লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের পশ্চিমে মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরের জমি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বিএনপির নেতারা। ইতিমধ্যে চরের অনেক জমি দখল করেছেন। বাকি দুই হাজার ৭০০ একরের বিশাল চরাঞ্চলের জমি নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তারা। বিগত কয়েক বছর আওয়ামী লীগের নেতাদের দখলে ছিল চরটি।
এরই মধ্যে নভেম্বর মাসে উত্তর ও চরবংশী ইউপির মেঘনার চরাঞ্চলে কোন কোন ব্যক্তির জমির দলিল রয়েছে, তা নিয়ে দেখা করার জন্য মাইকিং করেছেন উত্তর চরবংশী ইউনিয়ন বিএনপি আহ্বায়ক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা গাজীসহ বিএনপির নেতারা। দলিল না থাকলে এসব জমি দখলের চিন্তা থেকে মাইকিং করেছেন করেছেন বলে জানিয়েছেন চরের কয়েকজন বাসিন্দা।
তবে মোস্তফা গাজী বলছেন, গত ১৭ বছর ভূমি দস্যু আলতাফ মাস্টারসহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার দখলে ছিল চরের সরকারি খাস জমিগুলো। এসব জমি এখন উদ্ধার করে প্রকৃত মালিকদের দেওয়া হবে।
এদিকে, গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার (২০ ও ২১ ডিসেম্বর) মেঘনার চর, মাছঘাট ও বাজার দখলকে কেন্দ্র করে তিন দফায় উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব শামীম গাজীসহ তার অনুসারী এবং উত্তর চরবংশী ইউপির বিএনপির সহসভাপতি ফারুক গাজীসহ তার অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে দলীয় কার্যালয়, মাছের আড়ৎ, বসতঘর, দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। একইসঙ্গে দুটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের শান্ত করে সেনাবাহিনী ও পুলিশ।
সংঘর্ষের ঘটনায় শনিবার (২২ ডিসেম্বর) বিকালে রায়পুরের সাবেক এমপি আবুল খায়ের ভূঁইয়ার নির্দেশে উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ সংবাদ সম্মেলন করে উত্তর চরবংশী ইউপির বিএনপিসহ তার সহযোগী সংগঠনের সব কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে। সেইসঙ্গে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জেডএম নাজমুল ইসলাম মিঠুসহ ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উত্তর চরবংশী, দক্ষিণ চরবংশী ও উত্তর চরআবাবিল ইউপির মেঘনার চরাঞ্চলের এসব জমিতে ভূমিহীনদের সরকারিভাবে বন্দোবস্ত দেওয়ার কথা থাকলেও পুনর্বাসনের নামে একশ্রেণির অসাধু ভূমি কর্মকর্তার যোগসাজশে দলীয় এবং প্রভাবশালীরা এগুলো নিজেদের দখলে রাখছেন।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হোসেন, আবু সালেহ মিন্টু ফরাজি ও আবু জাফর দুলাল হাওলাদার জানিয়েছেন, চরগুলো আগে আওয়ামী লীগের দখলে ছিল, এখন বিএনপি নেতাদের। আমরা কিছুই বলতে পারছি না। দলের শীর্ষ নেতারা এবং প্রশাসন জেনেও নীরব ভূমিকা পালন করছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মেঘনার চরের মানুষের অভিযোগ ছিল, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আলতাফ হোসেন মাস্টার চর দখলে রেখেছেন। বর্তমানে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা গাজীর নেতৃত্বে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা চরের জমি দখল করে রেখেছেন।
উত্তর ও দক্ষিণ চরবংশী ইউপির চরঘাসিয়া, টুনুর চর, চর কানিবগা, চর কাচিয়া ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা মাহমুদ আলী, জয়নাল আবেদিন ও ফারুক হোসেনসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চরে বসবাস করছে ভিটেমাটি হারানো কয়েক হাজার পরিবার। এসব লোকজন চরের অনাবাদি জমি চাষাবাদ করে আবাদি করে তুলছেন। কিন্তু সরকারের খাস জমি গত ১৫-১৬ বছর অবৈধভাবে দখল করে রেখেছিলেন রায়পুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেনসহ তার অনুসারীরা। পরে মামলাসহ বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে ভূমিহীনদের কাছ থেকে ইজারা হিসেবে প্রতি একরে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা করে আদায় করেছেন তারা।
