নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মহাসড়কে এখনও তিন চাকার যানবাহন চলাচল করছে। অবাধে এসব যান চলাচলের কারণে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়কে এসব যানবাহনের চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
২০১২ সালের অক্টোবরে উচ্চ আদালত মহাসড়কে তিন চাকার সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কিন্তু প্রভাবশালী একটি মহলের সহায়তায় প্রতিনিয়ত চাঁদা দিয়ে এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মহাসড়কে এসব অবৈধ যান চালিয়ে আসছেন চালক ও মালিকরা। প্রতিদিনই মহাসড়কে অবাধে চলাচল করছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, টমটমসহ ব্যাটারিচালিত রিকশা। এসব ছোট যানবাহনের কারণে মহাসড়কে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। সেইসঙ্গে প্রতিনিয়তই সড়কে ঝরছে প্রাণ।
ট্রাক ও বাস চালকরা বলছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মীরসরাই অংশে ইউটার্ন নেওয়ার সময় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে ইউটার্ন নেওয়ার জন্য পৃথক লেন না থাকায় যানবাহনগুলোকে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে ছোট যানবাহনের চলাচল যুক্ত হয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
মীরসরাই পৌরসভার বাসিন্দা মো. নুরুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মীরসরাই পৌরসভা বাজারের ইউটার্নে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে মহাসড়কে নিষিদ্ধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল করছে। এসব যানবাহন উল্টো পথে চলতে গিয়েও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।’
একাধিক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশে বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে দুইজন নিহত হন। এ ঘটনায় আরও তিনজন গুরুতর আহত হন। গত ৭ অক্টোবর একই মহাসড়কের সাতকানিয়া থানাধীন নয়াখাল পাঠানী পুলের দক্ষিণ পাশে বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে দুই জন নিহত হন। আহত এক যাত্রীকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়ায় মাইক্রোবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে অটোরিকশার তিন যাত্রী গুরুতর আহত হন। এ ছাড়া গত ২৭ ফেব্রুয়ারি একই মহাসড়কের লোহাগাড়ার আধুনগর এলাকায় অটোরিকশা ও মিনি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত হন। এ ঘটনায় শিশুসহ সাতজন আহত হন।
গত ২৮ মার্চ রাতে সীতাকুণ্ডের মডার্ন হাসপাতাল এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে একটি মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ছয়জন আহত হন। আর গত ৩১ মে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড বাজার এলাকায় বাস, ড্রামট্রাক, মাইক্রোবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত ও ২৫ জন আহত হন।
বৈধ অটোরিকশার বাইরে আরও ৫০ হাজার অবৈধ
চট্টগ্রাম অটোরিকশা ও অটো টেম্পো মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক টিটু চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে প্রায় ৬৩ হাজার বৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। এর মধ্যে নগরীতে ১৩ হাজার এবং জেলায় ৫০ হাজার। এর বাইরে নিবন্ধনবিহীন আরও ৫০ হাজার অবৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা নগর ও জেলায় চলাচল করছে। এ ছাড়া টমটম, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে আরও কয়েক লাখ।
তিনি বলেন, ‘তিন চাকার যানবাহন চলাচলে মহাসড়কে বিধিনিষেধ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। নেওয়া হচ্ছে না আইনগত ব্যবস্থা। এ কারণে ছোট যানবাহনের কারণে মহাসড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।’
বিধিনিষেধ মানছে না, বাড়ছে দুর্ঘটনা
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন না চলার ওপর বিধিনিষেধ থাকলেও সেগুলো চলছে। মহাসড়কে বাসের লেনে ননমোটর যানবাহনও চলাচল করছে। পৃথক কোনো সার্ভিস লেন নেই। এ কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নীরবতার কারণেও অবৈধ যানবাহনগুলো সড়ক-মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।’
একই কথা বলেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহাসড়কে অবৈধ তিন চাকার যানবাহন দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে। অথচ মহাসড়কে অধিকাংশ দুর্ঘটনার দায় পড়ছে বাসচালকের ওপর। খেয়াল করলে দেখবেন, মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টমটম, ব্যাটারিচালিত রিকশা—সবই চলছে। এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনের প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না।’
নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেই
দোহাজারী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল আবছার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দুর্ঘটনার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়ী এসব ছোট যানবাহন। কখন, কীভাবে চালাতে হয়, কোনও প্রশিক্ষণ নেই এসব যানবাহনের চালকদের। যে কারণে দুর্ঘটনার বড় কারণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ হলেও রাজনৈতিকসহ প্রভাবশালীদের কারণে আমরা পুরোপুরি অ্যাকশনে যেতে পারছি না।’