আবার সেই শঙ্কা, ২৫০ জনের মৃত্যুতেও ঘুম ভাঙেনি কারও

নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম
০৮ জুলাই ২০২৬, ১০:০১আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১০:০১

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টিতে আবারও পাহাড়ধসের শঙ্কায় কাঁপছে চট্টগ্রাম। আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়ে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। 

প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করলেও আতঙ্কে দিন কাটছে হাজারো পরিবারের। কারণ ২০০৭ সালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের পর থেকে দীর্ঘ ১৯ বছরেও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গঠিত কমিটির দেওয়া ৩৬টি সুপারিশের একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে একের পর এক দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত পাহাড়ধস ও মাটিচাপায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৫০ জন।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামের ইতিহাসের ভয়াবহতম পাহাড়ধসে একদিনেই ১২৭ জন নিহত হন। ওই ট্র্যাজেডির পর বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠন করা হয় পাহাড় রক্ষা ব্যবস্থাপনা কমিটি। কমিটি পাহাড়ধসের ২৮টি কারণ চিহ্নিত করে ৩৬টি সুপারিশ দিলেও প্রায় দুই দশকেও তার একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষা এলেই নতুন করে বাড়ে পাহাড়ধসের ঝুঁকি ও প্রাণহানির আশঙ্কা।

৮৮টি পাহাড় পুরোটাই বিলুপ্ত 

বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরাম সূত্র জানিয়েছে, স্বাধীনতার পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৮৮টি পাহাড় পুরোটাই বিলুপ্ত হয়েছে। একই সময়ে আংশিক কাটা হয়েছে ৯৫টি। এরপরের ১২ বছরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিয়েছে। শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পাহাড় নিধন।

বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আলিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০০৭ সালের পর থেকে পাহাড়ধসে অন্তত ২৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অথচ যে ৩৬টি সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব ছিল, তার একটি পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। ফলে প্রতি বছরই একই ধরনের প্রাণহানি ঘটছে। বর্ষা এলে ঘুম ভাঙে প্রশাসনের। মাইকিংসহ কিছু লোক দেখানো কাজ করেই দায় সারে। সারা বছরই পাহাড় রক্ষায় কোনও কার্যক্রম দেখা যায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০০১ সালে চট্টগ্রামের পাহাড় নিয়ে এক গবেষণায় বলা হয়, বেশিরভাগ পাহাড় কাটা হয় পাহাড়তলী, খুলশী, বায়েজিদ, লালখানবাজার, মতিঝর্ণা, ষোলশহর ও ফয়’স লেকে। ১৯৭৬ সাল থেকে পরবর্তী ৩২ বছরে চট্টগ্রাম নগর ও আশপাশের ৮৮টি পাহাড় সম্পূর্ণ এবং ৯৫টি আংশিক কেটে ফেলা হয়।'

তিনি বলেন, ওই গবেষণায় আরও বলা হয়, ১৯৭৬ সালে নগরের পাঁচ থানা এলাকায় মোট পাহাড় ছিল ৩২ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার। ২০০৮ সালে তা কমে হয় ১৪ দশমিক শূন্য দুই বর্গকিলোমিটার। ২০০৮ সালে তা কমে হয় ১৪ দশমিক শূন্য দুই বর্গকিলোমিটার। এ সময়ে ১৮ দশমিক ৩৪৪ বর্গকিলোমিটার পাহাড় কাটা হয়। এটা মোট পাহাড়ের প্রায় ৫৭ শতাংশ। নগরের বায়েজিদ, খুলশী, পাঁচলাইশ, কোতোয়ালি ও পাহাড়তলী থানা এলাকায় এসব পাহাড় কাটা হয়। সবচেয়ে বেশি ৭৪ শতাংশ পাহাড় কাটা হয় পাঁচলাইশে।’

সুপারিশগুলো কী ছিল

পাহাড় রক্ষায় কমিটির সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল পাহাড়ের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন হাউজিং প্রকল্প নিষিদ্ধ করা, পাহাড়ে ব্যাপক বনায়ন, গাইডওয়াল ও ড্রেন নির্মাণ, পাহাড়ি বালু উত্তোলন বন্ধ, পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় ইটভাটা নিষিদ্ধ করা, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশের বসতি উচ্ছেদ, পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা এবং নগর সম্প্রসারণ কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে পটিয়া-আনোয়ারা অঞ্চলে নেওয়া। বাস্তবে এসব সুপারিশের কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি।

আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে চট্টগ্রামে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। অতি ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ বশির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও অতি ভারী বৃষ্টিও হতে পারে। এতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আছে।’

পাহাড়গুলোতে সতর্কতা জোরদার

আবহাওয়ার এমন পূর্বাভাসের পর জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদফতর ও সিটি করপোরেশন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে সতর্কতা জোরদার করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে তাদেরকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বলা হচ্ছে।

জেলা পাহাড় ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উপ-কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে এখনও এক হাজারের বেশি পরিবার বসবাস করছে। প্রশাসন প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে তাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বললেও অধিকাংশ পরিবার জীবিকার কারণে সেখানে থেকেই যায়।

