৮ ঘণ্টা ধরে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ২, আহত অর্ধশতাধিক

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
২৮ জুলাই ২০২৬, ০০:১০আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০০:১০

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে একটি বাজারের নামকরণ নিয়ে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের সংঘর্ষে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতের নাম হিরণ মিয়া (২৮)। তিনি মিরারচর গ্রামের ফজলু মিয়ার ছেলে। সোমবার (২৭ জুলাই) সকাল ৮টা থেকে উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের মিরারচর-আকবরনগর এলাকায় এ সংঘর্ষ শুরু হয়। দুই গ্রামবাসী মধ্যে টানা আট ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলে। এতে উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্যমতে, হিরণ মিরারচর গ্রামের হয়ে সংঘর্ষে অংশ নেন। ওই সময় তার শরীরে বল্লমের আঘাত লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকায় নেওয়ার পথে বিকালে মৃত্যু হয়। এর আগে সকালে মাসুদ মিয়া (৩০) নামের একজন অটোরিকশাচালকের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে সংঘর্ষে মিরারচর গ্রামের দুজনের মৃত্যু হলো।

ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক (তদন্ত) লিমন বোস বলেন, ‌‘সংঘর্ষ থামাতে পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাব অংশ নেয়। বর্তমানে পুলিশের শতাধিক সদস্য বাসস্ট্যান্ড এবং বিভিন্ন গুরুত্ব পয়েন্টে মোতায়েন রাখা আছে। সংঘর্ষের ঘটনায় এখন পর্যন্ত মামলা হয়নি। দুজন নিহত হয়েছেন।’

সংঘর্ষের কারণে সকাল ১০টা থেকে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর বিকাল সাড়ে ৩টায় আবার ট্রেন চলাচল শুরু হয়।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, মিরারচর ও আকবরনগর গ্রামের ওপর দিয়ে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথ গেছে। দুই পক্ষ রেলপথের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায়। এ কারণে যাত্রীর নিরাপত্তার কথা ভেবে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। ফলে জামালপুর থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী আন্তনগর বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনটি কুলিয়ারচর ও ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কিশোরগঞ্জগামী আন্তনগর এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ভৈরব স্টেশনে থামিয়ে রাখা হয়। পর্যাপ্ত পুলিশ গিয়ে লাইন থেকে লোকজন সরিয়ে নেওয়ার পর বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। দীর্ঘক্ষণ ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় দুটি ট্রেনের অসংখ্য যাত্রীকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

ভৈরব রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার ইউসুফ বলেন, ‘লাইন ক্লিয়ার হওয়ার পর প্রথমে কুলিয়ারচর স্টেশনে আটকে থাকা বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনটি ভৈরবে আনা হয়। পরে ভৈরব স্টেশনে থেমে থাকা এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেস ট্রেন কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।’

সংঘর্ষস্থলে গিয়ে দেখা যায়, রেললাইনের পাশে অসংখ্য পুলিশ মোতায়েন করা আছে। দুটি গ্রামের সড়কের একাধিক স্থানে পুলিশ টহল দিচ্ছে। আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড ও বাজারেও পুলিশ অবস্থান করছে। বাসস্ট্যান্ড ও বাজারের দু-একটি ছাড়া সব কটি দোকান বন্ধ। স্থানে স্থানে সংঘর্ষের ক্ষতচিহ্ন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের মাঝ দিয়ে ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক গেছে। সড়ক নির্মাণের পর সেখানে একটি বাসস্ট্যান্ড গড়ে ওঠে। ১৯৯১ সালে বাসস্ট্যান্ডের দুই পাশে বাজার বসতে শুরু করে। দুই গ্রামের ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের উপস্থিতির কারণে বাজারটি দীর্ঘদিন ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নামে পরিচিত ছিল। তবে সরকারি কোনও নথিতে বাজারটির নির্দিষ্ট নাম ছিল না।

