছ চুরির সন্দেহে ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা
হাসপাতালে যুবককে পিটিয়ে হত্যা মামলায় গ্রেফতার ২, এখনও ফেসবুকে সক্রিয় প্রধান আসামি
মাদকের টাকা না পেয়ে মায়ের ওপর হামলা, ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ গেলো কাকির
সর্বশেষ খবর
ইতিহাস গড়ে যোগ দেওয়ার ৬ দিনের মাথায় চাকরি হারালেন ট্রাম্পের প্রেস সচিব
ইতিহাস গড়ে যোগ দেওয়ার ৬ দিনের মাথায় চাকরি হারালেন ট্রাম্পের প্রেস সচিব
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর প্রাইভেটকারের ধাক্কায় রিকশাচালক নিহত, আহত ২
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর প্রাইভেটকারের ধাক্কায় রিকশাচালক নিহত, আহত ২
আমাদের দলের প্রার্থী পাস না করলে সেই ইউনিয়নে কোনও কাজ হবে না: চিফ হুইপ
আমাদের দলের প্রার্থী পাস না করলে সেই ইউনিয়নে কোনও কাজ হবে না: চিফ হুইপ
মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগে ছাত্রদলের দুই নেতাসহ গ্রেফতার ৪
মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগে ছাত্রদলের দুই নেতাসহ গ্রেফতার ৪
সর্বাধিক পঠিত
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রথম দিনেই সাজেক ভ্রমণে ৫ শতাধিক পর্যটক
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রথম দিনেই সাজেক ভ্রমণে ৫ শতাধিক পর্যটক
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক 
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক