সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি এলাকার ত্রিপুরা পাড়ার বাসিন্দারা অবশেষে স্থানীয় প্রশাসনের নজরে এসেছেন। অজানা রোগে ৯ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় শুক্রবার (১৪ জুলাই) এখানকার ৬৫টি পরিবারকে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, শুক্রবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া ত্রিপুরা পাড়ার ৬৫টি পরিবারের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করেন। তিনি প্রতিটি পরিবারের হাতে ১০ কেজি করে চাল, ১ কেজি তেল, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি লবণ, ২ কেজি আলু ও এক ডজন ডিম তুলে দেন।
এর আগে স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে অর্থকষ্ট এবং খাদ্য সংকটে ভুগলেও তেমন কেউই খবর নেয়নি তাদের। ত্রিপুরা পাড়ার বাসিন্দা শশী কুমার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খাদ্যের জন্য আমাদের জুম চাষের ওপর নির্ভর করে থাকতে হয়। এ কারণে প্রায়ই আমরা খাদ্য সংকটে পড়ি। আমার ৩৫ বছর বয়সে কখনও প্রশাসনের কোনও সহযোগিতা চোখে পড়েনি। আজই (শুক্রবার) প্রথম প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাদ্যদ্রব্য সহায়তা পেলাম।’
সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের গহীন পাহাড়ে অবস্থি এই ত্রিপুরা পাড়া। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, চিকিৎসা, পানি ও স্যানিটেশনের ছোঁয়া যেন এখানকার মানুষজনের কাছে অধরা। নেই বিদ্যুৎ সংযোগও। যুগের পর যুগ এত সংকটের মধ্যেই দিন কাটছে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ৬৫টি পরিবারের তিন শতাধিক মানুষের।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী নিজেও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। বৃহস্পতিবার (১৩ জুলাই) ত্রিপুরা পাড়া পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সীতাকুণ্ডের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলে এই পাড়ার অবস্থান হওয়ায় প্রশাসনের লোকজন এখানে আসতে পারেনি। এ কারণে দীর্ঘদিন পাড়াটি সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল।’
বৃহস্পতিবার (১৩ জুলাই) ত্রিপুরা পাড়া পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক। ওইদিন তিনি অজানা রোগে আক্রান্ত নয় শিশুর প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা ও ১০ কেজি করে চাল সহায়তা দেন।
ত্রিপুরা পাড়ায় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের আরও আগে এগিয়ে আসা দরকার ছিল বলে মনে করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক। অবশ্য অবহেলিত থাকার জন্য স্থানীয়দেরও দুষেছেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘তারা প্রশাসনকে নিজেদের অসুবিধার কথা জানালে আরও আগেই হয়তো অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো।’
এ সময় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ত্রিপুরা পাড়ার বাসিন্দাদের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে শিগগিরই ১০টি নলকূপ স্থাপনের আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, ‘এখানকার বাসিন্দারা সুপেয় পানি সংগ্রহের জন্য প্রাকৃতিক ছড়ার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ছড়ার পানি অনিরাপদ। তাই আমরা এখানে ১০টি নলকূপ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শিগগিরই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।’
জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি, কাশি, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে এক অজ্ঞাত রোগে তিন দিনে ত্রিপুরা পাড়ায় নয় শিশুর মৃত্যু হয়। নিহত শিশুদের প্রত্যেকের বয়স ছিল শূন্য থেকে ১০ বছরের মধ্যে। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজে (বিআইটিআইডি) ৪৩ জন শিশু এবং আরও ২২ জনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে শুক্রবার ভর্তি হয়েছে ১২ জন।
গত দুই সপ্তাহ ধরে ত্রিপুরা পাড়ার শিশুরা এ অজ্ঞাত রোগে ভুগলে বিষয়টি গত ১২ জুলাই দুপুরে প্রশাসনের নজরে আসে। আক্রান্ত একটি শিশুকে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিষয়টি সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকীকে জানান। পরে সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি প্রতিনিধি দল ওইদিন ঘটনাস্থলে গিয়ে আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুরা এখন আশঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
/জেএইচ/








