জন্মসূত্রে সাভারেই বেড়ে ওঠা সাইদুর রহমানের। বয়স ৩৫ বছর। এক দশকেরও বেশি সময় আগে স্কুল-কলেজে পড়ার সময় বেড়ানোর জায়গা বলতে তিনি ঘুরতে যেতেন পার্শ্ববর্তী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অথবা পাশের নবীনগরের জাতীয় স্মৃতিসৌধে। বয়স বেড়েছে, কিন্তু বেড়ানোর ভালো জায়গা হিসেবে এখনও এই দুটিই আছে।
তবে বিবেকের প্রশ্নে তার বারবার মনে হয়, একদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অন্যদিকে একটি শ্রদ্ধার জায়গা—এ দুটিকে কি বেড়ানোর জায়গা বলা যায়? মধ্যবয়সে এখন তিনি পরিবার নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন রিসোর্টে ঘুরতে যান। সেগুলোও বেশ ব্যয়বহুল। এর বাইরে সকাল-বিকেল হাঁটাহাঁটি কিংবা একটু প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটানোর মতো কোনও জায়গা নেই প্রায় কোটি মানুষের বসবাসের এই অঞ্চলটিতে।
নদী, খাল, পুরাকীর্তিসহ প্রাকৃতিক নানা উপাদান থাকলেও বেহাল দশা সেগুলোর। ঢাকার নিকটবর্তী সাভার তাই শুধুই জঞ্জালভর্তি এক নতুন শহরের নাম। বাসিন্দারা যেন কংক্রিটের জেলখানায় বন্দি। নেই প্রকৃতির কোনও ছোঁয়া।
আজ ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। দিবসটিকে সামনে রেখে সাভারের বিভিন্ন এলাকায় নানা শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে কথা হয়।
সাইদুর রহমানের মতো অনেকেই এই অঞ্চলে বেড়ানোর স্থান বলতে বোঝেন বহিরাগতদের জন্য নিষিদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ কিংবা ব্যয়বহুল রিসোর্টগুলো। তাদের চাওয়া, প্রায় কোটি মানুষের বসবাসের এই শহরে গড়ে তোলা হোক পর্যটন স্পট। বিশেষত সাধারণ মানুষের প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মেশার সুযোগ, একটু অবকাশযাপন, হাঁটা-চলার মতো পার্ক।
একটা পার্ক নেই, বেড়ানোর জায়গা নেই
সাভারের রেডিও কলোনি এলাকায় প্রায় তিন দশক ধরে বসবাস করছেন ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চোখের সামনে সাভার দিনে দিনে গ্রাম থেকে শহর হয়ে উঠলো। পৌরসভা হলো। সিটি করপোরেশনও হবে। শত শত পোশাক কারখানা, নানা শিল্পকারখানা, কিন্তু একটা পার্ক নেই, কোনও বেড়ানোর জায়গা নেই। ঢাকার উত্তরা, ধানমন্ডিসহ প্রত্যেকটা এলাকায় দেখবেন, একটু নির্মল বাতাস, প্রশান্তিতে বসার, হাঁটা-চলার জায়গা আছে। কিন্তু সাভারে কিছুই নেই। মানুষ বেড়াতে যায় জাহাঙ্গীরনগর, স্মৃতিসৌধে। যেখানে আসলে যাওয়া যায় না। কারণ বাইরের লোকজনকে ভেতরে ঢুকতে দেয় না তারা।’
সাভারের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন সানজিদা শারমিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুরো সাভারে একটা বেড়ানোর জায়গা নেই। আমাদের বাসার বাইরে একটু নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা নেই। জাবিতে গেলে অনেক সময় বহিরাগত বলে সমস্যায় পড়তে হয়। মানুষ নিরুপায় হয়ে যায় এসব জায়গায়। সরকারি একটি পার্ক, কিংবা বেড়ানোর জায়গা থাকলে হয়তো সেখানেই যাওয়া যেতো। তাই প্রশাসনের কাছে দাবি, সাভারে সরকারিভাবে পার্ক কিংবা বেড়ানোর জায়গা বানানো হোক।’
হাঁটা-চলা ও শরীরচর্চারও জায়গা নেই
সাভারে প্রায় তিন দশক ধরে সাংবাদিকতা করছেন নাজমুল হুদা। বর্তমানে তিনি সাভারে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন সাভার প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারিভাবে আমাদের যে ধরনের পর্যটনকেন্দ্র থাকা দরকার, সেটা সাভারে নেই। অনেকেই জাতীয় স্মৃতিসৌধে বেড়াতে যান। এ ছাড়া ফ্যান্টাসি কিংডম রয়েছে, নন্দন পার্ক রয়েছে, মিলিটারি ফার্ম রয়েছে। এসব জায়গায় যান অনেকেই। এগুলোর বাইরে বেসরকারিভাবেও সাভারে বেশ কয়েকটি বিনোদন পার্ক গড়ে উঠেছে। সরকারিভাবে বিনোদনকেন্দ্র না থাকায় মানুষ এখন এসব বেসরকারি বিনোদনকেন্দ্রে যাচ্ছে।’
