সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান শ্রমিক নেতাদের

সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি
০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২৬ আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২৬

সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ ও কারখানায় উৎপাদন বন্ধের পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বাস্তবতা দেখছেন না শ্রমিক নেতারা। মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের কাজে ফিরে উৎপাদন সচল রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।

তাদের মতে, শ্রমিকদের মূল দাবি ছিল মজুরি বোর্ড গঠন ও নতুন মজুরি কার্যকর করা। সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করায় এখন কারখানায় ফিরে যাওয়া উচিত শ্রমিকদের। তবে কাজে ফেরার পরিবেশ তৈরি করতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

এসব বিষয়ে বৃহস্পতিবার রাতে মুঠোফোনে কথা হয় সাভার-আশুলিয়ার একাধিক শ্রমিক নেতার সঙ্গে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, কারখানাগুলোতে কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে শ্রমিক আন্দোলন সহিংস পর্যায়ে পৌঁছাতো না। মজুরি বোর্ড গঠনের পদ্ধতি ও বোর্ডের কার্যক্রম সম্পর্কে ট্রেড ইউনিয়নগুলো শ্রমিকদের মধ্যে প্রচার করতে পারত। এতে শ্রমিকেরা বিষয়গুলো বুঝে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে পারতেন। শ্রম আইন অনুযায়ী ধর্মঘট করার অধিকারও যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারতেন।

তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার না থাকায় শিল্পের নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। এ আন্দোলনের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ ও সরকারের প্রশাসনের ব্যর্থতা রয়েছে। পরিস্থিতি এ পর্যায়ে যাওয়ার আগে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কোনো তৎপরতা ছিল কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে তার।

আন্দোলন সহিংস পর্যায়ে পৌঁছানোর কারণে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকেরা পণ্য রফতানির চালান বা শিপমেন্ট নিয়ে চাপে পড়েছেন বলে মনে করেন এই শ্রমিক নেতা। তিনি বলেন, বিভিন্ন কারখানার শিপমেন্টের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। বিশেষ করে আগামী ডিসেম্বরের বড়দিন সামনে রেখে অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যেই অধিকাংশ পণ্যের উৎপাদন শেষ করে শিপমেন্ট সম্পন্ন করতে হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শেষ করে পণ্য পাঠানো নিয়ে অনেক মালিক সংকটে পড়ছেন।

খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে তৈরি পোশাকশিল্প এমনিতেই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মালিকেরা দাবি করছেন। তাদের ভাষ্য, ক্রয়াদেশ কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। কিছু কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধও আছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার মালিকদের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করছে। কিন্তু শ্রমিকদের জন্য কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার এবং শ্রমিকদের দাবি বাস্তবায়নে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, কারখানায় উৎপাদন চালু রাখা এবং মালিকেরা যাতে নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে পণ্য শিপমেন্ট করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে।

খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, শিল্পটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকেরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তখন নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়বে। দেশের ৪০ লাখ শ্রমিকের মধ্যে কিছু শ্রমিকও বেকার হয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। এমনিতেই আগে থেকে লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার রয়েছেন। শিল্পে আরও বড় ধরনের ক্ষতি হলে নতুন করে শ্রমিকদের বেকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত সমস্যার সমাধান করে শ্রমিকদের নিরাপদে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা এবং কারখানাগুলো চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।

মাঠপর্যায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এবারের আন্দোলন মূলত এক দফার ভিত্তিতে, সেটি মজুরিসংক্রান্ত দাবি। এখানে অন্য কোনো দাবি উত্থাপন করা হয়নি। শ্রমিকদের আরও অনেক সমস্যা ও দাবি রয়েছে। তবে মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার শুধু মজুরিসংক্রান্ত বিষয়েই সীমাবদ্ধ।

তিনি বলেন, কেউ কেউ নয় দফাসহ বিভিন্ন দাবি সামনে আনছেন। তার ধারণা, শ্রমিকদের মজুরি আন্দোলনকে মূল দাবি থেকে সরিয়ে অন্যদিকে নেওয়ার জন্যই কেউ কেউ এ ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছেন। অর্থাৎ মূল দাবিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হচ্ছে।

শ্রমিকদের মূল দাবি ছিল মজুরি বোর্ড গঠন এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করা। মালিকপক্ষও এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানান তিনি। তবে শ্রমিকদের মধ্যে এ নিয়ে এখনো সন্দেহ রয়েছে। সেই সন্দেহ থাকলেও কারখানার উৎপাদন সচল রেখে মজুরি ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। মজুরি ঘোষণার পর প্রয়োজনে আবার আন্দোলনে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, তিনি আশা করেন, সরকার শ্রমিকদের কাঙ্ক্ষিত মজুরি ঘোষণা করবে। ঘোষিত মজুরি শ্রমিকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে পরবর্তী সময়ে মজুরি পর্যালোচনার যে সুযোগ রয়েছে, তখন সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বিষয়টি জানানো হবে এবং আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি তুলে ধরা হবে।

তবে এই মুহূর্তে শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, কর্মস্থলে ফিরে কারখানার উৎপাদন সচল রাখা জরুরি। এ জন্য সরকারকেও নমনীয় অবস্থান নিতে হবে।

শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছুক্ষণ আগেও তার কাছে খবর এসেছে, পুলিশ শ্রমিকদের বাসায় বাসায় যাচ্ছে। এলাকার স্থানীয় লোকজন ও বহিরাগত ব্যক্তিরা তল্লাশি চালাচ্ছেন এবং শ্রমিকদের ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হবে। আতঙ্কের কারণে তারা কাজে ফিরতে চাইবেন না।

