গৃহপরিচারিকা নির্যাতন, স্ত্রীসহ বিমানের এমডি কারাগারে

‘শরীরে দিতো গরম খুন্তির ছ্যাঁকা, আটকে রাখতো বাথরুমে’

রায়হানুল ইসলাম আকন্দ, গাজীপুর
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:৪৪ আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:০০

প্রায় তিন বছর বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় মেয়েটির মা মারা যায়। এরপর কিছু দিন দাদির কাছে বেড়ে ওঠা। পরে এক প্রতিবেশী নিয়ে সাত বছর লালন-পালন করেন। কিন্তু আর্থিক সংকট ও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সাত মাস আগে মেয়েকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমানের বাসায় কাজে দেন বাবা। তারা বলেছিল মেয়ের বিয়েসহ যাবতীয় খরচ দেবে। অথচ কাজে এসে এই পরিবারের সদস্যদের নির্মম নির্যাতনে মেয়েটি এখন হাসপাতালে শয্যাশায়ী। তার শরীরজুড়ে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার চিহ্ন। ১১ বছরের মেয়েটিকে এভাবে তিন-চার মাস ধরে নির্মম নির্যাতন করেছেন বিমানের এমডির স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা।

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টায় গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সামনে এসব কথা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান মেয়েটির বাবা। হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে বর্তমানে মেয়েটি চিকিৎসাধীন। সার্জারি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে শিশুটি। গলা, পিঠ, হাত, পা-সহ শরীরের প্রায় সব জায়গায় পোড়া দাগ। গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। ঠিকমতো কথা বলতেও পারে না। 

মেয়েটির বাবার বাড়ি পঞ্চগড় সদর উপজেলায়। গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী এলাকায় মেয়েকে নিয়ে থেকে বাবা একটি হোটেলে শ্রমিকের কাজ করতেন। তিন বছর বয়সে মা মারা যায়। এরপর বিয়ে করেনি তার বাবা। ছিল দাদির কাছে। পরে প্রতিবেশীর বাড়িতে কাজে দেন। সেখান থেকে পরিচিত একজনের মাধ্যমে বিমানের এমডির বাসায় কাজে দেন বাবা।

মেয়েটির বাবা জানান, গত ৩১ জানুয়ারি দুপুরে বিমানের এমডির স্ত্রী ফোন করে জানান তার মেয়ে অসুস্থ, তাকে নিয়ে যেতে হবে। দুপুরে বাবা ওই বাসায় গিয়ে অপেক্ষা করেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাড়ির বাইরে এসে মেয়েকে তার কাছে বুঝিয়ে দেন এমডির স্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘তখন দেখি মেয়ের দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম। আঘাতের চিহ্ন, পোড়া দাগ। মেয়ে কান্না করছিল। কীভাবে এমন হলো জানতে চাইলে বিমানের এমডির স্ত্রী বলেন এলার্জিতে এমন হয়েছে। পরে মেয়ে বিস্তারিত খুলে বলেন। সেদিন ওই অবস্থায় মেয়েকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি।’

শিশুটির বাবার ভাষ্য, ‘গত বছরের জুনে বিমানের এমডির বাসার নিরাপত্তা প্রহরী জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে উত্তরার একটি চায়ের দোকানে আমার পরিচয় হয়। জাহাঙ্গীর আমাকে জানান, এমডির বাসায় কাজের মেয়ে লাগবে। তখন আমার মেয়ের কথা জানাই। তখন বলে নিয়ে আসেন, এমডির স্ত্রী খুব ভালো মানুষ। কয়েক দিন পর মেয়েকে ওই বাসায় নিয়ে যাই। তখন এমডির স্ত্রী আমাকে বলেন কী হিসেবে মেয়েকে দিবা? কন্ট্রাক্ট দিবা? তখন বলি কন্ট্রাক্ট দেবো না। মেয়ের ভবিষ্যতে বিয়েশাদিতে খরচ লাগবে। তা দিলেই হবে। পরে তিনি বলেন মেয়েটির বিয়েসহ যাবতীয় খরচ দেবেন। এতে রাজি হয়ে গত বছরের জুন মাসে কাজে দিই। সর্বশেষ গত ২ নভেম্বর মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আসি। এরপর আরও কয়েকবার গেলে নানা অজুহাতে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। প্রতিবার বাড়ির সামনে থেকে চলে আসি।’  

