‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ জঙ্গল সলিমপুরে থামছেই না সন্ত্রাসীদের দাপট

নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম
২৬ মে ২০২৬, ১৭:৪২ আপডেট : ২৬ মে ২০২৬, ১৭:৪২

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর স্থানীয়দের কাছে বহুদিন ধরেই পরিচিত ‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ হিসেবে। অভিযোগ আছে, এখানে রাষ্ট্রের আইন-কানুনের চেয়েও বেশি কার্যকর ছিল সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা বিশাল অবৈধ বসতি, প্লট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র আধিপত্যকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন এক জনপদে পরিণত হয়েছে।

গত ১৯ জানুয়ারি র‌্যাবের অভিযানে কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব নিহত ও আরও তিন সদস্য আহত হওয়ার ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে যৌথ বাহিনীর বড় অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার ও একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পর দাবি করা হয়, জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ ফিরে এসেছে রাষ্ট্রের হাতে।

কিন্তু রবিবার (২৪ মে) মধ্যরাতে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা এবং নির্মাণাধীন আরেকটি ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে, সত্যিই কি শেষ হয়েছে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের আধিপত্য?

মধ্যরাতের হামলায় রণক্ষেত্র

রাত তখন প্রায় ১টা। সীতাকুণ্ডের আলীনগর স্কুলে স্থাপিত যৌথ বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করছিলেন র‌্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও আরআরএফ সদস্যরা।

হঠাৎ ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকার কয়েকটি টিনের ঘর থেকে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। স্থানীয় সূত্র বলছে, টিনের দেয়াল ও চালে ছোট ছোট ছিদ্র করে পরিকল্পিতভাবে ফায়ারিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

আকস্মিক হামলার পর পাল্টা অবস্থান নেয় যৌথ বাহিনী। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে গোলাগুলির ঘটনায় পুরো এলাকা আতঙ্কে কেঁপে ওঠে।

এদিকে, গোলাগুলির মধ্যেই সন্ত্রাসীদের আরেকটি দল পাশের নির্মাণাধীন যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায়। সেখানে থাকা একটি এক্সকাভেটর ব্যবহার করে ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলা হয়।

জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান

জানা গেছে, ওই ক্যাম্পের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল। আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সেটির উদ্বোধনের কথা ছিল। তার আগেই হামলার ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

বারবার হামলার শিকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

রবিবারের ঘটনাই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে জঙ্গল সলিমপুরে।

গত ১৯ জানুয়ারি র‌্যাবের একটি টিম অভিযানে গেলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। এতে র‌্যাব কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব নিহত হন। আহত হন আরও তিন সদস্য।

এর আগে ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বড়ইতলা এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে হামলার শিকার হন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ওই ঘটনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক, সীতাকুণ্ড থানার ওসি তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।

২০২২ সালেও র‌্যাব, পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে।

কীভাবে ‘অন্য এক দেশে’ পরিণত হলো জঙ্গল সলিমপুর?

স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এটি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠে অবৈধ বসতি ও প্লট বাণিজ্যের বিশাল নেটওয়ার্ক।

অভিযোগ রয়েছে, ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন ৩৪টি পাহাড় কেটে প্রায় ৫৮৬ একর সরকারি জমিতে প্রায় ১৪ হাজার প্লট তৈরি করেছে। অন্যদিকে ‘আলীনগর সমবায় সমিতি’ আরও তিনটি পাহাড় কেটে ২৩৬ একর জমিতে আড়াই হাজারের বেশি প্লট তৈরি করেছে।

এসব প্লট ৫ থেকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এলাকায় পাহাড় কাটাকে কেন্দ্র করে চালু রয়েছে কথিত ‘টোকেন সিস্টেম’। প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিয়ে টোকেন কিনে পাহাড় কাটার অনুমতি নেওয়া হয়। পরে সেই জমি বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

ভূমি অফিসের জরিপে অন্তত ৩৭টি পাহাড় কাটার প্রমাণ মিলেছে।

‘ত্রাসের রাজত্ব’ যেভাবে শুরু

স্থানীয়দের দাবি, নব্বইয়ের দশকে দুর্ধর্ষ ভূমিদস্যু আলী আক্কাস প্রথম এ এলাকায় আধিপত্য গড়ে তোলেন। তার হাত ধরেই শুরু হয় পাহাড় কাটা ও অবৈধ দখল।

২০১০ সালে র‌্যাবের ক্রসফায়ারে আলী আক্কাস নিহত হওয়ার পর তার অনুসারীরা এলাকা নিয়ন্ত্রণ নেয়। বর্তমানে রোকন মেম্বার, মশিউর, ইয়াছিন, ফারুক, গাজী সাদেক, গফুর মেম্বার, রিপন ও আল আমিন সাগরসহ একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ চলছে।

কে এই ইয়াছিন?

