কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ পানান গ্রামে নামমাত্র মূল্যে লাখ টাকার পাকা ঘর করে দেওয়ার কথা বলে দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এক প্রতারক চক্র। তাদের প্রতারণার জালে জড়িয়ে অনেকেই আজ নিঃস্ব, দিশেহারা। এই প্রতারক চক্রের মূল হোতা মো. লোকমান (৩৮) পলাতক রয়েছেন। তিনি দক্ষিণ পানান গ্রামের বাসিন্দা।
সরেজমিনে গিয়ে কথা বলে জানা যায়, গ্রামের বয়োবৃদ্ধ দয়াল তালুকদার (৮০) তার বিধবা পোষাকশ্রমিক মেয়ের জন্য একটি ঘর নির্মাণে টাকা দিয়েছিলেন লোকমানকে। কিন্তু মেয়ের ঘর এখনও নির্মাণ করা হয়নি। ভাবতেও পারেননি শেষ বয়সে এভাবে প্রতারিত হবেন তিনি। তাকে কেবল আংশিক ভিটে ও কয়েকটি পিলার তুলে দিয়েছিল লোকমান। দয়ালের মতো ৮০ বছর বয়সী এংরাজের মাও ঘর পাননি। তিনিও টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন। শুধু দয়াল কিংবা এংরাজের মা নন, গ্রামের কেউই বাদ পড়েননি তার প্রতারণার হাত থেকে।
দয়াল তালুকদার ও এংরাজের মা জানান, তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে লোকমান। সে তাদের ১৫ দিনের মধ্যে ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
দক্ষিণ পানান গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহাব উদ্দিন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। তিনি জানান, মাস ছয়েক আগে নিজ এলাকার লোকজনকে টার্গেট করে লোকমান প্রতারণার জাল ছড়িয়ে দেয় পুরো গ্রামে। ঘোষণা দেয় গরিবদের নামমাত্র টাকায় দেওয়া হবে লাখ টাকার ঘর। এই লোভে শত শত হতদরিদ্র মানুষ টাকা নিয়ে হাজির হয় তার কাছে। ঘরপিছু আট থেকে ৩০-৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেন লোকমান ও তার লোকজন। শুরুতে অনেকের ভিটে নির্মাণ তৈরি করে দিয়ে আস্থা অর্জন করে সে। ঘর বানিয়েও দেওয়া হয় দু-একজনকে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পানান ও আশপাশের এলাকার হাজারখানেক মানুষের দেওয়া প্রায় দুই কোটি টাকা নিয়ে হঠাৎ পালিয়ে যায় লোকমান।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মালেক খোকন ঘটনাটি প্রতারণা উল্লেখ করে বলেন, এলাকার লোকজনকে বাধা দেওয়া হলেও তারা আমার কথা শুনেনি। যারা বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছে, তাদের এড়িয়ে চলেছে ঘর প্রত্যাশিরা।
মধ্যবয়সী নারী ফাতেমা আক্তার জানান, তার একটি ঘরের প্রয়োজন ছিল। লোকমানের লোভে পড়ে ঋণ করে ২০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন তাকে। টাকা দেওয়ার আগেই সে বাড়িতে ৫০০ ইট পাঠিয়ে দেয়। এসব দেখে তার প্রতি আরও বিশ্বাস বেড়ে যায় লোকজনের। আর এভাবেই দেখাদেখি প্রতারণার ফাঁদে ধরা দেয় স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা জানায়, লোকমান একা নয়, তার প্রতারণার কাজে স্থানীয় কিছু লোককেও সে ব্যবহার করে। মুক্তার হোসেন তাদেরই একজন। তিনি বলেন, আমি মানুষের চাপে এখন বাড়িতে থাকতে পারি না। আমার আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে নিজের গ্রাম এমনকি আশপাশের লোকজনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছি। এভাবে মোট ১০৬ জনের কাছ থেকে ঘরের জন্য টাকা নিয়ে লোকমানকে দিয়েছি। প্রায় ১৫ লাখ টাকা আমি নিজের হাতে তাকে দিয়েছি। অবস্থা এমন হয়েছে যে আমি পালিয়ে থেকে বাঁচতে পারছি না।
অভিযুক্ত সেই লোকমানের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার স্ত্রীকে পাওয়া গেলেও তিনি সাংবাদিক দেখে দৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজার বন্ধ করে দেন। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাদের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। লোকমানের ফোন নম্বরে ফোন দিলেও সে ফোন ধরেনি।
এ বিষয়ে হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সোনাহর আলীর বলেন, ‘লোকমানের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগগুলো তদন্ত করছে পুলিশ। কিশোরগঞ্জের আদালত একটি মামলা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে বলা হয়েছে। পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া অভিযোগেরও তদন্ত হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।’ তবে যখন ঘটনাগুলো ঘটে তখন কেউ পুলিশের শরণাপন্ন হয়নি।








