ঈদুল আজহার আরও ৯ দিন বাকি থাকলেও ইতোমধ্যেই দুই কোটি ৪৫ লাখ টাকায় ১১০টি গরু বিক্রি করেছেন এরশাদ উদ্দিন নামের কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের রৌহা গ্রামের এক খামারি। গরুগুলোর সাইজ বিবেচনায় দেড় থেকে চার লাখ টাকা দামে বিক্রি হয়েছে। তার খামারে আরও ৭০টি বড় আকারের গরু বিক্রির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
মাত্র ২০টি গরু দিয়ে শুরু করলেও এরশাদের খামারটিতে ২৫০টির মতো গরু-মহিষ রয়েছে। প্রাকৃতিক খাবার ব্যবহার করে মোটাতাজা করায় তার খামারের সুনাম দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে গত ২৩ জুন ‘একসঙ্গে ৬ কোটি টাকার গরু বিক্রি করবেন এরশাদ’ শিরোনামে একটি সংবাদও প্রকাশ হয়।
খামার মালিক এরশাদ উদ্দিন বলেন, সংবাদ প্রকাশের পর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অনেকেই খামারটি দেখতে আসছেন। অনেকে ফোনে যোগাযোগ করে ছবিও নিয়েছেন। ইতোমধ্যে আমার খামারের ১১০টি গরু দুই কোটি ৪৫ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। খামারে এসে গরু পছন্দ হওয়ায় কোরবানির জন্য এগুলো কিনেছেন ক্রেতারা। গরুগুলোর সাইজ বিবেচনায় দেড় থেকে চার লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আরও ৭০টি বড় আকারের গরু বিক্রির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অনেকেই যোগাযোগ করছেন আশা করছি, সেগুলোও ভালো দামে বিক্রি হবে। এখন বিক্রি হওয়া গরুগুলো ডেলিভারি দেওয়ার কাজ চলছে।
খামার ব্যবসার আগে রাজধানী ঢাকায় নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন এরশাদ উদ্দিন। করোনা শুরু হলে ব্যবসায় কিছুটা মন্দা দেখা দেওয়ায় তিনি গ্রামের বাড়িতে খামার গড়ে তোলেন। গত বছর নিজের জায়গায় শখের বসে একটি টিনশেড তৈরি করে ২০টি গরু দিয়ে শুরু করেন গরু মোটাতাজা করার প্রকল্প। শখের বসে শুরু হলেও খামারের সাফল্য দেখে তার উৎসাহ আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে খামারের পরিধি বড় হওয়ার পাশাপাশি এটি একেবারে বাণিজ্যিক খামারে পরিণত হয়েছে। এর প্রাতিষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘জেসিএগ্রো’।
এরশাদের খামার থেকে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধব মিলে ঢাকার নিয়ামত হোসেনই কিনেছেন ৪২টি গরু। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধব মিলে একসঙ্গে ৪২টি গরু কিনেছি। এত ভালো মানের গরু দেখেই আমাদের পছন্দ হয়েছে। প্রথমে খামারে গিয়ে আমরা ২৫টি গরু কিনেছি। পরে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এরশাদের কাছ থেকে ছবি নিয়ে বাকিগুলো কিনেছি। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে খামারটিতে পশু মোটাতাজা করা হয়, তা নিশ্চিত হয়েই তার কাছ থেকে কিনেছি। সবচেয়ে বড় কথা, খুব একটা দরদাম করতে হয়নি।
বিভিন্ন সূত্রে খবর পেয়ে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আরাফাত হোসেন জনি ও মো. সারোয়ার এই খামার থেকে ৫২ লাখ টাকায় ২৫টি গরু কিনেছেন। আরাফাত হোসেন জনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত বছর এরশাদের খামার থেকে আমরা আটটি গরু কিনেছিলাম। সেই গরুগুলো অত্যন্ত সুন্দর ও সুস্বাদু ছিলো। এজন্য এবারও কোরবানির জন্য প্রথমেই এরশাদ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ভাই-বোন, আত্মীয় ও বন্ধুরা মিলে এবার ২৫টি গরু কিনেছি। আজ সেগুলো ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. হালিম মিয়া জানান, খামারের গরু-মহিষকে ভুট্টা দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি প্রাকৃতিক খাবার সাইলেস খেতে দেওয়া হয়। আর এ সাইলেস বাজার থেকে কেনা হয় না, কৃষকদের কাছ থেকে গাছসহ ভুট্টা কিনে খামারেই বানানো হয়। ফলে এসব প্রাণী লালন-পালনেও খরচ পড়ছে অনেক কম। আর এখানকার কর্মীরাও অনেক দক্ষ। অসুখ-বিসুখে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সহযোগিতা নেওয়া ছাড়াও খামারের প্রশিক্ষণপ্রাপ্তকর্মীরা প্রাথমিক চিকিৎসার কাজটা সামাল দেন।
খাবারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকা মো. সাইদ আল সাহাব জানান, খামারে বর্তমানে ১৫০টি ষাঁড়, ৪০টি মহিষ ও ৬০টি গাভি রয়েছে। সবচেয়ে বড় ৯০০ কেজি ওজনের ষাঁড়টির নাম রাখা হয়েছে ব্ল্যাক ডায়মন্ড। এখানে লাল, খয়েরি, সাদা ও কালো রঙের বিভিন্ন জাতের ষাঁড় রয়েছে। এগুলোর মধ্যে দেশি ছাড়াও ব্রাহামা, শাহীওয়াল, হারিয়ানা, গয়াল, নেপালি, ইন্ডিয়ানবইল উল্লেখযোগ্য। খামারে সবচেয়ে কম ওজনের গরুটিও ৪০০ কেজি। এগুলো ছয় মাস থেকে এক বছর ধরে পোষা হচ্ছে খামারে।
স্থানীয়রা জানান, এই খামার দেখে উৎসাহিত হচ্ছেন তারা। অনেকে খামার পরিদর্শন করে কীভাবে শুরু করা যায়, এর পরামর্শ নিচ্ছেন। এলাকায় আগে ভুট্টা চাষ তেমন হতো না, এ খামারকে ঘিরে কৃষকরা ভুট্টা চাষেও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। সবমিলিয়ে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ করে দিয়েছে খামারটি।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমি ওনার খামারটি পরিদর্শন করেছি। খুবই সুন্দর ও পরিপাটিভাবে গোছানো একটি খামার। আমাদের পক্ষ থেকে খামারের সার্বিক খোঁজখবরও রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি খামারের কর্মীদেরকেও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অর্গানিক পদ্ধতিতে দেশীয় শংকর জাতের গরু-মহিষ লালনপালন লাভজনক। পাশাপাশি এগুলোর মাংসও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ।








