গাজীপুরে দেড় দশকে ৭৮ রিসোর্ট, মানসম্মত হাতেগোনা ১৫টি

রায়হানুল ইসলাম আকন্দ, গাজীপুর
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৫ আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৫

গাজীপুরে গত দেড় দশকে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭৮টি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে মানসম্মত রিসোর্টের সংখ্যা হাতেগোনা ১০ থেকে ১৫টি। সবুজে-শ্যামলে আচ্ছাদিত জেলার অধিকাংশ এলাকাই ঘোরাফেরার জন্য আকর্ষণীয়। রাজধানী ঢাকার কাছে হওয়ায় সপরিবারে অবসর কাটানোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে নানা সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠেছে এসব রিসোর্ট। তবে প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরই অনেক রিসোর্ট আগের অবস্থান ধরে রাখতে পারছে না। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এর অন্যতম কারণ রিসোর্টের অবয়ব ঠিক রাখতে জায়গা সংরক্ষণ না করা।

প্রকৃতির মাঝে নানা সুবিধার রিসোর্ট

গাজীপুরের ভবানীপুর এলাকায় এক যুগের বেশি সময় আগে গড়ে উঠেছে গ্রীনটেক কনভেনশন সেন্টার। অবকাশযাপনের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা ছাড়াও দৃষ্টিনন্দন কটেজ, সবুজ বনানীর ভেতর পায়ে হাঁটার আঁকাবাঁকা পাকা রাস্তা, একাধিক ইনডোর স্পেস ও সুইমিং পুল নির্মাণ করা হয়েছে।

রিসোর্টটি ঘুরে দেখা গেছে, এর চারপাশে রয়েছে ভাওয়ালের সবুজ বন। শোনা যায় পাখ-পাখালির কিচিরমিচির শব্দ। মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য সহায়ক মূল্যে রিসোর্টটি ব্যবহারের উপযোগী বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

রিসোর্টের কর্মকর্তা চঞ্চল মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রকৃতির স্বাদ ও সৌন্দর্য উপভোগের জন্য এই রিসোর্টটি অনেকের মন কাড়বে।’

বেশিরভাগ রিসোর্টে শিশুদের জন্য রাইড নেই

রিসোর্টে সপরিবারে ঘুরতে আসা বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সীমানার ভেতরে যে জায়গা রয়েছে, তা ঘুরে দেখতে বেশি সময় লাগবে না। তবে চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এখানে সময় কাটাতে যে কারও মন চাইবে। তবে গাজীপুরে বেশ কিছু রিসোর্ট রয়েছে, যেখানে শুধু থাকা-খাওয়া ও সুইমিং পুলের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত রাইড নেই।’

রাজধানী ঢাকার কাছে হওয়ায় সপরিবারে অবসর কাটানোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে নানা সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠেছে এসব রিসোর্ট

অপর দর্শনার্থী পোশাক কারখানার কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রিসোর্টগুলো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে তোলা হলেও বেশি বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। বেশিরভাগ রিসোর্টে শিশুদের খেলাধুলার জন্য রাইড নেই।’

দামি রিসোর্ট গ্রীনভিউ

তবে শ্রীপুর উপজেলার গ্রীনভিউ গলফ রিসোর্টের কর্মকর্তা মো. রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানটি সব বয়সী মানুষের জন্য ঘোরাফেরার উপযুক্ত জায়গা। পর্যাপ্ত রাইডের পাশাপাশি সুইমিং পুল, মিনি শিশু পার্ক, পৃথক প্রোগ্রামের জন্য পৃথক ভেন্যু, কটেজসহ নানা সুবিধা রয়েছে।’

রিসোর্টটির আসা দর্শনার্থী মোন্তাজ উদ্দিন বলেন, ‘এখানকার সুবিধা অন্য সব রিসোর্টের তুলনায় একটু বেশি থাকলেও এগুলো ব্যবহারের মূল্য অনেক বেশি। বিশেষ করে এই রিসোর্টে প্রবেশের জন্য উচ্চ ফি দিতে হয়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না।’

কমছে সরকারি পর্যটনকেন্দ্রের আকর্ষণ

একসময় হাজারো মানুষের পদচারণায় প্রতিদিন মুখর থাকতো গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান। ছুটির দিনে মানুষের ঢল নামতো শালবনের এই সবুজ রাজ্যে। সেইসঙ্গে সরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা রাজেন্দ্রপুর ন্যাশনাল পার্ক ও গাজীপুর সাফারি পার্কও তাদের পুরোনো ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