‘আমরা দেখেছি, নতুন গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকা এমনকি ঢাকার উত্তরা, ধানমন্ডির মতো এলাকায়ও হাঁটা-চলার জায়গা রয়েছে। বিনোদন বা সকালবেলা হাঁটার জন্য ঢাকায় আমরা বিভিন্ন জায়গায় যে রাস্তা বা ওয়াকওয়ে দেখি, সাভারে সেভাবে হাঁটার জন্য, বিনোদন করার জন্য, এক্সারসাইজ করার জন্য বা দৌড়ানোর জন্য সরকারি কোনও ব্যবস্থা নেই’ হতাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় সাভার পৌরসভা রয়েছে, ধামরাই পৌরসভা রয়েছে। এসব পৌর কর্তৃপক্ষ চাইলে হাঁটার জন্য বা বিনোদনের জন্য পার্ক করতে পারে। পর্যটক বা বিনোদনপ্রেমীরা যাতে সেখানে সময় কাটাতে পারে, সেরকম কোনও স্পট যদি তারা সরকারিভাবে করে দিতো, তাহলে ভালো হতো।’
অপরিকল্পিত নগরী, কিছুই নেই
সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সালাহউদ্দিন খান নঈম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাভারকে যেভাবে সাজানো উচিত ছিল, সাভারের গুরুত্ব অনুধাবন করে যেভাবে পরিকল্পনা করা উচিত ছিল, তার কিছুই হয়নি। কিছুই নেই। একটি অপরিকল্পিত নগরী। নদী, খাল-বিল সব দখল ও দূষণের শিকার। আমরা যেন একটা মরুভূমির মধ্যে, পরিত্যক্ত একটা শহরের মধ্যে পড়ে গেছি।’
‘মানুষের জীবনে একটা সুন্দর পরিবেশ, বিনোদনের জায়গা, এগুলো মানুষের বেঁচে থাকারই একটা অংশ। মানুষের জীবনের সঙ্গে এগুলো জড়িত। সাভারে যদি এরকম একটা পার্ক থাকতো কিংবা এমন কোনও জায়গা থাকতো, যেখানে মানুষ একটু নিঃশ্বাস নিতে পারতো, প্রাণ খুলে সময় কাটাতে পারতো, এটা আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। আমরা সবসময় এসব দাবি করে আসছি। কিন্তু কেউ শোনে না’ বলেন তিনি।
‘এখন যদি সিটি করপোরেশন না হয়, তাহলে কোনোভাবেই সাভারকে নিয়ে সঠিকভাবে কিছু করা সম্ভব হবে না। সাভারকে যদি একটা মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় রাষ্ট্র না আনে, তাহলে এই পরিস্থিতি থেকে কোনোভাবেই পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘শুধু পার্ক নয়, আমাদের পরিবেশ রক্ষার জন্য যে ডাম্পিং স্টেশন প্রয়োজন, সাভার পৌরসভারও তা নেই। সাভারের অন্য কোনও এলাকাতেও নেই। অথচ দেখেন, ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনার জন্য ডাম্পিং স্টেশন কত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এখানে একটি আধুনিক ডাম্পিং স্টেশন থাকা দরকার ছিল। সেটাও নেই।’
পার্ক স্থাপনের উদ্যোগের কথা জানালো প্রশাসন
সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাভারে অসংখ্য মানুষ বসবাস করে। এসব মানুষের প্রতিদিনের বিনোদনের জন্য কিংবা ছুটির দিনে সময় কাটানোর যে জায়গার প্রয়োজন, তার বড় একটি অংশ পূরণ করছে সাভারের বিভিন্ন রিসোর্ট। তবে সরকারিভাবে উপজেলা প্রশাসন বা পৌরসভার পক্ষ থেকে যে পার্ক বা বিনোদনকেন্দ্র থাকা দরকার, সাভারে সে ধরনের কোনও পার্ক নেই।’
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমরা চিহ্নিত করেছি এবং সংসদ সদস্য মহোদয়ের সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করেছি। একটি পার্ক স্থাপনের জন্য আমরা কাজ করছি। সংসদ সদস্য ইতিমধ্যে জায়গাটি পরিদর্শন করেছেন। আমরা চাইছি, অতি দ্রুত একটি পার্ক স্থাপনের কাজ শুরু করতে। প্রাথমিকভাবে পুরো পার্কের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব না হলেও আংশিকভাবে কিছু কাজ শুরু করে জায়গাটি মানুষের চলাচলের উপযোগী করে চালু করার চেষ্টা করছি। অর্থাৎ আংশিকভাবে হলেও এটি চালু করা হবে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এ লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। একই সঙ্গে জায়গা ও বরাদ্দ নিয়ে যেসব জটিলতা রয়েছে, সেগুলো নিয়েও আমরা কাজ করছি। আশা করছি, খুব দ্রুতই এর দৃশ্যমান কিছু অগ্রগতি দেখা যাবে।’
