প্রতিবছর সারাদেশের মতো এবারও খাগড়াছড়িতে বাঙালি, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরার নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হয়েছে। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে, খাগড়াছড়ি জেলায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় লেখা বই দেওয়া হয়েছে। তবে এবার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা মাতৃভাষায় লেখা শুধু বাংলা বই পেয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জেলার ৭০৬টি বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৪৫ জন, বই বিতরণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৭২ হাজার ৭৪৯টি।
সূত্রে আরও জানা যায়, প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪০ হাজার ৫৫৯ জন এবং তাদের মাঝে মোট বই ও খাতা (প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণি) বিতরণ করা হয়েছে ৯১ হাজার ৭০৪টি।
এরমধ্যে প্রাক-প্রাথমিকে চাকমা ৫ হাজার ২১৫ জন শিক্ষার্থী বই ও খাতা পেয়েছে ১০ হাজার ৪৩০টি, মারমার ২ হাজার ৯৭৫ জন শিক্ষার্থী খাতাসহ বই পেয়েছে ৫ হাজার ৯৫০টি এবং ত্রিপুরার ৩ হাজার ৪৫৩ জন শিক্ষার্থী খাতাসহ বই পেয়েছে ৬ হাজার ৯০৬টি।
প্রথম শ্রেণির চাকমা ৪ হাজার ৬৭২ জন শিক্ষার্থী বই ও খাতা পেয়েছে ১৪ হাজার ১৬টি, মারমার ২ হাজার ৪৩৩ জন শিক্ষার্থী খাতাসহ বই পেয়েছে ৭ হাজার ২৯৯টি এবং ত্রিপুরার ৩ হাজার ৩৫০ জন শিক্ষার্থী খাতাসহ বই পেয়েছে ১০ হাজার ৫০টি।
দ্বিতীয় শ্রেণির চাকমা ৪ হাজার ২৯০ জন শিক্ষার্থী বই পেয়েছে ১২ হাজার ৮৭০টি, মারমার ২ হাজার ২৩১ জন শিক্ষার্থী বই পেয়েছে ৬ হাজার ৬৯৩টি এবং ত্রিপুরা ২ হাজার ৭৭৫ জন শিক্ষার্থী খাতাসহ বই পেয়েছে ৮ হাজার ৩২৫টি।
তৃতীয় শ্রেণির চাকমা ৪ হাজার ২৬০ জন শিক্ষার্থী বাংলা বই পেয়েছে ৪ হাজার ২৬০টি, মারমার ২ হাজার ১৬১ জন শিক্ষার্থী বই পেয়েছে ২ হাজার ১৬১টি এবং ত্রিপুরার ২ হাজার ৭৪৪ জন শিক্ষার্থী বাংলা বই পেয়েছে ২ হাজার ৭৪৪টি।
কমলছড়িমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রিঝুম চাকমা নিজ মাতৃভাষায় বই পেয়ে খুব খুশি। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণিতে চাকমা বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয় থাকায় দ্বিতীয শ্রেণির বইগুলো খুব সহজেই সে পড়তে পারছে বলে জানায়।
কমলছড়িমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মাতৃভাষায় বই দেওয়া সরকারের অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ। আগে শিশুরা মাতৃভাষার অক্ষরও চিনতো না। এখন তারা মাতৃভাষার অক্ষর চিনতে, পড়তে ও লিখতে পারছে। এতে করে খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসরত চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিশুরা নিজেদের ভাষাকে রক্ষা করতে পারবে।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফাতেমা মেহের ইয়াসমিন জানান, সরকারের উদ্যোগে ২০১৭ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিশুরা মাতৃভাষায় পড়তে পারছে। প্রথমে প্রাক-প্রাথমিকে দেওয়া হলেও পর্যায়ক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি মাতৃভাষায় বই দেওয়া হয়। এ বছর নতুন করে তৃতীয় শ্রেণিতে শুধু বাংলা বিষয়ে মাতৃভাষায় বই দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে জেলার ৯ উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাধারণ পাঠ্যক্রম ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার বই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, ‘শিশুদের মাঝে মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য অভিজ্ঞ শিক্ষক দরকার। এজন্য খাগড়াছড়িতে সম্প্রদায় ভিত্তিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। হাতে-কলমে অভিজ্ঞ শিক্ষকরা মাতৃভাষায় পাঠদান করালে কোমলমতি শিশুরা পড়তে ও শিখতে মজা পাবে, স্কুলে নিয়মিত আসবে। ড্রপআউট কমবে, শিক্ষার হার বাড়বে। মাতৃভাষায় লেখাপড়ার কারণে ভাষা সংরক্ষণের পাশাপাশি কৃষ্টি সংষ্কৃতিও রক্ষা পাবে।’
উল্লেখ্য, ২০১৭ সাল থেকে দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পড়াশোনার জন্য বই বিতরণ করে সরকার। তখন চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো এবং সাদ্রি এই পাঁচ ভাষায় বই বিতরণ করা হতো। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষাভাষি শিশুরা প্রাক-প্রাথমিক বই পায়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে প্রথম শ্রেণি, ২০১৯ সালে দ্বিতীয় শ্রেণি ও ২০২০ সালে তৃতীয় শ্রেণিতেও মাতৃভাষায় বই বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে সরকার। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় পড়তে পারবে দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা।