ভবানীপুর বাজার এলাকার বাসিন্দা সোলেমান ফারুক বলেন, ‘রাজেন্দ্রপুর ন্যাশনাল পার্কটি সরকারি হওয়ায় পর্যাপ্ত সংস্কার চোখে পড়ে না। এর বিস্তৃতি বিশাল। কিন্তু থাকা-খাওয়া ও অবকাশযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দর্শনার্থীরা অভাববোধ করেন। ফলে সাধারণ দর্শনার্থীরা ঘোরাফেরা করতে এলেও রাত্রিযাপনের আশা করেন না।’

তিনি বলেন, ‘ন্যাশনাল পার্কে বাসযোগ্য পরিবেশ ও নিরাপত্তা বাড়াতে পারলে প্রাকৃতিক পরিবেষ্টিত এ উদ্যান থেকে সরকার রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারবে।’

আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং নাটক-সিনেমার শুটিং—সব মিলিয়ে একসময় জমজমাট থাকতো পুরো এলাকা। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও সারা দেশের মানুষের কাছে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ছিল বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের চিত্র।

মানসম্মত রিসোর্টের সংখ্যা হাতেগোনা ১০ থেকে ১৫টি

৫ হাজার ২২২ দশমিক ২৯ হেক্টরের এ জাতীয় উদ্যানে বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা থাকলেও দিন দিন কমছে দর্শনার্থী। বন বিভাগের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, জনবল সংকটের কারণে বিশাল উদ্যানের সব অংশে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল এ উদ্যানের ব্যবস্থাপনার জন্য জনবল রয়েছে মাত্র ১৪ জন। ছয়টি প্রবেশদ্বার থাকলেও বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র একটি। উদ্যানের ভেতরে শিশুদের জন্য থাকা পার্কটির অবস্থাও বেশ নাজুক। বিভিন্ন জায়গায় লতাপাতা ও জঙ্গল। অধিকাংশ রাইড ভাঙা ও ব্যবহার অনুপযোগী।

উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি বিশ্রামাগার থাকলেও বেশির ভাগই ব্যবহার অনুপযোগী। বসার উপযুক্ত স্থান নেই, ময়লা-আবর্জনায় ঢেকে আছে। অধিকাংশ স্থান শ্যাওলা, জঙ্গল ও লতাপাতায় ঢেকে গেছে।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় পর্যটন সুবিধা কমে যাওয়ার সুযোগে আশপাশে গড়ে ওঠা বেসরকারি রিসোর্ট ও পিকনিক স্পটগুলো দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে। এতে একদিকে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান তার পুরোনো ঐতিহ্য হারাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারও হারাচ্ছে রাজস্ব।

ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উদ্যানের নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। রাজেন্দ্রপুর থেকে মাস্টারবাড়ী পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় দিনের পাশাপাশি রাতেও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে।’

সাফারি পার্কেও কমছে আগ্রহ

গাজীপুর সাফারি পার্কের দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে বিরল প্রজাতির প্রাণীর সংকট দেখা দিয়েছে। বিলুপ্তির পর নতুন করে ওসব প্রাণী সরবরাহ নেই। প্রাণীর আবাসগুলোও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। আগে যে পরিমাণ দর্শনার্থী বিচরণ করতেন, এখন তা নেই। পার্কের প্রতি মানুষের আগ্রহ ক্রমশ কমছে।

রিসোর্টে বনভূমি দখলের অভিযোগ

দখল থেকেও বাদ যায়নি এসব রিসোর্ট। পরিবেশ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ভাওয়াল রিসোর্ট ও হোটেল এক্স গাজীপুরে বনের জমি দখল এবং পরিবেশের ক্ষতি করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। বনের জমি দখল এবং কোনও ধরনের পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ভাওয়াল রিসোর্টের মালিকের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে জমি উদ্ধারে দেওয়ানি মামলাও দায়ের করা হয়।

গাজীপুরের শ্রীপুরে গ্রীন প্যারাডাইস রিসোর্ট এবং আহামদিয়া এগ্রো ফার্ম কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সরকারের প্রায় ২১ বিঘা খাসজমি জবরদখলের অভিযোগ আছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়।

প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরই অনেক রিসোর্ট আগের অবস্থান ধরে রাখতে পারছে না

দখলের এসব খবরের পাশাপাশি গাজীপুর সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের অভিযানে বিভিন্ন রিসোর্ট ও হ্যাচারির দখলে থাকা প্রায় সাত একর বনভূমি দখলমুক্ত করা হয়। গাজীপুর সদর উপজেলাতেই বনভূমি উদ্ধারের পরিমাণ সিংহভাগ।