সরকারি জমিতে পার্ক করার পরিকল্পনা
ঢাকা জেলা পরিষদের প্রশাসক ইয়াসিন ফেরদৌস মুরাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের পৌর এলাকাগুলোতে অনেক আগে থেকেই কিছু সরকারি জমি ছিল। কিন্তু বিগত সরকারের সময়ে সেসব জমি ব্যক্তি বিশেষ দখল করে রেখেছে। অনেক জমি খাস খতিয়ানভুক্ত। খাস খতিয়ানভুক্ত এসব জমি ব্যক্তিপর্যায়ে নিয়ে অনেকে লাভবান হচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিক মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে সেগুলো কোনও কাজে আসছে না।’
তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমরা অবশ্যই কাজ করবো। ইতিমধ্যে জায়গা খুঁজছি। খাস খতিয়ানভুক্ত জমি, জেলা প্রশাসন (ডিসি) ও জেলা পরিষদের যেসব জায়গা রয়েছে—এর মধ্যে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী এবং পার্ক তৈরির জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজে দেখছি। জায়গা পাওয়ার পর জেলা পরিষদ বা সরকারের কাছ থেকে সেটি নিয়ে আমরা একটি পার্ক করবো। সাভারের ক্ষেত্রেও একইভাবে কাজ করবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সাভারের নবীনগরে জাতীয় স্মৃতিসৌধ রয়েছে। এখানেও অনেকে যান। আমাদের একটি পর্যটনকেন্দ্রও আছে সেখানে, সেটিকে কীভাবে আরও মানসম্মত করা যায়, কীভাবে আধুনিকায়ন করা যায় এবং মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করা যায়, সেটাও আমরা চিন্তা করছি।’
বংশী নদীর দুই তীরে বিনোদনকেন্দ্র হতে পারে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাভার এখন আর ছোট শহর নয়। গত দশকে অনেক উন্নত হয়েছে। এটি এখন বড় শহর এবং শিল্পনগরী হিসেবে গড়ে উঠেছে। এখানে থাকা জাতীয় স্মৃতিসৌধ জাতীয় পর্যায়ের উদ্দেশ্য পূরণ করে। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন কার্যক্রম, শ্রদ্ধা নিবেদন ও পর্যটনের জন্য মানুষ সেখানে যায়। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে পার্ক, বিনোদনকেন্দ্র বা মানুষের অবসর কাটানোর মতো কোনও ব্যবস্থা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এটি স্থানীয় সরকারের, অর্থাৎ মিউনিসিপ্যালিটির জনপ্রতিনিধিদের, একটি বড় ধরনের ব্যর্থতা। কারণ শহরটি খুব দ্রুত গতিতে বড় হয়েছে, শিল্পনগরী হিসেবে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু পাড়া-মহল্লা পর্যায়ে উদ্যান, খেলার মাঠ বা বিনোদনের জায়গা—এসব কিছুই সেভাবে গড়ে ওঠেনি।’
তিনি বলেন, ‘সাভারে একটি বড় প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, বংশী নদী। নদীর দুই তীর ঘিরে খুব সুন্দর বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। এগুলো স্থানীয় শহরবাসীর চিত্তবিনোদনের প্রয়োজন পূরণ করতে পারতো। স্থানীয় সরকার যদি উদ্যোগ নেয়, তাহলে এখনও কিছু জায়গায় এ ধরনের বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। সাভারে কিছু নিচু এলাকা আছে, সেগুলোকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে লেক তৈরি করা যেতে পারে। এসব জায়গাকে ঘিরে বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব।’