উত্তর ও দক্ষিন চরবংশী ইউপির চরঘাসিয়া, টুনুর চর চর কানিবগা ও চর কাচিয়া চরাঞ্চল ঘুরে মাহমুদ আলী, জয়নাল আবেদিন ও ফারুক হোসেন সহ কয়েকজন চরবাসী জানান, মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চরে বসবাস করছেন ভিটেমাটি হারানো কয়েক হাজার পরিবার। এসব লোকজন চরের অনাবাদি জমি চাষাবাদ করে আবাদি করে তুলছেন। কিন্তু এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশে সরকারের খাস জমি বছরের পর বছর অবৈধভাবে দখল করে রেখেছিলেন রায়পুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেনসহ তার অনুগতরা। পরে মামলাসহ বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে ভূমিহীনদের কাছ থেকে ইজারা হিসেবে প্রতি একর জমি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আদায় করছিলেন তারা।
মাহমুদ আলী ও জয়নাল আবেদিন জানিয়েছেন, সাবেক চেয়ারম্যান আলতাফ, তার অনুসারী সাবেক মেম্বার মফিজ খান, আবুল মাল ও ফারুক ছৈয়ালসহ কয়েকজন চরঘাসিয়া, চরকানিবগা ও চরকাচিয়ার কয়েকশ একর খাস জমি দখল করে রেখেছিলেন। কোনও ভূমিহীন এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করতে পারেননি। শেখ হাসিনার পতনের পর গত তিন-চার মাস ধরে স্থানীয় বিএনপির ৩০-৫০ জনের সংঘবদ্ধ দল ইতিমধ্যে অনেক জমি দখল করেছেন, বাকিগুলো দখলে নিতে মরিয়া হয়ে আছেন।
উত্তর চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. মামুন জানান, মেঘনার বুকে জেগে ওঠা সরকারি খাস জমি এতদিন আওয়ামী লীগের নেতা আলতাফ মাস্টারসহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার দখলে ছিল। সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে তারা পালিয়ে যাওয়ার পর এখন প্রভাবশালী একটি চক্র চরটি আবার দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমাকে ম্যানেজ করতে দুই নেতা এসেছিলেন। আমি রাজি না হওয়ায় দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে যান। বর্তমানে এসব চরে ২ হাজার ৭০০ একর সরকারি খাস সম্পত্তি দখল করে রেখেছেন প্রভাবশালীরা।’
রায়পুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন জানান, চরাঞ্চলের কয়েকশ একর সম্পত্তি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। আমার সম্পত্তি এতদিন আমার দখলেই ছিল। সরকার পতনের পর বিএনপির উত্তর ও দক্ষিণ চরবংশী ইউপির নেতারা চরগুলো দখলে নিয়েছেন। আমিসহ আমার বড় ভাই ইউপি চেয়ারম্যানকেও হেয় করার জন্য ষড়যন্ত্র করছেন তারা। হুমকি-ধমকিও দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নাজমুল ইসলাম মিঠু ও সদস্যসচিব শফিকুর রহমান ভুঁইয়া জানান, উত্তর চরবংশী ইউপির বিএনপি ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় সংগঠনের সব কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দখল হয়ে যাওয়া এসব সরকারি জমি উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক রাজিব কুমার সরকার বলেন, ‘শুধু মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চর নয়, চারটি উপজেলার আওতাধীন চরগুলো প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে। এমন অভিযোগ পেয়েছি আমরা। চরগুলো পরিদর্শনে যাবো। চরাঞ্চলে সরকারের যে খাস সম্পত্তি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে, তার একটি তালিকা তৈরির কাজ চলমান আছে।’