বিরোধের সূত্রপাত ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে একটি সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করে। সেখানে বাজারের নাম শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা হয়। এর প্রতিবাদে একই বছরের ৯ জুলাই মিরারচর গ্রামের কয়েকজন সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ সদস্যসহ শতাধিক মানুষ আহত হন। বাজারের অসংখ্য দোকানপাটও ভাঙচুর করা হয়। প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের উদ্যোগে তখনকার সংঘাত থামলেও দুই গ্রামের সামাজিক সম্পর্ক আর স্বাভাবিক হয়নি। পরে বিভিন্ন বিরোধও বাজারের নামকরণ ইস্যুর সঙ্গে জড়িয়ে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে থাকে।

গত কয়েক দিন আগে বাজারে দুই এলাকার কয়েকজনের মধ্যে কথা কাটাকাটির ঘটনা ঘটে। এর জেরে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রবিবার স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম দুই গ্রামের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে উভয় পক্ষের ১০ জন করে প্রতিনিধিকে নিয়ে দ্রুত সভা করে বাজারের নাম চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। 

ওই বৈঠকে উপস্থিত ভৈরব উপজেলা বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সভা না হওয়া পর্যন্ত কোনও পক্ষ সংঘাতে জড়াবে না বলে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু পরদিনই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে গেছে।’

মিরারচর গ্রামের একাধিক বাসিন্দার দাবি, বাজারটি গড়ে ওঠা ও পরিচিতি পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদেরও সমান ভূমিকা রয়েছে। তাই বাজারের নাম ‘মিরারচর বাজার’ অথবা ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ রাখা উচিত।

অন্যদিকে আকবরনগর গ্রামের একাধিক বাসিন্দার বক্তব্য, বাজার ও বাসস্ট্যান্ড সরকারি নথি অনুযায়ী আকবরনগর মৌজার মধ্যে অবস্থিত। তাই এর নাম এককভাবে ‘আকবরনগর বাজার’ হওয়াই যৌক্তিক।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উভয় পক্ষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন মাসুদ মিয়া। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ভৈরব সার্কেল সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আবু মুছা শেখ বলেন, ‌‘বাজারের নামকরণকে কেন্দ্র করে আকবর নগর ও মিরারচর গ্রামের লোকদের সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দুজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন দুই পক্ষের অর্ধশতাধিক লোকজন।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
‘প্রেম’ নিয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষ, শিক্ষার্থীদের মারধর করলেন রাকসু ও শিবির নেতারা
বাজারের নামকরণ নিয়ে ৬ ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ, একজনের মৃত্যু, ট্রেন চলাচল বন্ধ
তেজগাঁও ট্রেনের ধাক্কায় অজ্ঞাত যুবকের মৃত্যু
সর্বশেষ খবর
তৃণমূল থেকে ভবিষ্যতের ক্রীড়া নক্ষত্র গড়ার অনন্য উদ্যোগ
তৃণমূল থেকে ভবিষ্যতের ক্রীড়া নক্ষত্র গড়ার অনন্য উদ্যোগ
শিক্ষিকার ভিডিও নিয়ে যারা ট্রল করেছে, তাদের শনাক্তে নেমেছে পুলিশ
শিক্ষিকার ভিডিও নিয়ে যারা ট্রল করেছে, তাদের শনাক্তে নেমেছে পুলিশ
বাংলাদেশ কি চীনের বলয়ে ঢুকে গেছে?
বাংলাদেশ কি চীনের বলয়ে ঢুকে গেছে?
কবরে থেকে কীভাবে করবেন বিএনপির রাজনীতি?
কবরে থেকে কীভাবে করবেন বিএনপির রাজনীতি?
সর্বাধিক পঠিত
রাজধানীতে বাস-সিএনজির সংখ্যা অর্ধেক হয়ে গেলো কেন
রাজধানীতে বাস-সিএনজির সংখ্যা অর্ধেক হয়ে গেলো কেন
এক মিনিটেই মিলবে ৫ লাখ টাকা, চার দিনে ২ কোটি
এক মিনিটেই মিলবে ৫ লাখ টাকা, চার দিনে ২ কোটি
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সম্মানি ভাতা বাড়লো
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সম্মানি ভাতা বাড়লো
এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের তারিখ ঘোষণা
এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের তারিখ ঘোষণা
বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ করছে ডিএমপি
বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ করছে ডিএমপি