X
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪
৯ শ্রাবণ ১৪৩১
আ.লীগ অফিসে বোমা হামলার ২৩ বছর

খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ময়নাতদন্তের রিপোর্ট

আরিফ হোসাইন কনক, নারায়ণগঞ্জ
১৬ জুন ২০২৪, ১৮:০২আপডেট : ১৬ জুন ২০২৪, ১৮:০২

আজ ১৬ জুন। ২০০১ সালের এই দিনে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় ২০ জন প্রাণ হারান। পঙ্গুত্ব বরণ করেন জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি চন্দনশীল সহ আরও অনেকে। যারা আজও দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। তবে দীর্ঘ ২৩ বছরেও মামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি। সাক্ষীদের অনীহাসহ নানা কারণে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে। এদিকে বোমা হামলায় নিহতদের ময়নাতদন্তের রিপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে না বলে ক্ষোভ ঝাড়েন মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমানও অফিসে উপস্থিত ছিলেন। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলে ১১ জন ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর ৯ জন মারা যান। সবমিলিয়ে মোট ২০ জন প্রাণ হারান। এর মধ্যে ১৯ জনের পরিচয় জানা যায়। এক নারীর পরিচয় মেলেনি।

নিহতরা হলেন- তৎকালীন শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সাইদুল হাসান বাপ্পি, সরকারি তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস আকতার হোসেন ও তার ভাই সংগীতশিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু, সংগীতশিল্পী নজরুল ইসলাম বাচ্চু, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, নারায়ণগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ বি এম নজরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ মোল্লা, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী পলি বেগম, ছাত্রলীগ কর্মী স্বপন দাস, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, পান-সিগারেট বিক্রেতা হালিমা বেগম, সিদ্ধিরগঞ্জ ওয়ার্ড মেম্বার রাজিয়া বেগম, যুবলীগ কর্মী নিধু রাম বিশ্বাস, আব্দুস সাত্তার, আবু হানিফ, এনায়েতউল্লাহ স্বপন, আব্দুল আলীম, শুক্কুর আলী, স্বপন রায় ও অজ্ঞাত এক নারী।

হামলায় গুরুতর আহত হন শামীম ওসমানসহ অর্ধশতাধিক লোক। চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি চন্দন শীল ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রতন দাস।

বোমা হামলার পর দিন খোকন সাহা বাদী হয়ে জেলা বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে প্রধান করে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের মোট ২৭ জনকে আসামি করে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় দুটি মামলা (একটি বিস্ফোরক ও অন্যটি হত্যা) দায়ের করেন।

ঘটনার দীর্ঘ ২৩ মাস পর ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে মামলা দুটির ফাইনাল রিপোর্টে বলা হয়, উল্লিখিত ২৭ জনের কেউই চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় জড়িত নন। যদি ভবিষ্যতে এই মামলার তথ্যসংবলিত ক্লু পাওয়া যায়, তবে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর মামলাটি হিমাগারে থাকার পর সিআইডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ২ জুন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্রপক্ষকে আদেশ দেন।

তবে একই ঘটনায় আরেকটি মামলা হয়েছিল। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই ঘটনায় নিহত চা দোকানি হালিমা বেগমের ছেলে আবুল কালাম বাদী হয়ে শামীম ওসমান (বর্তমান এমপি), তার ভাই নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমানসহ (বর্তমান এমপি) আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও এর সহযোগী সংগঠনের ৫৮ নেতাকর্মীকে আসামি করে একটি মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত মামলাটি খারিজ করেন।

আগের করা দুটি মামলায় ১৪ বছরে সাতবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন এবং ১৩ বছর পর দুটি মামলায় ২০১৩ সালের ২ মে ছয় জনকে অভিযুক্ত ও ৩১ জনকে অব্যাহতি দিয়ে নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দুটি মামলার প্রত্যেকটির ৯৪৭ পাতার চার্জশিট দাখিল করা হয়।

এতে মামলা থেকে তৈমুর আলম খন্দকারসহ ৩১ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। মামলায় ছয় জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছেন- নারায়ণগঞ্জে ক্রসফায়ারে নিহত যুবদল কর্মী মমিনউল্লাহ ডেভিডের ভাই শাহাদাতউল্লাহ জুয়েল, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান, ওবায়দুল্লাহ রহমান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু, ভারতের দিল্লি কারাগারে আটক সহোদর আনিসুল মোরসালিন ও মুহিবুল মোত্তাকিন।

আসামিদের মধ্যে ২০১৭ সালে হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানের অপর একটি মামলায় ফাঁসির রায় কার্যকর হয়। দুই সহোদর আনিসুল মোরসালিন ও মুহিবুল মোত্তাকিন ভারতের দিল্লি কারাগারে বন্দি, ওবায়দুল্লা রহমান ও কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু জামিনে রয়েছেন। কাশিমপুর কারাগারে রয়েছেন শাহাদাৎ উল্লাহ জুয়েল।

