নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার তিন ভাতিজার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার, দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অনুসন্ধানের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি আবেদন করা হয়েছে। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) মো. ওয়াদুদ নামে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের এক ভুক্তভোগী ব্যক্তি এ আবেদন করেছেন। বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন ওয়াদুদ নিজেই।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, নারায়ণগঞ্জ-৩ সংসদীয় আসনের সাবেক এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার ভাতিজা আহমেদ হোসেন হিরু, মো. শামীম মিয়া ও মো. জাবেদ হোসেন নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে বিগত সরকারের আমলে কয়েক হাজার কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের মালিক হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে এসব ব্যক্তি বিভিন্ন অপরাধমূলক ও দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলেও ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না। তাদের বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত এবং তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আহমেদ হোসেন হিরু আওয়ামী লীগ কর্মী ইকবালের মাধ্যমে জাহাজ ডাকাতি করে এনে তা কেটে (স্ক্র্যাপ) বিক্রি করেন। এ ছাড়া ডাকাতি করা জাহাজের ভুয়া কাগজ বানিয়ে রেজিস্ট্রেশন নম্বর পরিবর্তন করার মাধ্যমে তা বিক্রি করেন। সম্প্রতি খবির হাওলাদার নামে এক জাহাজ ব্যবসায়ীর জাহাজ ভাড়ায় এনে তা বিক্রি করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সোনারগাঁ উপজেলার মোগড়াপাড়া এলাকায় হিরু ও তার ভাইয়েরা আওয়ামী সরকারের সময় থেকে ‘ঈসা খাঁ রিসোর্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছেন। যেখানে মাদক সেবন ও বিক্রি এবং জুয়ার আসর পরিচালনা করা হতো। সম্প্রতি বিষয়টি জানাজানি হলে রিসোর্টটিতে একটি বাফেট লাউঞ্জ চালু করা হয়। তবে এখনও প্রতিষ্ঠানটিতে ক্ষুদ্র পরিসরে অবৈধ কর্মকাণ্ড চলে। হিরুর ছেলে শাহেদ বাহিনী গড়ে এসব পরিচালনা করছেন। শাহেদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। শাহেদ এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে আতঙ্ক।
আবেদনকারী আরও উল্লেখ করেন, হিরু ও তার ভাইদের নিয়ন্ত্রণে অন্তঃজেলা একটা ডাকাত বাহিনী আছে। যারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত ডাকাতি করে। এ ছাড়া হিরুদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে এসব ডাকাত দিয়ে প্রকাশ্যে ওই ব্যক্তির ওপর হামলা চালায়। তাই ভয়ে এলাকার কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে না। হিরুর এক নিকট আত্মীয় জেলায় মাদকব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। বিগত সরকারের আমলে তার মালিকানাধীন জাহাজ মাদকসহ আটক হলে মোটা অংকের মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া হিরুর ছোট ভাই শামীম হোসেনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও দেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে। লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি থাকা অবস্থায় প্রভাব খাটিয়ে হিরু ও তার ভাইরা বহু মানুষের জমি জোরপূর্বক দখল করেন। “লিজা পাম্প” নামে একটি পেট্রোল পাম্প দখল করে সেখানে ও সরকারি সড়কের ওপর অবৈধ বাজার বসিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার উচ্ছেদ করলেও পুনরায় অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে দোকান বসিয়েছেন।।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, হিরুর ভাই জাবেদ তার অবৈধ সম্পদ গোপন রাখার উদ্দেশ্যে কর্মচারী ও ঘনিষ্ঠজনদের নামে জমি ক্রয় করেন এবং পরবর্তীতে সেগুলো নিজ স্ত্রী বা অন্যদের নামে হস্তান্তর করেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া জাবেদ যেসব মোবাইল সিম ব্যবহার করেন তার সবগুলো অন্য কোনো ভুয়া ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রেশনকৃত। যার ফলে তার অবৈধ কর্মকাণ্ড নিরাপদে পরিচালনা করতে সক্ষম হন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত আহমেদ হোসেন হিরু বলেন, ‘আমাদের দল ক্ষমতায় নেই। তাই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এসব অভিযোগ মিথ্যা।’
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জকেন্দ্রিক কিছু ডাকাত ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধী আছে। এ বিষয়ে যে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, সেটি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিবুল্লাহ বলেন, ‘সোনারগাঁ থানা পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করতে তৎপর রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংগঠিত করার প্রমাণ মিলছে তাদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত আছে।’









