১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তি অনুযায়ী পাহাড়ি শিশুদের নিজস্ব ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালুর কথা ছিল। চুক্তির ২০ বছর পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণির বই পেয়েছে। এ বছরও বই পেয়েছে শিক্ষার্থীরা। তবে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে স্কুলগুলোয় তা পড়ানো হচ্ছে না। শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকলে মাতৃভাষায় পাঠ দানের লক্ষ্য ব্যাহত হবে।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রছাত্রীদের ঝরে পড়ার হার কমাতে, শিক্ষায় উৎসাহ বাড়াতে এবং নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি রক্ষা করতে নিজ নিজ ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে অনেক দিন থেকেই দাবি জানিয়ে আসছিল পাহাড়ি নেতারা। বিষয়টি ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তির ৩৩ ধারায় এবং খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন-১৯৮৯ এর তৃতীয় তফসিলে স্থান পায়। চুক্তির শর্তানুযায়ী, খাগড়াছড়ি জেলার ৭০৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার, পাহাড়ি নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা একাধিক বৈঠক করে তৈরি করেন নীতিমালা। নির্ধারণ করা হয় চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষার বর্ণমালা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চলতি বছর প্রকাশিত হয়েছে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের বই এবং জেলায় ৪২ হাজার ৮৮৪ জন শিক্ষার্থী হাতে পৌঁছানো হয়েছে ৮৫ হাজার ১৪৮ বই। এর মধ্যে খাগড়াছড়িতে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষার শিক্ষার্থী রয়েছে।
এরই মধ্যে বছরের দুটি মাস শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনও কোনও বিদ্যালয়ে পাহাড়িদের নিজ ভাষার ওপর একটি ক্লাসও হয়নি । কারণ এসব বই পড়ানোর জন্য নেই প্রশিক্ষিত শিক্ষক। ফলে গত দুই দশকের প্রচেষ্টা হাতের নাগালের বাইরেই রয়ে গেছে। বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্টরা জোর দিয়েছেন শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর।
খাগড়াছড়ি সদরের কমলছড়িমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সংশ্লিষ্ট মাততৃভাষায় বই প্রকাশ করলেও তা পড়ানোর জন্য তার স্কুলে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। প্রশিক্ষণ ছাড়া বইগুলো পড়ানো যাবে না। পিটিআই বা বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ শিক্ষক গড়ে তোলার জন্য তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
খাগড়াছড়ি সদরের মহাজন পাড়া এলাকার বাসিন্দা মিলন চাকমা বলেন, বর্ণমালা নির্ধারণসহ বই প্রকাশ করতে সরকারের ২০ বছর লেগেছে। এখন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ করতে কত বছর লাগবে, তা দেখার বিষয়।
খাগড়াছড়ি সদরের শিক্ষাবিদ ড. সুধীন কুমার চাকমা বলেন, যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে মাতৃভাষায় প্রাথমিক পর্যায়ের বর্ণমালা প্রস্তুত ও বই প্রকাশ করা হয়েছে,তার সুফল পাচ্ছে না পাহাড়ি শিশুরা। কারণ প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় বইগুলো পড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি দ্রুত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বইগুলো পড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানান।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ভারপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা অফিসার ফাতেমা মেহের ইয়াসমিন বলেন, সরকার এরই মধ্যে ৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা চালুর জন্য বই দিয়েছে। সমস্যা হলো প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। শিক্ষকদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ৩০জন প্রশিক্ষকের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ পেলে শিক্ষক প্রশিক্ষণ শুরু হবে।







