গাজীপুরের কাপাসিয়ায় দুটি কারখানার অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য বিস্তীর্ণ এলাকার পরিবেশ দূষিত করছে বলে গ্রামবাসীর অভিযোগ। এ কারণে তাদের জীবন ও জীবিকা হুমকিতে বলে তারা জানান। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো হলো উপজেলার কেন্দুয়াবো, আমুরি, আদিয়াবো, উজুলী, আদিয়ারচালা ও কপালেশ্বর।
এলাকাবাসীর অভিযোগ করে বলেন, দূষিত বর্জ্যের কারণে গ্রামগুলোর শত শত একর কৃষি জমি বছরের পর আনাবাদি থাকছে। ফসল ফলাতে না পেরে কৃষকদেরও বছরের পর বছর লোকসান গুনতে হচ্ছে। এছাড়াও মাছির উপদ্রবে তারা অতিষ্ঠ। দুর্গন্ধে নাকে রুমাল চেপে চলাচল করতে হয়। শিক্ষার্থীদের দুর্গন্ধের মধ্যেই ক্লাস করতে হয়। জলাশয়গুলোতে জলজ প্রাণী একদম নেই বললেই চলে। বাধ্য হয়ে অনেকে বসতভিটা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছেন। এসবের জন্য ডায়মন্ড এগ লিমিটেড ও প্রোটিন হাউস নামে দুটি মুরগির খাদ্য, বাচ্চা ও ডিম উৎপাদনকারী কারখানা দায়ী।
সরেজমিন কাপাসিয়ার কেন্দুয়াবো, বড়চালা, আমুরি, আদিয়াবো, বীর উজুলী, আদিয়ারচালা, কপালেশ্বর গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আবাদি জমিগুলোর পানির ওপর মুরগির বর্জ্যের কালো স্তর পড়ে আছে। ময়লা থেকে বুদ বুদ উঠছে আর চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
কেন্দুয়াবো গ্রামের রাজু মিয়ার স্ত্রী সাজেদা বেগম বলেন,‘ডায়মন্ড এগ লিমিটেডে’র লোকজন মরা মুরগি ও বিভিন্ন ধরনের ময়লা বাড়ির পাশে উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রেখে যায়। মাছির জন্য দরজা জানালা বন্ধ করে রাখতে হয়। তারা জোর করে জমি কেনার জন্যই আমাদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ করছে।’
তিনি আরও জানান,পরিবেশ দূষণের কারণে তার ছোট ভাই আব্দুস ছাত্তার বাধ্য হয়ে পরিবার নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। সে পাশের এলাকায় টিনের ছাপড়া ঘর তৈরি করে বসবাস করছেন।
কেন্দুয়াবো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমরান, শাহ পরান, মিনহাজ জানায়, বাড়িতে বসেও দুর্গন্ধ, স্কুলে যেতেও দুর্গন্ধ, যতক্ষণ স্কুলে থাকে ততক্ষণও দুর্গন্ধে থাকতে হয়।
কেন্দুয়াবো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘কারখানার বর্জ্য পরিবহনের সময় গাড়ি থেকে পড়ে পুরো রাস্তা সয়লাব হয়ে যায়। যতদূর যায়, ততদূর পর্যন্ত দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। দুর্গন্ধের কারণে ক্লাস নিতে খুব অসুবিধা হয়।’
কেন্দুয়াবো গ্রামের আব্দুস সোবাহানের ছেলে কৃষক চাঁন মিয়া বলেন,‘বাড়ির আশপাশের ও গ্রামের সব ডোবা নালার পানি নোংরা হয়ে গেছে। এ পানির কারণে তিন বছর ধরে জলাশয়ে কোনও মাছ পাওয়া যায় না। ফসলও হয় না। এবার ৮ বিঘা জমিতে বর্গা চাষ করেছিলাম। ধানের চারা, সার, পানি সব মিলিয়ে ৬৫ হাজার টাকা খরচ করেছি। একটা ধানও পাইনি। আমি একদম পথে বসে গেছি।’
কছুরত আলীর ছেলে কৃষক আমিনুল হক বলেন,‘মুরগির বর্জ্যের কারণে গবাদিপশুর জন্য খড় সংগ্রহ করতে পারিনি। গরু চড়ানোর মতো কোনও জায়গাও এখন গ্রামে নেই। আমার মতো সব কৃষক এখন গবাদিপশুর খাদ্য সংকটে ভুগছেন। ’
স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মীরা জানান, ডায়মন্ড পোল্ট্রি ও প্রেটিন হাউসের অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য নিষ্কাশনের ফলে মানুষের জ্বর, ঠাণ্ডা, শ্বাসকষ্ট লেগেই আছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে এরকম রোগী আছে। গবাদিপশুও ভাইরাসজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত খলিলুর রমানের ছেলে মো. আশরাফুল বলেন,‘গত বছর ডায়মন্ড ও প্রোটিন হাউস কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলে কমপক্ষে ৫০ জন কৃষকের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে আর আসেনি। ’
গাজীপুর পরিবেশ অধিদফতরের পরিদর্শক শেখ মোজাহিদ বলেন, ‘এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিবেশ দুষণের সত্যতা পাওয়া গেছে। কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। আমরা এ ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঢাকা অফিসে পাঠাবো।’
অভিযোগ অস্বীকার করে কারখানাগুলোর তত্ত্বাবধায়ক আব্দুর রউফ বলেন, ‘জমিতে বর্জ্য ফেলে কি জমি কিনে নেওয়া যায়? ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে পরিবেশের যেন কোনও ক্ষতি না হয় সে ব্যাপারে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।’








