টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) উপজেলা মিলে সংসদীয় এ আসনটি গঠিত। টাঙ্গাইল সদর আসনের মতো জেলার রাজনীতিতে এ আসনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৩ আসন পেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও মধুপুর ও ধনবাড়ীর এ আসনটি হাতছাড়া হয়ে যায়। তখন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাবু মহেন্দ্র লাল বর্মণকে পরাজিত করেন জাসদ মনোনীত প্রার্থী আবদুস সাত্তার। এরপর থেকে এই আসনটি জয়ে আওয়ামী লীগের তেমন কোনও বেগ পেতে হয় না। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এই আসনে বিজয়ী হওয়ার পর থেকে আসনটি আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত। তবে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এই দুর্গ ভাঙতে বিএনপি মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এ আসনে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে লড়তে উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচন করবে বিএনপি। আলোচনায় উঠেছে আওয়ামী লীগ মনোনীত শক্তিশালী প্রার্থীর সঙ্গে লড়াই করার মতো বিএনপির উপযুক্ত প্রার্থী হচ্ছে নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপি’র সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফকির মাহবুব আনাম স্বপন। তবে সাধারণ মানুষের ধারণা, এবার এই আসনে একটি প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচন হবে। এই দুই প্রার্থী এ নিয়ে তিনবার ভোট যুদ্ধে মুখোমুখি হবেন। এছাড়াও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ড. আবদুর রাজ্জাক বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এ আসনে ড. আবদুর রাজ্জাক তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনি এলাকায় গণসংযোগ করছেন। অংশগ্রহণ করছেন বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন সাটিয়ে মধুপুর ও ধনবাড়ী উপজেলাবাসীকে শুভেচ্ছা জানানোর মাধ্যমে আলোচনায় আসার চেষ্টা করছেন। দলীয় মনোনয়ন পেতে জোর লবিং করছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানান, ড. আবদুর রাজ্জাক এবারও পাচ্ছেন নৌকার টিকেট। আওয়ামী লীগ এবারো তাকেই মনোনয়ন দেবেন এবং তিনিই বিজয়ী হবেন। তার সময়ে মধুপুর-ধনবাড়ীতে ব্যাপক উন্নয়নের কথা স্বীকার করেন তারা।
ধনবাড়ীতে ৫০ শয্যা হাসপাতাল, মডেল উপজেলা ও থানা ভবন, ফায়ার সার্ভিসসহ নানা উন্নয়নের কথা বলে তারা জানান, সিদ্দিকী ও খান পরিবার কোণঠাসা হয়ে পড়ায় ড. আবদুর রাজ্জাকই কেন্দ্রীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বর্তমানে আওয়ামী রাজনীতির টাঙ্গাইলের অভিভাবক। এ আসনে তার বিকল্প প্রার্থী নেই বলেও জানান বেশিরভাগ দলীয় নেতাকর্মীরা।
বিএনপির বেশকয়েকজন নেতাকর্মী জানান, বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক বৃহৎ রাজনৈতিক দল। দলে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকতেই পারেন। তবে দল থেকে ফকির মাহবুব আনাম স্বপন মনোনয়ন পাচ্ছেন। তাদের ধারণা, খালেদা জিয়া দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করবেন। আর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ফকির মাহবুব আনাম স্বপন জয়লাভ করবে।
আওয়ামী লীগ: ড. আবদুর রাজ্জাক ছাড়াও মনোনয়নের প্রত্যাশায় মাঠে আছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক শামসুন নাহার চাঁপা। এছাড়াও মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান ছরোয়ার আলম খান আবু, আওয়ামী লীগ নেতা ডা. সানোয়ার হোসেন, কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মিজানুর রহমান মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে।
বিএনপি: ফকির মাহবুব আনাম স্বপন ছাড়াও মধুপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তিনবারের সাবেক পৌর মেয়র শহিদুল ইসলাম সরকার শহীদ, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী ও সাবেক এমপি সৈয়দা আশিক আকবর মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।
অপরদিকে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) মধুপুর উপজেলা শাখার সভাপতি এস এম এ হান্নান ইস্পাহানী, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে চলচ্চিত্রকার নূরুল ইসলাম রাজ এবং জাতীয় পার্টি জেপির (মঞ্জু) প্রেসিডিয়াম সদস্য আবু সাইদ খান মনোনয়ন চাইবেন বলে নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন।
এছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধুপুর উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি মাওলানা জহিরুল ইসলাম দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা, ডাকসুর সদস্য ও সাবেক এমপি খন্দকার আনোয়ারুল হক এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপি বলেন, বিগত নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমার নির্বাচনি এলাকা ধনবাড়ী ও মধুপুরে ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। ধনবাড়ীতে মডেল উপজেলা ভবন, ৫০ শয্যার হাসপাতাল, থানা ভবন, ফায়ার সার্ভিস, প্রাণী হাসপাতাল, বিদ্যুত, সড়ক নির্মাণ, মধুপুরে ৭২ হাজার মে.টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন অত্যাধুনিক সাইলো নির্মাণ, মধুপুর অডিটরিয়ামসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। ধনবাড়ী ও মধুপুর উপজেলার প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি। বিপুল এই উন্নয়নের সুফল পাচ্ছে মধুপুর-ধনবাড়ীর প্রতিটি মানুষ। মধুপুর-ধনবাড়ী এখন উন্নয়নের রোল মডেল।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ফকির মাহবুব আনাম স্বপন বলেন, আমাদের নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নের মধ্যে দিয়েই আমরা সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছি। দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নির্দেশনা মেনে কাজ করছি। তিনি মূল্যায়ন করবেন। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারলে এ আসনে বিএনপি প্রার্থী অবশ্যই জয়ী হবে।
উল্লেখ্য, টাঙ্গাইল-১ আসনটি মধুপুর উপজেলার একটি পৌরসভা ও ছয়টি ইউনিয়ন এবং ধনবাড়ী উপজেলার একটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। নতুন তালিকা অনুযায়ী এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭শ’ ৪৭জন।