এদিকে মামলার ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নেই বলে ক্ষোভ ঝাড়েন মামলার বাদী ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সম্প্রতি এই মামলায় চার্জশিটের সঙ্গে আনুষঙ্গিক কাগজপত্র দেওয়া হয়নি বলে বিচারকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। মূলত ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নেই। এমপি শামীম ওসমানের শরীরে (ইনজুরি) আঘাতের সার্টিফিকেট, চন্দনশীল ও রতনের দু-পা হারানোর কাগজপত্র নেই। তবে আদালত দেখেছেন, তাদের অঙ্গহানি হয়েছে। বিচারের ম্যাটেরিয়ালে (আলামত) আছে। সাক্ষীদের অনেকে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে অনেক সাক্ষীকে এখন আমরা খুঁজে পাচ্ছি না।

মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালত তলব করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চার্জশিটের সঙ্গে মামলার আনুষঙ্গিক কাগজপত্র না থাকায় গত মে মাসে আদালত প্রথম আইওকে (তদন্ত কর্মকর্তা) (এএসপি আমিনুল ইসলাম) তলব করেছেন। আগামী তারিখে সে না এলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে হয়তো প্রথম আইও এ কাজ করেছে। একইভাবে পরের আইও পাশ কাটিয়ে গেছে। তবে আশা করি, আর কয়েকজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিলেই মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হবে।

আওয়ামী লীগ নেত্রী পলি বেগম বোমা হামলায় মারা যাওয়ার পর আর্থিকভাবে দৈন্যদশার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন তার বড় মেয়ে রুমা বেগম ও পরিবারের সদস্যরা। রুমা বেগম বলেন, বাবার মৃত্যুর পরে পরিবারের অর্থের জোগান দিতেন মা পলি বেগম। তবে ২০০১ সালে বোমা হামলায় মায়ের মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা সবাই অর্থ সংকটে ভোগেন। তবে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে মায়ের হত্যার বিচার না পেয়ে দুঃখ অনেকাংশে বেড়েছে। এদিকে আমার স্বামী মারা গেছে। আমিও লিভারের রোগী। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। এ ছাড়া টাকার অভাবে মেয়ের বিয়ে দিতে পারছি না। তিনি প্রধানমন্ত্রীসহ সবার কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন।

বোমা হামলার ঘটনায় পঙ্গুত্ববরণ করা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি চন্দনশীল বলেন, এই ঘটনার পেছনে মাস্টারমাইন্ডদের খুঁজে বের করার দাবি জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে এই মামলার আসামি মোরসালিন ও মোত্তাকিন ভারতের একটি কারাগারে বন্দি রয়েছে। তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (কৌঁসুলি) মনিরুজ্জামান বুলবুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আলোচিত এই মামলায় ১০৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ২২ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে অনেক সাক্ষীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মামলার সাক্ষী পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। অনেক সাক্ষী মারা গেছে অথবা স্থানান্তর হয়ে গেছে। এই মামলার অনেকগুলো আইও (তদন্ত কর্মকর্তা) বদল হয়েছে। তবে বর্তমানে মামলার ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো মামলার কোনও আইও’র কাছে এই রিপোর্টটি রয়েছে। তবে এটা সমস্যা হবে না। কারণ ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ফটোকপি সত্যায়িত করে কাজ চালানো যাবে।

/এফআর/
সম্পর্কিত
কোটা আন্দোলন ঘিরে নারায়ণগঞ্জে ৫ দিনে যা ঘটেছে
কোটা আন্দোলনে কুড়িগ্রামে ৩ জন নিহতের দাবি
নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত অন্তত ১৮
সর্বশেষ খবর
কূটনীতিকরা স্তম্ভিত, বলেছেন বাংলাদেশের পাশে আছেন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
কূটনীতিকরা স্তম্ভিত, বলেছেন বাংলাদেশের পাশে আছেন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
সংঘাতে ডিএনসিসির ২০৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি
সংঘাতে ডিএনসিসির ২০৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি
নাটকীয় হারে আর্জেন্টিনার অলিম্পিক যাত্রা শুরু
নাটকীয় হারে আর্জেন্টিনার অলিম্পিক যাত্রা শুরু
‌‌‘আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে নিয়ে নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে বিএনপি-জামায়াত’
‌‌‘আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে নিয়ে নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে বিএনপি-জামায়াত’
সর্বাধিক পঠিত
ধারণা ছিল একটা আঘাত আসবে: প্রধানমন্ত্রী
ধারণা ছিল একটা আঘাত আসবে: প্রধানমন্ত্রী
চাকরিতে কোটা: প্রজ্ঞাপনে যা আছে
চাকরিতে কোটা: প্রজ্ঞাপনে যা আছে
কোটা নিয়ে রায় ঘোষণার আগে যা বলেছিলেন প্রধান বিচারপতি
কোটা নিয়ে রায় ঘোষণার আগে যা বলেছিলেন প্রধান বিচারপতি
কোটা আন্দোলন: প্রধানমন্ত্রীর বর্ণনায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র 
কোটা আন্দোলন: প্রধানমন্ত্রীর বর্ণনায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র 
কারফিউ বা সান্ধ্য আইন কী 
কারফিউ বা সান্ধ্য আইন কী