এর বাইরে সরকারি সম্পত্তি ও বনের জমি দখল করে রিসোর্ট ও বাগানবাড়ি বানানোর অভিযোগে ইতিপূর্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বেশ কয়েকজন রিসোর্ট মালিককে তলব করে আইনি জবাবদিহিতার আওতায় এনেছে।

ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগের পরামর্শ

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ফরেস্টি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ফ্যাকাল্টির ডিন অধ্যাপক ড. আবিয়ার রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেকোনো দেশের জন্য ন্যাশনাল পার্ক শুধুমাত্র একটি রিজার্ভ এরিয়া নয়, এটা সরকারের একটি রেভিনিউ অর্জনেরও জায়গা। আমাদের দেশে যে সমস্যা হয়, সরকার রেভিনিউ কালেকশন করে ঠিকই, কিন্তু ম্যানেজমেন্ট ঠিকমতো হয় না। এটা না হলে সারভাইভ করবে না। এটার জন্য ইনভেস্ট করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। এ ছাড়াও লোকাল কমিউনিটিকেও যুক্ত করতে হবে। এটার জন্য সরকার বা বন বিভাগের উচিত ইকো-ট্যুরিজম নিয়ে যারা কাজ করে, রিসোর্ট মালিক, স্টুডেন্ট এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত করে সবাইকে নিয়ে আলোচনা করে তাদের রিকমেন্ডেশন নিয়ে সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া।’

জেলায় ৭৮ রিসোর্ট

ট্যুরিস্ট পুলিশ গাজীপুর জোনের ইনচার্জ পরিদর্শক কামাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৭৮টি রিসোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম সারাহ রিসোর্ট, গ্রীনভিউ গলফ রিসোর্ট, ড্রিম স্কয়ার রিসোর্ট, সোহাগ পল্লী রিসোর্ট, রাজেন্দ্র ইকো রিসোর্ট, সবুজ পাতা রিসোর্ট, নন্দন পার্ক, ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা। এর বাইরে বাকিগুলো ঘোরাঘুরির জন্য তেমন একটা উপযোগী নয়। কারণ সেগুলোতে একটা সুবিধা আছে তো অন্যটি নেই। আবার শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত রাইডও থাকে না। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। এগুলো আমাদের নজরদারিতে আছে। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর তেমন একটা আসে না।’ 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
পর্যটনের বিস্তারে খুলছে কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার
স্মার্ট ভ্রমণ পরিকল্পনায় এআইকে যেভাবে কাজে লাগাবেন
পাহাড়ের কোলে মহামায়া লেকে নৌভ্রমণে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন পর্যটকেরা
সর্বশেষ খবর
প্যাকেজিং খাতের সমস্যা নিয়ে শফিকুর রহমানের কাছে ব্যবসায়ীরা, মিললো যে আশ্বাস
প্যাকেজিং খাতের সমস্যা নিয়ে শফিকুর রহমানের কাছে ব্যবসায়ীরা, মিললো যে আশ্বাস
রিহ্যাব নেতাদের ঋণখেলাপি ও কর-ভ্যাটের তথ্য চেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
রিহ্যাব নেতাদের ঋণখেলাপি ও কর-ভ্যাটের তথ্য চেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
নারীকণ্ঠে প্রেমের ফাঁদ, সেনাসদস্য পরিচয়ে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে গ্রেফতার
নারীকণ্ঠে প্রেমের ফাঁদ, সেনাসদস্য পরিচয়ে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
কোটি মানুষের শিল্পনগরী, নেই কোনও বিনোদনকেন্দ্র
কোটি মানুষের শিল্পনগরী, নেই কোনও বিনোদনকেন্দ্র
ঢাকার কাছেই ৫ রিসোর্ট: কোথায় কী সুবিধা, খরচ কত 
ঢাকার কাছেই ৫ রিসোর্ট: কোথায় কী সুবিধা, খরচ কত 
সরকারকে সতর্ক করে আসিফ নজরুল বললেন, ‘এগুলো স্পষ্ট ওয়েক-আপ কল’
সরকারকে সতর্ক করে আসিফ নজরুল বললেন, ‘এগুলো স্পষ্ট ওয়েক-আপ কল’
৩৯৬ কোটিতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নতুন গতি, দূরত্ব কমবে ৪০ কিলোমিটার
৩৯৬ কোটিতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নতুন গতি, দূরত্ব কমবে ৪০ কিলোমিটার
দেশের সব বিভাগের আইনজীবীদের জন্য নতুন সিদ্ধান্ত
দেশের সব বিভাগের আইনজীবীদের জন্য নতুন সিদ্ধান্ত