বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ (১০ ডিসেম্বর)। বিজয়ের মাত্র ৬ দিন আগে ১৯৭১ এর এই দিনে খুলনার রূপসা নদীতে রণতরী পলাশে যুদ্ধরত অবস্থায় পাক বাহিনীর জঙ্গি বিমান থেকে বর্ষিত গোলার আঘাতে শহীদ হন বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন।
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ১৯৩৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বাঘপাঁচড়া (বর্তমান রুহুল আমিন নগর) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মোহাম্মদ আজহার পাটোয়ারি ছিলেন মোটামুটি স্বচ্ছল গৃহস্থ এবং মা জোলেখা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তিনি বাঘপাঁচড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে আমিষাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এখান থেকে এসএসসি পাশ করে ১৯৫৩ সালে জুনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে পাকিস্তান নৌ-বাহিনীতে যোগ দেন। পরে ১৯৬৫ সালে ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে তিনি পিএনএস বখতিয়ার নৌ-ঘাঁটি,চট্টগ্রামে বদলি হন।
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন যেভাবে যুদ্ধে অংশ নেন ও শহীদ হন: ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরুর হলে তিনি এপ্রিল মাসে পিএনএস বখতিয়ার নৌ-ঘাঁটি থেকে পালিয়ে যান। বাড়িতে গিয়ে ছাত্র, যুবক ও সামরিক আধাসামরিক বাহিনীর লোকদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। এর কিছুদিন পর তিনি ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলা সেক্টর প্রধান কোয়ার্টারে চলে যান। সেখানে গিয়ে মেজর শফিউল্লাহর অধীনে ২ নম্বর সেক্টরে যোগদান করেন। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে থেকে বিভিন্ন স্থলযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে নৌ-বাহিনীর সদস্য যারা বিভিন্ন সেক্টর ও সাব-সেক্টরে থেকে যুদ্ধ করছিলেন তাদের আগরতলায় এনে একত্রিত করা হয়। পরে তাদের নিয়ে ১০ নং সেক্টর গঠন করা হয়। এসময় তিনিও অন্য সদস্যদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে কলকাতায় আসেন এবং ১০ নং নৌ সেক্টরে যোগ দেন। ১০ নং সেক্টরের সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নেন ভারতীয় নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন মণীন্দ্রনাথ সামন্ত। পরে ভারত সরকার বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীকে দুইটি গানবোট উপহার দেয়। গানবোট দুটির নামকরণ করা হয় 'পদ্মা' ও 'পলাশ'। রুহুল আমিন নিয়োগ পান 'পলাশের' ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার হিসেবে।
৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে যশোর সেনানিবাসের পতন ঘটলে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে থাকে। সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর কাছ থেকে খুলনার নৌঘাট দখলের পরিকল্পনা নিয়ে ভারতীয় গানবোট পানভেলের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘পলাশ’ ও ‘পদ্মা’। ১০ ডিসেম্বর গানবোটগুলো মংলা বন্দরে পৌঁছায়। সেখানে পাকিস্তানি সেনা ও নৌ-বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর 'পলাশ' ও 'পদ্মা' মংলা বন্দর হয়ে খুলনার দিকে রওয়ানা দেয়। গানবোট 'পানভেল' সামনে আর পেছনে 'পলাশ'ও 'পদ্মা'। দুপুর ১২টার দিকে গানবোটগুলো খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে পৌঁছালে আকাশে তিনটি জঙ্গি বিমান উড়তে দেখেন তারা। শত্রু বিমান মনে করে ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’ থেকে গুলি করার অনুমতি চাওয়া হয়। কিন্তু অভিযানের সর্বাধিনায়ক ক্যাপ্টেন মনিন্দ্রনাথ ভারতীয় বিমান মনে করে গুলি না করার নির্দেশ দেন। এর কিছুক্ষণ পর বিমানগুলো নিচে নেমে আসে এবং আচমকা গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রথম গোলা এসে পড়ে পদ্মায়। গোলা সরাসরি পদ্মার ইঞ্জিন রুমে আঘাত করায় ইঞ্জিন বিধ্বস্ত হয়ে যায়। হতাহত হয় অনেক নাবিক। 