মেয়েটির বাবা বলেন, ‘৩০ জানুয়ারি এমডির স্ত্রী আমাকে ফোন দিয়ে বলেন মেয়েকে নিয়ে যাও। সেদিন দুপুরে আমার মাকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বাসায় যাই। এমডির স্ত্রী তখন বাসায় ছিল না। দারোয়ানকে বলি আমাদের আসতে বলেছেন ম্যাডাম। দারোয়ান বলেন ম্যাডাম বাসায় নেই। আমি জানতাম তুমি আসবা। বিকালে ম্যাডাম বাইর থেকে এসে সরাসরি বাসার ছয়তলায় যান। পরে হাতে সাদা একটা কাগজ নিয়ে সন্ধ্যায় নিচে নামেন। আমাকে ওই সাদা কাগজে সাইন দিতে বলেন। পরে মেয়েকে বুঝিয়ে দেন। মেয়েকে দেখে বলি ম্যাডাম এ রকম হলো কেন? তখন বলে বাথরুমে পড়ে এ রকম হয়েছে। শরীরে চুলকানি হয়েছে। ম্যাডাম বলেন, একটা ঠিকানা দিই, সেখানে কবিরাজের কাছে মেয়েকে নিয়ে যাও। তোমার মেয়ের মাথায় সমস্যা আছে। সাদা কাগজে সাইন দেওয়ার পর দারোয়ান এবং ম্যাডাম বলেন মেয়েকে বুঝে পাইছো? আমি বলি পাইছি। সাত মাসের মধ্যে আমাকে প্রথম দিন ছাড়া কোনোদিন বাসায় যেতে দেননি ম্যাডাম। গেলে বাসার নিচ থেকে দেখা করে চলে আসতে হয়েছে। উত্তরা থেকে বাসায় আসার পথে মেয়ে পুরো রাস্তায় শুধু বলেছে আব্বা আমি খাবো, খাবো। যা দিয়েছি তাই খেয়েছে। না খেয়ে রাখতো এবং মারধর করতো। সবসময় বাথরুমে রাখতো, এমনকি রাতেও থাকতো। তারা বড়লোক মানুষ, মেয়ের সঙ্গে এরকম করবে কল্পনাও করিনি।’ 

তিনি বলেন, ‘এটি অত্যাচার। আমি তাদের চার জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। তাদের শাস্তি চাই, কঠিন শাস্তি। যেন দেশের মানুষ দেখতে পারে। অন্যরাও যাতে সচেতন হয়ে যায়।’ 

শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন দেখিয়ে শিশুটি বাংলা ট্রিবিউন প্রতিনিধিকে জানায়, ম্যাডাম আমাকে নির্যাতন করেছে। শুরু থেকে প্রতিদিন মারধর করতো। সব কাজ করাতো। কিছু ভুল হলে শরীরে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দিতো। মাথার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলতো। সব সময় আমাকে বাথরুমে আটকে রাখতো। খাইতে দিতো না। ক্ষুধা লাগলেও ভয়ে খাবার চাইতাম না।

শিশুটি আরও জানায়, ম্যাডামকে মা বলে ডাকতাম। কোনও কাজ না পারলে কাজের বুয়াও মারধর করতো। তবে ম্যাডাম তার স্বামীর সামনে যাইতে দিতো না। এ জন্য মারধরের কথা স্যার জানতো না। স্যার বাসায় এলে আমাকে বাথরুমে আটকে রাখতো। স্যার কখনও মারেনি। আমি একটু একটু কাজ করতাম, ম্যাডামের বাবুকে দেখতাম। তরকারি কেটে দিতাম, ঘর মুছতাম। বাবুকে ঠিকমতো দেখি না, কাজ করি না এসব বলে আমাকে ছ্যাঁকা দিতো, লাঠি দিয়ে মারতো। বাথরুমের দরজা আটকে সারা দিন বসায়ে রাখতো। রাতেও সেখানে রাখতো।’