রবিবারের হামলায় ইয়াছিন গ্রুপ জড়িত বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

জানা গেছে, ২০০৩ সালে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামে আসেন মোহাম্মদ ইয়াছিন। শুরুতে একটি জুট মিলে চাকরি করলেও পরে জঙ্গল সলিমপুরে বসবাস শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন অপরাধ জগতে।

স্থানীয় সূত্র বলছে, পুলিশের ভয় আছে—এমন অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য—সবকিছুর মধ্য দিয়ে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী। পরে পুরো এলাকাই পরিণত হয় সন্ত্রাসীদের শক্ত ঘাঁটিতে।

যা বলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, “রবিবার রাত ১টার দিকে ইয়াছিন গ্রুপের ২০০ থেকে ৩০০ সশস্ত্র ব্যক্তি যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায়। তাদের হাতে দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল।”

তিনি বলেন, “যৌথ বাহিনীর সদস্যরা সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। কয়েকজন সদস্য সামান্য আহত হলেও কেউ নিহত হননি।”

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, “জঙ্গল সলিমপুরে যেই জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইয়াছিন, রোকনসহ সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।”

তিনি আরও বলেন, “এলাকাটিতে কোটি কোটি টাকার স্বার্থ জড়িত। সেই আধিপত্য ধরে রাখতেই সন্ত্রাসীরা হামলা চালাচ্ছে। দ্রুত সড়ক নির্মাণ ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে আসবে।”

/এম/ 
সম্পর্কিত
অ্যাকশনে গেলে বদলি পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবে কে?
দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় সারাদেশে আনসার-ভিডিপির আগাম প্রস্তুতি
যে যুবদল নেতা মামলার আসামি, তিনিই আবার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য
সর্বশেষ খবর
ইটভাটার দেয়াল ধসে প্রাণ গেল ২ শ্রমিকের
ইটভাটার দেয়াল ধসে প্রাণ গেল ২ শ্রমিকের
‘এসআরবি’র কাছে ‘জিয়ার সৈনিক’ পরিচয় দিয়ে লাভ নেই: কর্মকর্তা 
‘এসআরবি’র কাছে ‘জিয়ার সৈনিক’ পরিচয় দিয়ে লাভ নেই: কর্মকর্তা 
‘আমেরিকা আর আমাদের চায় না’, ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীদের দেশে ফেরার আহ্বান ভেম্বুর
‘আমেরিকা আর আমাদের চায় না’, ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীদের দেশে ফেরার আহ্বান ভেম্বুর
তানজিদের ঝড়ো ব্যাটিং, দারুণ সূচনায় লাঞ্চ বিরতিতে বাংলাদেশ 
তানজিদের ঝড়ো ব্যাটিং, দারুণ সূচনায় লাঞ্চ বিরতিতে বাংলাদেশ 
সর্বাধিক পঠিত
রংপুরে চার খুন: খেজুর-শসা-সিগারেট কারা খেয়েছিল নিশ্চিত করলো সিআইডি
রংপুরে চার খুন: খেজুর-শসা-সিগারেট কারা খেয়েছিল নিশ্চিত করলো সিআইডি
বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সেই মাহদীকে
বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সেই মাহদীকে
মন্ত্রী বললেন বাবা শোনো, বিক্ষোভকারী বললেন ‘এখানে দেশ বিক্রি হচ্ছে, ঢুকতে দেবো না’
মন্ত্রী বললেন বাবা শোনো, বিক্ষোভকারী বললেন ‘এখানে দেশ বিক্রি হচ্ছে, ঢুকতে দেবো না’
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য টিপসই দিয়ে বিধবা জানলেন ‘বিয়ে হয়ে গেছে’
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য টিপসই দিয়ে বিধবা জানলেন ‘বিয়ে হয়ে গেছে’
পূর্ণিমাকে দেওয়া কোন কথা রেখেছিলেন মান্না
পূর্ণিমাকে দেওয়া কোন কথা রেখেছিলেন মান্না