'পদ্মা'-র পরিণতিতে পলাশের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার রায় চৌধুরী নাবিকদের জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ দেন। রুহুল আমিন এই আদেশে ক্ষিপ্ত হন। তিনি উপস্থিত সবাইকে যুদ্ধ বন্ধ না করার আহ্বান জানান। কামানের ক্রুদের বিমান তিনটি লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে বলে তিনি ইঞ্জিন রুমে ফিরে আসেন। কিন্তু অধিনায়কের আদেশ অমান্য করে কেউ গুলি ছুড়েনি। বিমানগুলো উপর্যুপরি বোমাবর্ষণ করে পলাশের ইঞ্জিনরুমও ধ্বংস করে দেয়। এতে তিনি আহত হন। তারপরও পলাশকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান অসীম সাহসী রুহুল আমিন। এসময় ইঞ্জিন বিকল হয়ে আগুন ধরে যায়। অন্যদিকে গোলার আঘাতে রুহুল আমিনের ডান হাতটি সম্পূর্ণ উড়ে যায়। অবশেষে পলাশের ধ্বংসাবশেষ পিছনে ফেলে আহত রুহুল আমিন ঝাঁপিয়ে পড়েন রূপসা নদীতে। প্রাণশক্তিতে ভরপুর এ যোদ্ধা একসময় পাড়ে এসে পৌঁছান। কিন্তু ততক্ষণে সেখানে অবস্থান করা রাজাকাররা আহত এ মুক্তিযোদ্ধাকে রূপসার পাড়েই বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। তার বিকৃত মৃতদেহ বেশ কিছুদিন সেখানে পড়ে ছিল অযত্নে অবহেলায়। পরে স্থানীয় জনসাধারণ তাকে খুলনার বাগমারা গ্রামে রূপসা নদীর পাড়ে দাফন করে।
স্মৃতিস্তম্ভ: বর্তমানে সেখান একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। তার স্মৃতি রক্ষায় ২০০৮ সালের ১৩ মার্চ স্থাপন করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। এই স্মৃতি কমপ্লেক্সে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বিভিন্ন আলোকচিত্র, পোস্টার, সাময়িকী আর পত্র-পত্রিকা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধসহ নানা বিষয়ের বই এবং বিভিন্ন সময় রুহুল আমিনের পরিবারকে দেওয়া সরকারি বেসরকারি পদক রয়েছে এই স্মৃতি কমপ্লেক্সে।
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরের তত্ত্বাবধায় মো. আলাউদ্দিন জানান, প্রায় সাড়ে ৩ হাজার বই রয়েছে এ গ্রন্থাগারে। তবে, কমপ্লেক্সটির নাম ‘স্মৃতি জাদুঘর’ হলেও বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো.রুহুল আমিনের ব্যবহার্য কোনও কিছুই এখানে নেই। তাই দর্শনাথীরা এখানে এসে হতাশ হন।
পরিবারের দাবি: বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রহুল আমিনের ছেলের স্ত্রী রাবেয়া আক্তার জানান, তাদের থাকার জন্য নৌ-বাহিনী থেকে দেশের বাড়িতে একটি একতলা দালান নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছিল। যা বর্তমানে জরাজীর্ণ হয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তিনি এটি সংস্কারের দাবি জানান।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য:নোয়াখালী-১ (চাটখিল - সোনাইমুড়ি) আসনের এমপি এইচ এম ইব্রাহিম বলেন,‘বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন জাতির গর্ব। বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সমৃদ্ধ বই সরবরাহ ও তার একটি ভাস্কর্যও স্থাপন করা হবে। তার নামে একটি স্টেডিয়ামও নির্মাণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সাত জন বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে একজন আমাদের এলাকার। এতে আমরা গর্ববোধ করি। বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিন এর নামে একটি স্মৃতিফলক করা হবে।
দিনটি পালন: নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে দিনটি পালনের উদ্যোগ নিয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিন গ্রন্থগার ও স্মৃতি যাদুঘর। এ উপলক্ষে আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল এবং দুঃস্থদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হবে।
আরও পড়ুন: ময়মনসিংহ মুক্ত দিবসে বিজয় র্যালি








