সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল সরকার। সেখানে স্পোর্টস ভিলেজ থেকে শুরু করে হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালসহ কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠান জঙ্গল সলিমপুরে হলে চাপ কমতো শহরের ওপর। তৈরি হতো হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটতো। কিন্তু গত পাঁচ বছরেও সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
পাহাড়বেষ্টিত এই অঞ্চলকে আধুনিক উপশহরে রূপান্তরের স্বপ্ন নিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে নানা ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সন্ত্রাসী ও দখলদার চক্র।
সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, সলিমপুরে স্পোর্টস ভিলেজ, হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, ইকোপার্ক, নাইট সাফারি পার্ক, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-২, সবুজ শিল্প এলাকা, আনসার-ভিডিপি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ একাধিক বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু সরকারি জমি সম্পূর্ণভাবে উদ্ধার এবং ভূমিদস্যুদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত না করা পর্যন্ত এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু সীতাকুণ্ড নয়, পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্র পাল্টে যাবে। সৃষ্টি হবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। নগরীর ওপর চাপ কমবে এবং দীর্ঘদিনের অবহেলিত এ অঞ্চল উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত হবে।
তিন হাজার ১০০ একর খাস জমির ওপর সরকারের পরিকল্পনা
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুরের পাঁচটি মৌজায় প্রায় তিন হাজার ১০০ একর সরকারি খাস জমি রয়েছে। এই বিশাল এলাকা পূর্ব ও উত্তরে চট্টগ্রাম সেনানিবাস ও বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণে শহরবেষ্টিত। ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিস্তৃত খাস জমির কারণে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে। বিশেষ করে নগর সম্প্রসারণের বিকল্প এলাকা হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি পরিকল্পনায় যা আছে
জেলা প্রশাসনের কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, জঙ্গল সলিমপুরে স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ, হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল স্থাপন, ইকোপার্ক ও নাইট সাফারি পার্ক, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-২, উচ্চক্ষমতার বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রশিক্ষণকেন্দ্র, কাস্টমস ডাম্পিং হাউজ, ভূমিহীনদের পুনর্বাসন প্রকল্প, সবুজ শিল্প এলাকা ও আনসার-ভিডিপি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ আরও বেশ কিছু প্রকল্প।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হলে নগরীর ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। একইসঙ্গে পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা, ক্রীড়া, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-২ নির্মাণের পরিকল্পনা
চট্টগ্রাম বর্তমানে একটি কারাগার রয়েছে। কেন্দ্রীয় কারাগারে এক হাজার ৭১৩ জনের ধারণক্ষমতা হলেও বর্তমানে বন্দি আছে ছয় হাজার জন। ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি বন্দিকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। এ অবস্থায় জঙ্গল সলিমপুরে দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনার কথা ভাবা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগরের কাছাকাছি জঙ্গল সলিমপুরে নতুন কারাগার নির্মিত হলে বন্দি ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি আসবে। একইসঙ্গে কারাগারকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনমুখী কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কারা উপ-মহাপরিদর্শক মো. ছগির মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে কারাগারের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি আগে থেকে বিবেচনায় ছিল। জঙ্গল সলিমপুরে নতুন করে একটি কারাগার প্রতিষ্ঠার আলোচনা চলছে। চট্টগ্রাম কারাগারে মাদক, মহানগার, জেলা ও সন্ত্রাস প্রকৃতির বন্দি রয়েছে। তাদের জন্য পৃথক কারাগার হলে অপরাধ প্রবণতা কমে আসতো।’
ইকোপার্ক ও সাফারি পার্কে বদলে যেতে পারে পর্যটন খাত
নগরীতে এখনও বড় পরিসরের উন্মুক্ত পার্কের অভাব রয়েছে। জঙ্গল সলিমপুরে ইকোপার্ক ও নাইট সাফারি পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিঙ্গাপুরের আদলে জঙ্গল সলিমপুরে হবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নাইট সাফারি পার্ক। ৫৭ দশমিক ৫০ একর জমিতে এ নাইট সাফারি পার্ক নির্মাণের কথা রয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এটি চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম বড় বিনোদন ও পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। পাশাপাশি পাহাড় ও বনাঞ্চল সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ স্থাপনা
গত তিন দশকে জঙ্গল সলিমপুরের শত শত একর পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে হাজার হাজার বাড়িঘর। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সমিতির নামে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে আবাসিক প্লট। মাত্র ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লাখ লাখ টাকায় এসব জমির মালিকানা বিক্রি করা হয়েছে। সরকারি খাস জমি দখল করে গড়ে উঠেছে বিশাল প্লট বাণিজ্য।
জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ একরের বেশি পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশবাদীরা দাবি করছেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