সবশেষ ২০২৩ সালের ২৭ আগস্ট নগরীর পাঁচলাইশ থানার ষোলশহর আইডব্লিউ কলোনিতে পাহাড়ধসে মো. সোহেল (৩৫) ও তার সাত মাস বয়সী মেয়ে জান্নাত নিহত হন। এর কয়েক মাস আগে ওই বছরের ৭ এপ্রিল আকবরশাহ থানার বেলতলিঘোনা এলাকায় সড়ক নির্মাণকাজের সময় পাহাড়ধসে শ্রমিক মো. মজিবুর রহমান খোকা নিহত এবং তিন জন আহত হন।

২০০৭ সালের ১১ জুন মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেনানিবাস এলাকা, লেডিস ক্লাব, কুসুমবাগ, কাছিয়াঘোনা, ওয়ার্কশপঘোনা, মতিঝরনা ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জন নিহত হন। এরপর ২০০৮ সালে মতিঝরনায় ১২ জন, ২০১১ সালে বাটালি হিলে ১৭ জন, ২০১২ সালে ২৪ জন, ২০১৩ সালে দুই জন, ২০১৫ সালে পাঁচ জন, ২০১৮ সালে চার জন, ২০১৯ সালে একজন, ২০২২ সালে চার জন এবং ২০২৩ সালে আরও তিন জনের মৃত্যু হয়। সবমিলে ২০০৭ সালের পর থেকে পাহাড়ধস ও মাটিচাপায় প্রাণ গেছে অন্তত ২৫০ জনের। তবু ঘুম ভাঙেনি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের। এত প্রাণহানির পরও পাহাড় কাটা, দখল এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

যা বলছে জেলা প্রশাসন

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীদের পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগদানে সহযোগিতাকারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রণয়ন, মূল মালিকদের চিহ্নিত করা এবং পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা ও জেল-জরিমানা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল বর্ষা মৌসুমে উচ্ছেদ অভিযান বা মাইকিং করে পাহাড়ধস ঠেকানো সম্ভব নয়। ২০০৭ সালের ট্র্যাজেডির পর দেওয়া সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন, অবৈধ পাহাড় কাটা ও দখল বন্ধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে স্থায়ীভাবে বসতি অপসারণ করা না গেলে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

নগরের বাকলিয়া সার্কেলের সহকারি কমিশনার (ভূমি) শিফাত বিনতে আরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরের মতি ঝরনা পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সকাল থেকে রাস্তায় মাইকিং চালু আছে এবং স্থানীয় মসজিদে এ সংক্রান্ত ঘোষণা প্রচার করা হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আরও দুই মাস আগে থেকেই পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারি বাসিন্দাদের সরে যেতে বলা হচ্ছে। মাইকিং করার পাশাপাশি জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রস্তুত রাখা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো। চাইকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী যে কেউ এখানে বসবাস করতে পারবে।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
টানা বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, পাহাড়ধসের শঙ্কা
আজও ৬ বিভাগে ভারী বৃষ্টির শঙ্কা, সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত
টানা বৃষ্টিতে বন্যা ও পাহাড়ধসের শঙ্কা, ১৭ জেলায় সতর্কতা
সর্বশেষ খবর
বাহরাইন-কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা
বাহরাইন-কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা
মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসন রোধে একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ-ভিয়েতনাম
মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসন রোধে একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ-ভিয়েতনাম
পানিতে ডুবে গেছে রেললাইন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ট্রেন চলাচল বন্ধ 
পানিতে ডুবে গেছে রেললাইন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ট্রেন চলাচল বন্ধ 
ইরানে মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিতের দাবি আইআরজিসির
ইরানে মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিতের দাবি আইআরজিসির
সর্বাধিক পঠিত
‘আপনি জানেন না আমি কে’, এমবাপ্পেকে হুঁশিয়ারি প্যারাগুয়ের সিনেটরের
‘আপনি জানেন না আমি কে’, এমবাপ্পেকে হুঁশিয়ারি প্যারাগুয়ের সিনেটরের
ধানক্ষেত-জঙ্গল পেরিয়ে যা দেখলেন প্রধানমন্ত্রী
ধানক্ষেত-জঙ্গল পেরিয়ে যা দেখলেন প্রধানমন্ত্রী
৩২ কোটি ডলার ঘুষ নেওয়া সাবেক চীনা কর্মকর্তার বিরল মৃত্যুদণ্ড
৩২ কোটি ডলার ঘুষ নেওয়া সাবেক চীনা কর্মকর্তার বিরল মৃত্যুদণ্ড
কোয়ার্টার ফাইনালের সূচি চূড়ান্ত, কোন কোন দল মুখোমুখি
কোয়ার্টার ফাইনালের সূচি চূড়ান্ত, কোন কোন দল মুখোমুখি
গুলিতে নিহত ৩ জনের লাশ নিতে আসেনি কেউ, পড়ে আছে হাসপাতালে
গুলিতে নিহত ৩ জনের লাশ নিতে আসেনি কেউ, পড়ে আছে হাসপাতালে