তাই শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন এই শ্রমিক নেতা। তার মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে শ্রমিকেরা নির্ভয়ে কর্মস্থলে ফিরতে পারবেন এবং কারখানাগুলোতে উৎপাদন স্বাভাবিক হবে।

অন্যদিকে সাভারের আরেক শ্রমিক নেতা বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই দলের নেতারাই মালিক। তারাই মন্ত্রী, তারাই সংসদ সদস্য। একদল ক্ষমতা থেকে সরে যায়, আরেক দল ক্ষমতায় আসে। কিন্তু মালিকপক্ষের অবস্থান একই থাকে। শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতো না।

তিনি বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের কথা ছিল মে মাসে। দীর্ঘদিন ধরে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে বলা হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন-সংগ্রামও চালানো হয়েছে। কিন্তু মালিকপক্ষ দাবিতে কর্ণপাত করেনি। এ কারণে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকেরা মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, এর মধ্যে কিছু সুবিধাবাদী মানুষ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছেন। এগুলো কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রকৃত শ্রমিকেরা এ ধরনের কাজ করেন না। একজন শ্রমিক কখনো নিজের কর্মস্থলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মেশিনের একটি সুতা পর্যন্ত ছিঁড়বেন না। কারণ, এই শিল্পের ওপর নির্ভর করেই তারা জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন।

তিনি আরও বলেন, সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করায় এখন তাদের দাবি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা। সরকার সরকারি শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনকাঠামো ঘোষণা করেছে। সেখানে একজন পিয়নের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বসাকল্যে প্রায় ৩৮ হাজার ৪০০ টাকা। সেই বিবেচনায় ৩৫টি ফেডারেশনের পক্ষ থেকে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০০ ডলার বা ৩৬ হাজার টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে।

এই শ্রমিক নেতা বলেন, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের মতো বিভিন্ন দেশের পোশাকশ্রমিকেরা বাংলাদেশের শ্রমিকদের তুলনায় বেশি মজুরি পান। অথচ বাংলাদেশে মজুরি বৃদ্ধির সময় এলেই বড় বড় মালিকেরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। সাবকন্ট্রাক্টের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর তারা বলেন, এত টাকা মজুরি দেওয়া সম্ভব নয়।

রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, ২০০৬ সাল থেকেই তিনি বিষয়টি দেখে আসছেন। যখনই মজুরি বৃদ্ধির সময় আসে, তখনই গার্মেন্টস মালিকেরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকেরা জড়িত নন বলে তিনি আগেও বলেছেন। শ্রমিকেরা এই শিল্পের ওপর নির্ভর করেই জীবন ধারণ করেন। কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি, এমনকি কিছু মালিকেরও এতে ভূমিকা থাকতে পারে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি থেকে বঞ্চিত করতে উসকানি দিয়ে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হয় বলে মনে করেন তিনি।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
বিশ্ববাজারে পোশাকের দাম বাড়লেও বাংলাদেশ বিক্রি করছে কম দামে 
৭ নভেম্বর দেশের সব পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি
সকালে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া-সংঘর্ষ, দুপুরের পর পরিস্থিতি শান্ত
সর্বশেষ খবর
গাজীপুর সাফারি পার্কে জন্ম নিয়েছে নীলগাইয়ের চার শাবক
গাজীপুর সাফারি পার্কে জন্ম নিয়েছে নীলগাইয়ের চার শাবক
এআই সামিটে ড্যাফোডিল শিক্ষার্থীদের ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন
এআই সামিটে ড্যাফোডিল শিক্ষার্থীদের ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন
শিশু অধিকার সুরক্ষায় আইন সংশোধনে সংসদীয় ককাসের উদ্যোগ
শিশু অধিকার সুরক্ষায় আইন সংশোধনে সংসদীয় ককাসের উদ্যোগ
সকালে আবার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে হলে ফিরলেন হোম ইকোনমিকসের শিক্ষার্থীরা
সকালে আবার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে হলে ফিরলেন হোম ইকোনমিকসের শিক্ষার্থীরা
সর্বাধিক পঠিত
ভারতীয় ভিসা আবেদনে নতুন নির্দেশনা
ভারতীয় ভিসা আবেদনে নতুন নির্দেশনা
‘ভিআইপি’ সেবায় সন্ত্রাসীর আস্তানায় গিয়ে ৭৪ জমির দলিল রেজিস্ট্রি করলেন সাব-রেজিস্ট্রার
‘ভিআইপি’ সেবায় সন্ত্রাসীর আস্তানায় গিয়ে ৭৪ জমির দলিল রেজিস্ট্রি করলেন সাব-রেজিস্ট্রার
আত্মসমর্পণ করতে আদালতে পরীমণি, ঘিরে রেখেছেন নিরাপত্তারক্ষীরা
আত্মসমর্পণ করতে আদালতে পরীমণি, ঘিরে রেখেছেন নিরাপত্তারক্ষীরা
১০ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া সিমে তিন দিনে ২ কোটি লেনদেন, যুবক গ্রেফতার
১০ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া সিমে তিন দিনে ২ কোটি লেনদেন, যুবক গ্রেফতার
শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিচ্ছেন গাজীপুরের গার্মেন্টস শ্রমিকরা
শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিচ্ছেন গাজীপুরের গার্মেন্টস শ্রমিকরা