চট্টগ্রাম পরিবেশ ফোরামের দাবি, গত দুই দশকে ৪০ থেকে ৫০ জন চিহ্নিত ভূমিদস্যু জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় কার্যত নিজেদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। তাদের সহযোগী হিসেবে রয়েছে আরও প্রায় ৩০০ দখলদার। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে, তখন সেই দলের নাম ও ব্যানার ব্যবহার করে ভূমিদস্যুরা নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, তারা সরকারি পাহাড় কেটে প্লট তৈরি করে হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষের কাছে বিক্রি বা ভাড়া দিয়েছে। এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এসব পাহাড়ি এলাকায় গড়ে উঠেছিল অস্ত্র, মাদক, চোরাচালান ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আস্তানা। আধিপত্য বিস্তার ও অর্থ ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে নিয়মিত সংঘর্ষ, গোলাগুলি এবং হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। চট্টগ্রাম পরিবেশ ফোরামের অভিযোগ, ভূমিদস্যুরা এ অঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ পাহাড় ধ্বংস করেছে।
সমবায়ের আড়ালে সরকারি জমি দখল
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর ও এর আশপাশের সরকারি খাস জমি দখলের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময়ে ১৫টি সমবায় সমিতির নামে হাউজিং প্রকল্প গড়ে তোলা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- আলী নগর ভূমিহীন সমবায় সমিতি, ছিন্নমূল বহুমুখী সমবায় সমিতি, একতা ভূমিহীন সমবায় সমিতি, নুর নবী শাহ হাউজিং সমবায় সমিতি, জঙ্গল সলিমপুর জনকল্যাণ কর্মজীবী সমবায় সমিতি, গোলপাহাড়া ভূমিহীন সমবায় সমিতি, আল মদিনা সমবায় সমিতি, মায়ের আঁচল সমবায় সমিতি, ভিত্তিহীন সমবায় সমিতি, চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল সংগ্রামী বস্তিবাসী সমন্বয় পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা হাউজিং সমবায় সমিতি, নবীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি ও আলী নগর বহুমুখী সমবায় সমিতি। এসব সমিতির অনেকগুলোর বিরুদ্ধে খাস জমি দখল, পাহাড় কাটা ও প্লট বাণিজ্যের অভিযোগ আছে। ইতোমধ্যে ১৫টি সমবায় সমিতির নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।
উন্নয়ন বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজন জমি উদ্ধার
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গল সলিমপুরে পরিকল্পিত উন্নয়ন বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হলো পুরো এলাকা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা। এজন্য অবৈধ দখল উচ্ছেদ, জমির সীমানা নির্ধারণ, জরিপ সম্পন্ন এবং পাহাড় ধ্বংস বন্ধ করতে হবে। তাদের মতে, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী চক্রের প্রভাবমুক্ত করা গেলে জঙ্গল সলিমপুর চট্টগ্রামের নতুন অর্থনৈতিক ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
বদলে যেতে পারে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জঙ্গল সলিমপুরের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের নগরায়ণ নতুন মাত্রা পাবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে হাজার হাজার মানুষের। পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পায়ন ও আবাসন খাতে নতুন বিনিয়োগ আসবে।
সন্ত্রাস, পাহাড় কাটা ও ভূমিদস্যুতার জন্য পরিচিত এই অঞ্চল পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামের অন্যতম সম্ভাবনাময় উপশহরে রূপ নিতে পারে। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আগে প্রয়োজন দখলদার ও সন্ত্রাসী চক্রের কবল থেকে সরকারি জমি সম্পূর্ণ মুক্ত করা।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা ইয়াসিন-রোকন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় লোকজন বলছেন, পাহাড়বেষ্টিত জঙ্গল সলিমপুরকে অশান্ত করার নেপথ্যে কারিগর হিসেবে কাজ করছে ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন ও রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ইয়াসিন জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকার অবৈধ দখলদার এবং ‘একচ্ছত্র স্বঘোষিত রাজা’ হিসেবে পরিচিত। মূলত এই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর কারণেই জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে পদে পদে বাধা পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবশেষ আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে ২৪ মে গভীর রাতে সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলায় অংশ নেয় অন্তত ৩০০ জনের সশস্ত্র বাহিনী। হামলায় সবচেয়ে মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র একে-৪৭ ব্যবহার করেছে তারা। পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসী মো. ইয়াসিন বাহিনী এ হামলা চালায় বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।
হামলার সময় বুলডোজার দিয়ে নির্মাণাধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যাতায়াত ঠেকাতে সড়কের বেশ কয়েকটি অংশ কেটে দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকায় র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চালানো হয়। তবে যৌথ কিংবা সাঁড়াশি অভিযান; কোনও অভিযানেই ধরা পড়েনি ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান কিংবা তার সহযোগীরা।
এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। তবে এসব প্রকল্প নিয়ে এখনও মন্ত্রণালয় থেকে কোনও চিঠি আসেনি। চিঠি আসার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আগে যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।’