শিশুটির দাদি জানিয়েছেন, আট বছর পর্যন্ত নাতনিকে প্রতিবেশী ইসরাফিল তার বাসায় রেখে লালন-পালন করেছেন। সেখান থেকে নিয়ে বড়লোকের বাসায় দিয়েছিলাম ভালো থাকবে আশায়। এখন মারা যায় যায় অবস্থা। পুরো শরীরে আঘাতের চিহ্ন। কোমরে ঘা হয়ে গেছে। ঠিকমতো কথাবার্তা বলতে পারে না। আমরা যখনই তাকে দেখতে যেতাম, নানা কথা বলে, গালিগালাজ করে আমাদের তাড়িয়ে দিতো। একদিন নাতনিকে দেখতে গিয়ে তাদের কথা শুনে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় চলে আসি। ফোন দিলে ঠিকমতো কথা বলতো না। শেষের তিন মাস যাইতে দেয়নি, দেখাও করতে দেয়নি। গেলে দারোয়ান বাসায় ঢুকতে দিতো না। বলতো আমরা বাসায় গেলে তার চাকরি থাকবে না। আসলে নির্যাতন করায় দেখতে দেয়নি।’

মেয়েকে নির্যাতনের অভিযোগ এনে গত রবিবার উত্তরা পশ্চিম থানায় শিশু নির্যাতনের মামলা করেন মেয়েটির বাবা। মামলায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এমডি সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথি আক্তারসহ চার জনকে আসামি করা হয়। ওই দিনই দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর উত্তরা থেকে সাফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী বীথিসহ চার জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সোমবার বিকালে তাদের আদালতে পাঠানো হয়। পরে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান চিকিৎসক মোহাম্মদ খলিলুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মেয়েটির শরীরের আঘাতগুলো দীর্ঘমেয়াদি। রুটিন মাফিক শিশুটির হাতে, পায়ে, পিঠে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। প্রকারভেদে আঘাতের সময়সীমা ১০ দিন, ১৫ দিন এবং ২০ দিন। কোনও কোনও আঘাত এক মাস কিংবা দুই মাস আগের। ঠিকমতো খাবারও খেতে দেয়নি। যার কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সুস্থ হতে দুই-তিন মাস লাগবে।’

উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী রফিক আহমেদ বলেন, ‘শিশু নির্যাতনের মামলায় বিমানের এমডি সাফিকুর রহমান এবং তার স্ত্রী, তাদের বাসার আরও দুই গৃহকর্মীকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’

/এএম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৮৬, মামলা ৪৯
ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের মালিক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা আবারও গ্রেফতার
সাবেক স্ত্রীর বিরুদ্ধে হিরো আলমের মামলা, চাঁদা দাবির অভিযোগ
সর্বশেষ খবর
রোনালদোর ২৫৫ ইউরো জরিমানা, যা আয় করেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডে!
রোনালদোর ২৫৫ ইউরো জরিমানা, যা আয় করেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডে!
ভুটান থেকে ঢাকায় এসে কী বললেন ফিফা সভাপতি 
ভুটান থেকে ঢাকায় এসে কী বললেন ফিফা সভাপতি 
দলের সঙ্গে যারা মুনাফিকি করবেন তারেক রহমান তাদের ক্ষমা করবেন না: আইনমন্ত্রী
দলের সঙ্গে যারা মুনাফিকি করবেন তারেক রহমান তাদের ক্ষমা করবেন না: আইনমন্ত্রী
এসসিও বৈঠকে ইসহাক দারের উপস্থিতিতে যা বললেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
এসসিও বৈঠকে ইসহাক দারের উপস্থিতিতে যা বললেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত